প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিদ্যুৎখাতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চীনারা আধিপত্য বাড়াচ্ছে

বণিক বার্তা: সরকারের বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়াবে ৪০ হাজার মেগাওয়াটে। দেশের বিদ্যুৎ খাতের এ সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে দেশী-বিদেশী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগও বাড়ছে। নির্মিত ও পরিকল্পিত এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে চীনা বিনিয়োগের আধিপত্যই দেখা যাচ্ছে বেশি। পরিসংখ্যানও বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে চীনা উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়াবে সাড়ে ৭ হাজার মেগাওয়াটে। অর্থাৎ ওই সময়ে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় চীনের অংশ বেড়ে দাঁড়াবে সাড়ে ১৭ শতাংশে।

বিদ্যুৎ খাতের পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এক সময় দেশের বিদ্যুৎ খাতে রাশিয়ার প্রভাব ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ ধারায় পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যুৎ খাতে চীনা কোম্পানিগুলো এখন বিনিয়োগ প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিশেষত বিদ্যুতের মেগা প্রকল্পগুলোয় তারা অর্থায়ন করছে। অর্থায়নের পাশাপাশি নির্মাণ অবকাঠামোগুলোয় দেশ দুটির কর্মীরাও কাজ করছে।

বিদ্যুতের নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হুসাইন বলেন, বিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিভিন্ন দেশ তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ খাতে জাপান, চীন, রাশিয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতও বিনিয়োগ করেছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণ দেশের বিদ্যুৎ খাতকে প্রসারিত করবে। বিশেষত কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে চীন-জাপান বিনিয়োগ করেছে। এখন এসব প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুতের যে লক্ষ্যমাত্রা সেটি অর্জিত হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, পটুয়াখালীর পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার পাশাপাশি একই সক্ষমতার (সেকেন্ড ফেজ) আরো একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে চীন। বাংলাদেশ নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড ও চায়না মেশিনারিজ কোম্পানি (সিএমসি) একই সক্ষমতার আরো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ২০ শতাংশ। আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কোম্পানিটি।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা এনডব্লিউপিজিসিএল সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির নকশা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পে মূল যন্ত্রাংশ কেনাকাটার দরপত্র চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। চলতি মাসের ১ জুন এ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের (পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া জেটি বর্ধিতকরণের জন্য পাইলিংকাজের প্রস্তুতিও চলমান।

এনডব্লিউপিজিসিএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রকৌশলী খোরশেদুল আলম বলেন, পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। আমরা তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পে সেকেন্ড ফেজের কাজ শুরু করেছি। প্রাথমিকভাবে তিন-চার ধরনের কাজ শেষ হয়েছে। করোনাকালীন কাজের গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে। ২০২৩ সালকে সামনে রেখে আমরা এ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিচ্ছি।

এদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে প্রসারিত করার জন্য সরকার যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে সেখানেও অংশ নিচ্ছে চীনা কোম্পানিগুলো। এরই মধ্যে এনডব্লিউপিজিসিএলের সঙ্গে যৌথ কোম্পানিও সিএমসি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও পায়রায় মোট ১৭৮ মেগাওয়াট সোলার পার্ক স্থাপনে চীনা কোম্পানিটি প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে। আগামী ২০২২ ও ২০২৪ সালে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে তারা।

কয়লাবিদ্যুৎ হাব হিসেবে পরিচিতি পাওয়া পটুয়াখালী ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাভিত্তিক আরো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) ও চীনা কোম্পানি নরিনকো যৌথ বিনিয়োগ করেছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নিশানাবাড়িয়ায়। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আরপিসিএল-নরিনকো প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ২০২৩ সালকে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও কাগজে-কলমে এ প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১২ শতাংশ।

এছাড়া বিপিডিবির সঙ্গে যৌথভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরো দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি হয়েছে। চায়নিজ কোম্পানি হুদিয়াং কোম্পানির সঙ্গে ২০১৭ সালে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চীনের হাংঝুভিত্তিক আরেকটি কোম্পানি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। দেশের বেসরকারি একটি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

চীনের পাশাপাশি দেশের বিদ্যুৎ খাতে জাপান, রাশিয়া, ভারত, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া বিনিয়োগ করেছে। এ খাত বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশীদের বিনিয়োগ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে দেশের বিদ্যুৎ খাত। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে ২০৪১ সাল নাগাদ ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় পৌঁছানো। যেখানে চীনা বিনিয়োগের অংক ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।

বিদ্যুৎ হাব হিসেবে পরিচিত মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণে দেশীয় কোম্পানি কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এ প্রকল্পে ঋণসহায়তা দিচ্ছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জাইকা)। প্রকল্পে ২৮ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে সংস্থাটি।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সরকার মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। দীর্ঘমেয়াদে চুক্তিবদ্ধ এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে কোহেলিয়ায় ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। সিপিজিসিএলের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের কোম্পানি সেম্বক্রপ যৌথভাবে এ প্রকল্প ২০২৯ সাল নাগাদ বাস্তবায়ন করবে। মহেশখালীতে ১২০০-১৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে মালয়েশিয়ার কোম্পানি টিএনবি-পিটিবির সঙ্গে পিডিবিআরও একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য যৌথ কোম্পানি গঠন করে। ২০১৬ সালে হওয়া এ চুক্তি স্বাক্ষরে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আগামী ২০৩৩ সাল নাগাদ উৎপাদনে যাওয়ার কথা বলা হয়। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পানি কেপকো ও বিপিডিপি ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সমঝোতা স্বাক্ষর করে। ২০৩৭ সাল নাগাদ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যৌথ কোম্পানি ও ব্যক্তিমালিকানায় আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ শেষ হলে তা থেকে ৯ হাজার ৮২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। যদিও এসব প্রকল্পের মধ্য থেকে বেশকিছু প্রকল্প থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করছে সরকার।

এর বাইরে রাশিয়ার ঋণসহায়তায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তালিকায় নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ। পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন এ প্রকল্পে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। যার সিংহভাগ অর্থ, নির্মাণ প্রযুক্তি ও অবকাঠামোয় সহযোগিতা দিচ্ছে দেশটির বিদ্যুৎ খাতের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রোসাটম। এখান থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের অর্থায়নে বাগেরহাটের রামপালে নির্মিত হচ্ছে ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার আরো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এছাড়া দেশের বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণে এসব কোম্পানি নিজেদের প্রসারিত করেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এজাজ হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ সবচেয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত বিনিয়োগ। এখানেই বিদেশী কোম্পানিগুলোর আগ্রহের বড় জায়গা। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিনিয়োগ করে তারা সেই অর্থের চেয়ে কয়েক গুণ অর্থ দেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে। যেটা অন্য কোনো সেক্টরে বিনিয়োগ করে তুলে নিয়ে আসা চ্যালেঞ্জ। গত ১০ বছরে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করে যে পরিমাণ মুনাফা তুলে নিয়েছে, তাতে বিদেশী কোম্পানিগুলো আসবে এটাই স্বাভাবিক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত