প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: মন্ত্রীর সরল স্বীকারোক্তি ও বিএনপির রাজনৈতিক সংস্কৃতি

দীপক চৌধুরী: রাজধানীর বিজয় সরণীর সিগনাল থেকে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের আইফোন ছিনতাই হয়েছে – এ খবরটি মন্ত্রী নিজেই সংবাদ মাধ্যমের কাছে প্রকাশ করেছেন। সত্যিকারভাবেই দেশপ্রেমিক, সহজ-সরল নিষ্ঠাবান মন্ত্রীর এমন উক্তির এ সংবাদটি অনেকেই লুফে নেবে। বলা হবে, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির জন্যই এমন ঘটনা ঘটেছে। হতাশকণ্ঠে কেউ কেউ উচ্চারণ করবেন, আমরা কেউ নিরাপদ নই। আসলেই কিন্তু এটা তো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কারণ, এই সত্য ও স্পষ্ট উচ্চারণ আমাদের রাজনীতিতে সুদীর্ঘ সময় ছিল না। সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারের চারণ ভূমি হয়ে উঠেছিল এ দেশ। ঘৃণ্য চরিত্রের চলাচল ছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। তাই যদি না হবে তাহলে কী আর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশ পোস্টিং হয়, চাকরি হয়, বাড়ি-গাড়িতে জাতীয় পতাকা উঠতো? এ কারণেই বিএনপি-জামায়াত সরকারের মন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীর বিশাল তফাৎ। ‘ছিনতাই’ ইস্যু নিয়ে বিশেষ করে বিএনপি তো অনেক উচ্চৈঃস্বরে বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলার অভিযোগ করবে। আসলে আমি বলতে চাই, পরিকল্পনামন্ত্রীর স্বীকারোক্তিতেই প্রমাণ করে ‘সত্য উচ্চারণ ও স্বচ্ছতায়’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার অদ্বিতীয়। যদিও এ ঘটনার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সংযোগ খোঁজা ঠিক হবে না। এটা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বিএনপি সরকারের জমানাতে মন্ত্রীর ফোন ছিনতাই হলে বা লুট হলে ঘটনাটি দলটি চেপে যেতো। কারণ, এটি এ দলের বৈশিষ্ট।

গত মঙ্গলবার পরিকল্পনা কমিশনে এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেক বৈঠক শেষে এম এ মান্নান বলছিলেন, ‘রোববার সন্ধ্যায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে যাবার পথে বিজয় সরণীতে সিগনালে গাড়িতে বসে মোবাইল কথা বলছিলাম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেউ একজন মোবাইল নিয়ে দৌড় দেয়। গাড়িতে থাকা পুলিশের গানম্যানকে বলি আমার মোবাইল নিয়ে গেল।’ সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেছেন, ‘গাড়ি থামিয়ে গানম্যান ওই ছিনতাইকারীর পিছু নিলেও তাকে ধরতে পারেনি। মোবাইলটি নিয়ে যাওয়ার পর আমি হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম। ঘটনার সময় মন্ত্রীর গাড়ির জানালা খোলা ছিল। ফোনটি আমার ছেলে এক হাজার ডলারে কিনে দিয়েছিলো।’ প্রকৃতপক্ষে এম এ মান্নান কিছুই গোপন করেননি, চেপে যাননি এই চরম সত্যকে। কর্মঠ ও সৎ মন্ত্রী এম এ মান্নানের জনপ্রিয়তা ও সরল স্বীকারোক্তি অনেকেরই পছন্দ হবে না। এমন কী নিজ দলের অনেকে যে পছন্দ করবে তাও নয়। কিন্তু এদেশের খেটে খাওয়া দিনমজুর, অতি দরিদ্র, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান। তিনি ভালোবাসার জায়গা করে নিয়েছেন নিজের যোগ্যতায়। তাঁর স্পষ্টবাদিতা ও সারল্য উচ্চারণের কথাবার্তা মানুষকে টানে।

আসলে আমাদের দুর্ভাগ্য যে, রাজনীতিতেও দুষ্ট লোক, দুর্নীতিবাজ, মিথ্যুকদের দেখা পাই। সত্যি বলতে কী এদেশের রাজনীতিতে আমরা প্রচুর মনোরোগীরও দেখা পাই। তারা মন্ত্রী হবার আগে এক রকম আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, আবার মন্ত্রী হলে তারা মানুষের কাছে করা অঙ্গীকারগুলো ক্ষমতায় আসার পর ভুলে যান। সুতরাং তাদের ‘মনোরোগী’ বলবে না কেনো জনগণ? মানসিক রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নয়নে অনেক কিছু করার আছে বাংলাদেশে এটা সত্য। এক্ষেত্রে একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতার সুচিকিৎসা আগে দরকার। তারা মানুষকে অনেক সময় বিভ্রান্ত করে থাকেন। যারা আমাদের ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার করে, স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে তাদের সঙ্গে বিএনপি কীভাবে জোটবদ্ধ হয়? যারা আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার হুমকি দিয়ে বেড়ায় তাদের কোলের ভেতর জায়গা দেয় বিএনপি। সুস্থ রাজনীতিকদের পক্ষে তা মোটেই সম্ভব নয়। গণমাধ্যমে উঠে আসছে বাবুবনগরী, মামুনুল হকদের কোটি কোটি টাকার কাহিনী। একশ্রেণির হেফাজত নেতার বিভিন্ন দুর্নীতি, ধর্ষণ, অনিয়ম, গর্হিত আচরণ ও ব্যভিচারের নানা কাহিনী। এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের সঙ্গে কী ভয়ংকর প্রতারণা তাদের। তারা সৎ ও গুণী মওলানাদের ক্ষতি করেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবির) যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেছেন, হেফাজতের সিনিয়র বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতারের পর বেশ কিছু মামলার তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। তদন্তে বিদেশ থেকে আসা মাদ্রাসার জন্য, এতিমখানা ও রোহিঙ্গা ফান্ডের বিপুল পরিমাণ টাকা গায়েব করে দেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। টাকাগুলো তাদের হিসাবে সঠিকভাবে রাখা হয় না, হিসাবে আমরা স্বচ্ছতা পাইনি।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

সর্বাধিক পঠিত