প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কাকন রেজা: বিমান ছিনতাই এবং সাংবাদিকতার শক্তি

কাকন রেজা : সাংবাদিকতার শক্তি কতোটা তার প্রমাণ বেলারুশের সাংবাদিক রোমান প্রোতাসেভিচ। যাকে ধরতে ‘ইউরোপের শেষ স্বৈরশাসক’ হিসেবে খ্যাত বেলারুশেরপুর প্রেসিডেন্ট অ্যালেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো বিমান ছিনতাইয়ের মতন ঘটনা ঘটিয়েছেন। বোমা হামলার ভয় দেখিয়ে রোমানকে বহনকারী বিমানের গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করেছেন তিনি! শাসকরা সাংবাদিকদের ভয় পান। এমনকি যারা সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, তাদেরও ভয় পান তারা। নিরীহ কবিদের কবিতাকে নিয়েও ভয় তাদের। যেন কবিতা ভয়ংকর বিস্ফোরক কোনো। ফলে মরতে হয় মিয়ানমারের কবি খেত থি’কে। যিনি লিখেছিলেন, ‘তারা মাথায় গুলি করে, কিন্তু তারা জানে না বিপ্লব থাকে হৃদয়ে।’ আর ভারতের আমির আজিজে’র কথা সবারই জানা। সব মনে রাখা হবে, সবকিছু মনে রাখা হবে’, এই লাইনটাকে কী পরিমাণ ভয় পায় ভারতের হিন্দুত্ববাদী শাসকরা। ২৭ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট অ্যালেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো।
মানসাঙ্কের হিসেবে সাংবাদিক রোমানের জন্ম তারও একবছর পর। যার ক্ষমতার সমান বয়স নয়, তাকে ভয় পান সেই প্রবল প্রতাপের প্রেসিডেন্ট। কেন ভয় পান তার জবাবটা তুলে দিই সামাজিকমাধ্যমে করা এক বেলারুশ নাগরিকের বক্তব্য থেকেই। যে বক্তব্য প্রকাশ করেছে দৈনিক মানবজমিন। মিখাইল ম্যারিনিচ নামে এক বেলারুশ নাগরিক লিখলেন, ‘বেলারুশের স্বৈরশাসক আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোকে অনেকেই ‘ইউরোপের শেষ স্বৈরশাসক’ বলে থাকেন। স্বৈরশাসকরা সাধারণত মানুষটা ‘ছোট’ হন, কিন্তু তাদের থাকে শক্তিশালী বন্দুক, বিশাল সেনাবাহিনী, চৌকস গুপ্তচর। স্বৈরশাসকদের মন-মানসিকতা বাদ দিলে তাদের বাকি সবকিছুই বড়।’ এরপর সম্ভবত আর ব্যাখ্যা দেবার প্রয়োজন নেই। বেলারুশের মিডিয়া সম্পর্কে বলতে গেলে দৃশ্যত আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার মিডিয়ার যাত্রাপথ সম্পর্কে কিছুটা অনুধাবন করা যায়। ভারতের ‘গদি মিডিয়া’ যার প্রমাণ। প্রমাণ আরও আছে সেগুলো দেয়ার নয়, দেওয়া যায় না বলে। বেলারুশের মিডিয়া সম্পর্কে সেখানের নাগরিক নিকিতা কাপ্লেংকো’র মন্তব্য পড়লেই অবস্থা বোঝা যায়। এটাও নেওয়া মানবজমিন থেকে। তিনি লিখলেন, ‘বেলারুশের পুরো মিডিয়া লুকাশেঙ্কোর পকেটে। তবুও, টেলিগ্রাম নামের ফ্রি অ্যাপে ফ্রি চ্যানেল চালানো এক যুবক তার পুরো ‘প্রোপাগান্ডা ইন্ডাস্ট্রি’র জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি!’
উল্লেখিত মন্তব্যে কিন্তু গণমাধ্যমগুলোর জন্যও একটি সাবধান বাণী রয়েছে। পুরো মিডিয়া যদি পকেটবদ্ধ হয়, তবে সোশ্যালমিডিয়া কিন্তু তাদের প্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে দাঁড়ায়। আর এতো বড় মাপ ও মানের প্রতিদ্ব›দ্বী যাকে ধরতে একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতিকেই বাজিতে ধরতে হয়। বিমান হাইজ্যাকের মতন ঘটনা ঘটাতে হয়। প্রয়োজনীয় আরেকটা মন্তব্য তুলে দিই মানবজমিন থেকেই। ডেভিড কারুসো নামে একজন বলছেন, ‘একজন মাত্র যুবকের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য স্বৈরশাসক তার অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলেছেন।’ ঘটনাটি তাই, ইউরোপিয় ইউনিয়ন বেলারুশের বিমান চলাচলে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধ করেছে। গদি টিকিয়ে রাখতে স্বৈরশাসকরা দেশের অর্থনীতি কেন, দেশকেও বাজিতে ধরতে পারে। লেন্দুপ দর্জি যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এরা সামান্য সমালোচনা নিতে পারেন না। এই না নিতে পারার কারণ ক্রোধ নয়, ক্ষমতা হারানোর ভয়।
যাদের মানুষে আস্থা নেই এবং যারা বাহিনী আর বন্দুকে আস্থা রাখেন তাদের অবস্থা এমনই হয়। তারা দড়িকে সাপ ভেবে ভয় পান, অন্ধকারে আলোর নাচনকে ভ‚ত ভাবেন। তাদের সবসময় মনে হয়, ‘এই বুঝি গেলো।’ স্বৈরশাসকদের আরেকটা বিষয় হলো সবকিছুতে নিজেকে জাহির করা, আমিত্ব প্রকট করা। উদাহরণ দিই। উত্তর কোরিয়ার কিম আঁটোসাঁটো জিন্সের প্যান্ট পরা নিষিদ্ধ করেছেন। কম্যুনিস্ট উত্তর কোরিয়া’র অবস্থা দেখেন। নিজেকে জাহির করতে অন্যের পোশাকে হাত দিতে হয়। যাকগে, গণমাধ্যমের কথায় আসি। লাইন দিয়ে সুবিধালাভের লোভে কিংবা মাথা বাঁচানোর আশায় অ্যালেক্সজান্ডার’দের পেছনে দাঁড়ানোর কোনো মানে নেই। বিশ্ব এখন অনেক এগিয়েছে। খবরের জন্য গণমাধ্যম ছাড়াও রয়েছে সামাজিকমাধ্যম। গণমাধ্যম ছেড়ে বিশ্বের অনেক দেশেই সাংবাদিকরা সামাজিকমাধ্যমকে বেছে নিয়েছেন। কাজ করছেন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে। সুতরাং বালিতে মুখ গুজে নিজেকে লুকানোর চেষ্টা এখন বৃথা এবং হাস্যকর। লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত