প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কামরুল হাসান মামুন: শত সীমাবদ্ধতায়ও আমরাও ভালো ছাত্র তৈরি করতে পারি

কামরুল হাসান মামুন: সীমাবদ্ধতা দূর করতে পারলে বিশ্বের বিস্ময় হতাম আমরা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে একটি সুসংবাদ পাই। আমার প্রিয় ছাত্র হাসনাইন হাফিজের (Hasnain Hafiz) একটি আর্টিকেল বিশ্বের সকল গবেষকের ড্রিম জার্নাল “নেচার” এ একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে। আর্টিকেলেটির শিরোনাম “Tomographic reconstruction of oxygen orbitals in lithium-rich battery materials”! আর এই আর্টিকেলের প্রথম অথর আমাদের হাসনাইন।

Congratulations

!! হাসনাইন বর্তমানে আমেরিকার বিখ্যাত লস আলমস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসাবে কাজ করছে। যারা একাডেমিয়াতে আছে তারা জানে এইরকম একটা ল্যাবে পোস্ট-ডক পেতে কেমন যোগ্যতা লাগে। “Nature” জার্নাল ১৮৬৯ সালে নর্মান লকারের হাত ধরে সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন হিসেবে বৃটেনে থেকে আত্মপ্রকাশ করে। নরমাল লকার ছিলেন ইম্পেরিয়াল কলেজের অধ্যাপক। এই নামটি নিয়েছিলেন উইলিয়াম ওয়ার্ডসয়াথ এর একটি কবিতার লাইন থেকে “To the solid ground up nature trusts the mind that builds for aye”. একটি জার্নালের মান মাপার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর আর নেচারের এই মুহূর্তে ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর হলো ৪২.৭৭! “নেচার” নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হলো “সাইন্স” জার্নাল যার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর হলো ৪১.৮৪৫! এই দুটি জার্নাল বর্তমানে সবচেয়ে বিখ্যাত জার্নাল। নেচার জার্নালের ৬০% আর্টিকেল এডিটোরিয়াল টেবিল থেকেই রিজেক্ট করা হয়। অর্থাৎ ৬০% আর্টিকেলকে রিভিউযারের কাছেই পাঠানো হয় না। আর নেচার জার্নালে মাত্র ১৪% finally একসেপ্টেড হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ১৮টি জার্নাল প্রকাশিত হয়। এদের কোনটির ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর নাই। এইগুলোকে বলা যায় বিপদগ্রস্ত শিক্ষকদের প্রমশনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্টিকেল প্রোডাকশন ফ্যাক্টরি। এইসব জার্নালে প্রকাশ করলে পৃথিবীর জ্ঞান ভান্ডারের কোন লাভ হয় না। কেউ এইসব আর্টিকেল পড়ে দেখে না। শুধু শুধু এইসব জার্নাল প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা খরচ হয় আর একই সাথে শিক্ষকদের মেধার অপচয় হয়। কারো যদি প্রমোশন পেতে চারটা আর্টিকেল লাগে সেটা হউক নেচার জার্নালে কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন জার্নালে। তাতে কোন ফারাক নাই। যেই দেশে ভালো মন্দের মধ্যে বিচার করতে গিয়ে কোন পার্থক্য করে না সেই দেশে ভালো গবেষক তৈরী হবে কিভাবে? এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালেই প্রকাশ করে যদি প্রয়োজনীয় সংখ্যক আর্টিকেল চাপকে ডিসচার্জ করা যায় তাহলে কোন বোকা অতিরিক্ত চাপ নিয়ে ভালো ভালো জার্নালে প্রকাশ করতে যাবে? তারপরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক জ্ঞানী গুণী শিক্ষক আছে যারা নিজে থেকে চাপ নিয়ে অনেকেই ভালো ভালো জার্নালে প্রকাশ করে। এই প্রকাশনাগুলোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়য়ের সিস্টেমের কোন কৃতিত্ব নাই। আমার মতে এই মুহূর্তে এইসব গার্বেজ জার্নাল প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আজাইরা শ্রম সাশ্রয় হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা সাশ্রয় হবে, কাগজ সাশ্রয় হওয়ার কারণে পরিবেশ দূষণ কম হবে। আর সবচেয়ে বড় লাভ হলো ভালো গবেষণার জন্য শিক্ষকরা একটা চাপ অনুভব করবে। নিউটনের সূত্রানুসারে চাপ (প্রতি একেক ক্ষেত্রফলে বল) ছাড়া কোন কাজ হয় না।

এখানে বলে রাখা ভালো নেচার প্রকাশিত হয় নেচার পাবলিশিং হাউস থেকে যা অন্য আরো কোম্পানিকে কিনে এর বিপুল ব্যাপ্তি ঘটেছে। নেচার পাবলিশিং থেকে এখন প্রচুর জার্নাল বের হয় যার মান সাধারণ থেকে অসাধারণ সবই আছে। একটির নাম “নেচার কমনিকেশনস” যার ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর ১২.১২! কেবল অনলাইন ওপেন এক্সেস জার্নাল হওয়ায় ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর এমনিতেই একটু বেশি হওয়া স্বাভাবিক। এইসব জার্নাল থেকে রিজেক্টেড হলে অথরকে রিকোয়েস্ট করা হয় “সায়েন্টেফিক রিসার্চ” নামে একটি জার্নালে ট্রান্সফার করার জন্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর প্রথমবার প্রথমবর্ষে পড়াই এবং এই সুবাদে এই ব্যাচটি হয়ে উঠে আমার অত্যন্ত প্রিয়। এই ব্যাচটিতে অনেক পটেনশিয়াল ভালো ছাত্র ছিল যার মধ্যে অনেকেই ভালো করেছে। এর মধ্যে একজন আমার নিজ বিভাগে যোগ দিয়েছে এবং সে একজন অউটস্টান্ডিং গবেষক। আরেকজন আছে Omer Rahman যাকে আমি সম্পদ বলে ডাকি। সে আছে আমেরিকার আরেক বিখ্যাত ল্যাব “ব্রুক হ্যাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি”-তে পোস্ট-ডক হিসাবে আছে। তাছাড়া একই ব্যাচের শারমিন আলম ইন্টেল কর্পোরেশনে কাজ করছে। এছাড়াও আরো অনেকে অনেক ভালো ভালো জায়গায় আছে যা এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। হাসনাইন হাফিজদের immediate পরের ব্যাচের সাব্বির সুফিয়ান (Hunululu Sabbiর) পোস্ট-ডক হিযাবে আমেরিকার আরেক বিখ্যাত ল্যাব ” Jefferson Lab-এ আছে। সেও ফিজিক্সের সবচেয়ে বনেদি জার্নাল (যেখান থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক নোবেল প্রাইজ পেয়েছে) ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স বেশ কিছু আর্টিকেল প্রকাশ ইতিমধ্যে নিজেকে একজন অউটস্টান্ডিং গবেষক প্রমান করেছে। এত এত সীমাবদ্ধতা সত্বেও আমরাও ভালো ছাত্র তৈরী করতে পারি। সীমাবদ্ধতা যদি দূর করতে পারতাম তাহলে আমি নিশ্চিত আমরা বিশ্বের কাছে বিস্ময় হতে পারতাম।

(লেখকের ফেইসবুক পোস্ট থেকে সংগৃহিত)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত