প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ওয়ালি-উর রহমান: ছয় দফা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ

ওয়ালি-উর রহমান: বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বর্পূণ ঘটনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় শুধু ধর্মের ভিত্তিতে হাজার মাইলের দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তখন পাকিস্তান রাষ্ট্রের একটি অংশ ছিলো। পুর্ব পাকিস্তানের যাবতীয় শাসনকার্য চলতো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। শুরু থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে পূর্ব-পাকিস্তানের নেতাকর্মীদের বিরোধ হতে থাকে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক- সকল দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বঞ্চিত হতে থাকে।

উপনিবেশিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি হাপিয়ে উঠেছিলো। শাসন, অত্যাচার, বৈষম্য, নিষ্পেষণ বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছিলো। তারা মুক্তির স্বাদ আস্বাদনের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। যার ফলশ্রুতিতে এই ভূখণ্ডে এক পুনর্জাগরণের সূচনা হয়েছিলো, যার আভাস আমরা ৪৮’, ৫২’, ৬২’, ৬৬’, ৬৯-এর আন্দোলনে দেখতে পাই। সে পুনর্জাগরণের যোগ দিয়েছিলো আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। এ সকল আন্দোলন ছিলো কখনো মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, কখােনা ছাত্রদের বিজ্ঞানভিত্তিক- সার্বজনীন শিক্ষার জন্য সংগ্রাম, কখনো বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার তথা স্বায়ত্বশাসন আদায়ের জন্য সংগ্রাম। কখনো বা সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম, কখনো অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া আদায়ের সংগ্রাম এবং এই পুরো সময় জুড়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদিয়কতা, গণতন্ত্র এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছে।

মূলত বাঙালি জাতি নিষ্পেষিত ছিলো বহু আগে থেকেই। ব্রিটিশ শাসন, পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্ব কোনোকালেই বাঙালি জাতি তার স্বাধীন চিন্তা ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারেনি। সমস্যা ছিলো নেতৃত্বের সংকট। কেউ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জাতীয় সংকটের সমাধান করতে পারেনি। নিষ্পেষণের ইতিহাসের ক্রান্তিকাল রচনা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে।

১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায়, বঙ্গবন্ধু দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘আজ বঙ্গোপসাগরের নাম ছাড়া কোথায়ও বাংলার নাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমার দেশের নাম, এর ইতিহাসকে মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সময় এসে গেছে।’ এর পরপরই কালক্ষেপণ না করে তিনি ৬ দফার কর্মসূচি দিলেন, যা ছিলো প্রকৃত অর্থেই বাংলার মানুষের মুক্তির সনদ।

এরপূর্বে বঙ্গবন্ধু ১৯৫৭ সালে করাচিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে বক্তৃতা দেওয়ার সময় পূর্ব পাকিস্তান নামের পরিবর্তে পূর্ব বাংলার নাম প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, পূর্ব বাংলা নামের একটি ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে। ওই গণপরিষদে একমাত্র তিনিই পূর্ব পাকিস্তানের নামটির প্রতিবাদ করে পূর্ব বাংলার কথা ঘোষণা করেন। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ ও বৈষম্য নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করেন। ছয় দফা হয়ে ওঠে বাঙালির মুক্তির সনদ। ৬ দফা প্রকাশ হওয়ায় বাঙালিদের হৃদয়ে আশা নতুন আলো দেখা দেয়।

ছয় দফা দাবির মূল উদ্দেশ্য ছিলো, পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র এবং ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে এই ফেডারেল রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তি ছিলো ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব। পরবর্তী সময়ে এই ছয় দফা দাবিকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতির স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। বাঙালি জাতির স্বাধিকার, স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক মর্যাদা পায় ছয় দফা। ব্রিটিশ গণতন্ত্রের ইতিহাসে যেমন ম্যাগনাকার্টা, বাংলাদেশের ইতিহাসেও ছয় দফা তেমনি উজ্জ্বল হয়ে আছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ৬-দফা আন্দোলন ১৯৬৬ সালের ৭ জুন নতুন মাত্রা পায়। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ৬-দফার প্রতি বাঙালির অকুণ্ঠ সমর্থনে রচিত হয় স্বাধীনতার রূপরেখা। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অঙ্কুরিত হয় স্বাধীনতার স্বপ্নবিজ। ৬-দফা ভিত্তিক আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। এটা ছিলো মুক্তিযুদ্ধের একটা মাইলফলক, যা অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সফল হয়েছিলো।

বঙ্গবন্ধুই সেই মহাপুরুষ যিনি বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করিয়ে দিলেন, যিনি বাঙালি জাতির শত শত বছরের পরাধীন জীবনের আর্তনাদ বুকের পাঁজরে ধারন করেছিলেন এবং মৃত্যু অনিবার্য জেনেও নিজের জাতিকে মুক্ত করতে সংগ্রামী জীবন বেছে নিলেন এবং কৃতকার্য হলেনÑ বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়ে আমি ভাবি, একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালির সাথে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীর ভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্ব অর্থবহ করে তোলে’। -( অসমাপ্ত আত্মজীবনী)

বঙ্গবন্ধু ছিলেন নির্ভীক, অমিত সাহসী এবং মানবদরদী। বঙ্গবন্ধু তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সকল আন্দোলনÑ সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার অবিসংবাদিত নেতৃত্বে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়। বিকাশ ঘটে বাঙালি জাতিসত্তার। তিনি ছিলেন বিশ্বের সকল নিপীড়িত- শোষিত,বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায় ও মুক্তির প্রতিভূ। সাংবাদিক শেরিল ডান বলেছেন, ‘বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হলেন একমাত্র নেতা যিনি রক্তে, বর্ণে, ভাষায়, সংস্কৃতিতে এবং জন্মে একজন পূর্ণাঙ্গ বাঙালি। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অসীম। তার কণ্ঠ বজ্র কঠিন। তার মহনীয় ব্যক্তিত্ব সহজেই আবিষ্ট হয় সাধারন মানুষ। তার সাহস এবং অনুপ্রেণাশক্তি তাকে এই সময়ের অনন্য সেরা মানব এ পরিণত করেছে’।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত