প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাসুদ রানা: বাংলাদেশ বাঁচাতে এর ভিত্তিমূলে ফিরে চলুন!

মাসুদ রানা: একদিকে হিন্দুত্ববাদীদের মুসলিম-বিদ্বেষ আর অন্যদিকে ইসলামবাদীদের হিন্দু-বিদ্বেষ ঐতিহাসিকভাবে এই বাংলা ও বাঙালী জাতিকে বিভক্ত ও হীনবল করে রেখেছে। যারা প্রকৃতই দেশপ্রেমিক, তাদেরকে হতে হবে ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে নিজের ধর্ম বিসর্জন নয় কিংবা অন্যের ধর্ম কেড়ে নেওয়া নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে হচ্ছে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও প্রতি পক্ষপাত কিংবা বিরোধিতা না করা। সমাজ ও রাষ্ট্রের যে-সমস্ত ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সমান অধিকার আছে বলে আমরা মনে করি, সে-সমস্ত ক্ষেত্রে ধর্মকে প্রসঙ্গ হিসেবে আনা অনুচিত। কারণ, সবার ধর্ম এক নয়। ধর্মনিরপেক্ষতায় ধর্ম সংরক্ষিত থাকে ব্যক্তিগত, পারিবার্কি ও সাম্প্রাদয়িক জীবনে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সাম্প্রদায়িক জীবনে একের ধর্ম পালনে অন্যের বাধা দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। তবে এক ধর্মের চর্চা যদি হয় অন্য ধর্মের উচ্ছেদ সাধন, সেই চর্চা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র মেনে নেবে না। এক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেদের জন্যে স্বর্গ প্রার্থনা করতে পারেন। কিন্তু অন্য ধর্মের লোকদের জন্যে নরক প্রার্থনা করার অধিকার তাদের নেই। তাই, স্বীয় ধর্মের গুণকীর্তন গ্রহণীয় হলেও, অন্য ধর্মের নিন্দা গ্রহণযোগ্য নয়। নিজেকে সুখী করার জন্যে যেমন অন্যকে দুঃখী করা আবশ্যক নয়, তেমনি একের ধর্ম পালন করতে গিয়ে অন্যের ধর্মে বাধা দেওয়া অনাবশ্যক। সকলের সমান নাগরিক অধিকার রক্ষার্থে এটি অগ্রহণীয় ও প্রতিরোধযোগ্য।

সমাজ যখন বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ে বিভক্ত, তখন সকলকে অভিন্ন সমাজে, অভিন্ন দেশে ও অভিন্ন রাষ্ট্রে ধারণ ও পরস্পরের সাথে সহযোগিতায় আবদ্ধ করার জন্যে প্রয়োজন একটি সাধারণ আত্মপরিচয় (common Identity) বাংলাদেশের মানুষের সাধারণ মৌলিক আত্মপরিচয় হচ্ছে বাঙালীত্ব। এই আত্মপরিচিতির উন্মেষ ঘটেছিলো সুলতানী আমলে চতুর্দশ শতকে। এই আত্মপরিচয় বিকশিত হয়েছে কয়েক শতাব্দী ধরে। আর, এই আত্মপরিচয়কে ধারণ করেই ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ এই বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছিলো স্বাধীনতার যুদ্ধ।

১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিলের রচিত ও ১৭ই এপ্রিলে বিঘোষিত ‘প্রোক্লেমেশন অফ ইণ্ডিপেণ্ডেন্স’- এ সকলে জন্যে সাম্য, মনুষ্য-মর্য্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রিপাবলিক বা জনতন্ত্রের গঠন করা হয় এবং বলা হয় পরবর্তীতে সংবিধান রচনা করা হবে। ১৯৭২ সালে যে সংবিধান রচিত হয়, তাতে রাষ্ট্রের চারটি মৌলনীতি ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করা হয়- বাঙালী জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। বাংলাদেশের বর্তমানে যে দুঃশাসন ও দুঃখ চলছে, তার কারণ হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি তার জন্মের প্রতিশ্রুতি থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছে।

যে-কোনো নির্মাণ যদি তার ভিত্তি থেকে সরে যায়, তার ধ্বংসের দিকে যেতে বাধ্য। আজ তাই, দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হলে বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতিকে তার রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলে ফিরে (Back to Basics) যেতে হবে। অন্যথায়, এই রাষ্ট্র ধ্বসে পড়তে বাধ্য। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল যে-রাষ্ট্রটি এই দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়ছিলো, তার ঘোষণা আসে ২৬শে মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণাকে নির্দেশ করে। সে-সময় তার রক্ষার জন্যে নিয়োজিত ছিলো মুক্তিবাহিনী, যা ১৯৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিল মুক্তিফৌজ নামে হবিগঞ্জের মাধবপুরের তেলিয়াপাড়াতে। দুর্ভাগ্যবশত পরবর্তীতে এই মুক্তিবাহিনীকে ভেঙ্গে দিয়ে অস্তিত্বহীন করার কারণে বাস্তবে তাদের যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রটি কাষ্টোডিয়ানহীন হয়ে পড়ে। আজ বাংলাদেশ, বাঙালী জাতি ও বাংলাদেশ রিপাবলিককে নিয়ে চলছে লুণ্ঠন ও শোষণের হোলিখেলা।

প্রশ্ন হচ্ছে কে আছেন এই জাতির মধ্যে, যারা লুণ্ঠন ও শোষণের এই হোলিখেলা বন্ধ করতে পারে? কে আছেন, যারা এই দেশ, জাতি ও রিপাবলিককে তার ভিত্তিমূলে ফিরিয়ে নিতে পারে?  আমরা সেই ভিত্তিমূলে যাত্রার কথা বলি। সেই যাত্রার দর্শন, তত্ত্ব ও কর্মসূচির কথা বলি। আমরা পরিবর্তনের কথা বলি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত