প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাহবুবুর রহমান: মানবিক, সামাজিক ও শিক্ষার উন্নয়নে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অপরিহার্য

মাহবুবুর রহমান, ডেনমার্ক থেকে: আমি একজন প্রবাসী বাংলাদেশী। বৈশ্বিক করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারনে দুই বছর দেশে যেতে পারি নাই,তবে প্রতি বছরই জুন মাসের শেষের দিকে বাচ্চাদের স্কুল- কলেজ বন্ধের সময়টা পরিবার সহ বাংলাদেশে যাওয়া হয়ে থাকে।যদিও আজকাল আমার মা ও আমার গিন্নির মা দুইজনেই বার্ধক্য জনিত কারনে প্রায়ই অসুস্হ থাকেন। ডেনমার্ক থেকে ফোন করলে মা বলেন, বাবা কতদিন তোকে দেখি না,আই বাবা একবার ঘুরে যা,এটাই প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তি বলে আমার মনে হয়।জীবনে মা’য়ের কথার অবাধ্য হয় নাই । মা আমার জীবন,মা আমাকে অদ্যবধি অনেককিছু শিখিয়েছে কিন্তু একটা জীনিস এখনও শেখায়নি সেটা হলো,আমি তোমাকে ছাড়া কিভাবে বাঁচবো মা? তোমারে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ আমি দেখতে পাই,আমার স্বপ্নে চেতনায় এবং জাগরণে । তোমার সুস্হতা ও ভাল থাকার মধ্যেই আমি প্রতিদিন সুস্হ হয়ে বেঁচে আছি,সূদুর আট হাজার কিলোমিটার দুরে বাল্টিক সুমদ্রের ধাঁরে,একসময়ের ডাকাতের জাতি বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম সভ্য দেশ এবং মানবিক গুনে গুণান্বিত মানুষের দেশে।

একটা বিষয় বারবার মনে পড়ে,যতবার বাংলাদেশ থেকে কোপেনহেগেন,ডেনমার্ক এয়ারর্পোটে এসে পৌঁছেছি এবং ডেনিশ ইমিগ্রেশন পাসপোর্ট চেক করার শেষে ডেনিশ পুলিশকে বলতে শুনেছি “ভ্যালকাম ইয়েম” অর্থাৎ তোমার বাসস্থানে স্বাগতম। তখন মনে পড়ে যায় আমার জন্মস্হান,আমার ভালবাসার প্রাণের বাংলাদেশের কথা,যার ভাষায় আমি কথা বলি,বিদেশে থেকেও বাংলার খাবার খাই হাত দিয়ে,স্বপ্ন দেখি গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটার,সে আমার বাংলাদেশ ,ঢাকা এয়ারর্পোটে ইমিগ্রেশন সার্ভিসের উল্টো এবং দুর্বল কার্যক্রম প্রবাসীদের ব্যর্থিত করে। সত্য বলতে কি বিদেশে না থাকলে বুঝিতেই পারতাম না দেশটাকে এতো ভালবাসি।পৃথিবীর যে সকল জাতি বা গোষ্টি তাঁদের মাতৃভূমি ও স্বাধীনতার জন্য লড়ছে বা লড়াই করছে তাঁরা বুঝতে পারে স্বাধীন দেশ বা ভূখন্ড কতোটা মূল্যবান। আর আমরা প্রবাসীরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার পরেও নিজ দেশে প্রবাসী এবং অন্যদেশে পরাধীন।

আর একটা তাজ্জব ব্যপার অতি সূক্ষভাবে আমি লক্ষ করেছি, ঢাকা শহরে ধানমন্ডি, গুলশান, উত্তরা বনানীসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার অনেক অ্যাপার্টমেন্টে নোটিশ ঝুলতে দেখেছি, গৃহকর্মী ও ড্রাইভাররা লিফট ব্যবহার করতে পারবেন না। ভদ্রলোকদের লিফটে ড্রাইভার ও গৃহকর্মীরা উঠলে তাঁদের জাত বা ইজ্জত চলে যায়। কিন্তু সেখানে লিখা থাকার কথা ছিল,যাদের বাপ-দাদা রাজাকার, যারা ঘুষখোর তাঁরা ও তাঁদের বাচ্চারা,দেশে বাস করে যারা দেশের বিপক্ষে কাজ করে তাঁরা,দেশের টাকা আত্বসৎ করে যারা বিদেশে পাঠাই তাঁরা,ব্যাংক ও রাষ্ট্রীয় টাকা যারা আত্বসৎ করে তাঁরা,অবৈধ টাকার মালিক ও তাঁদের বাচ্চারা,দুনির্তিবাজ নেতা ও কর্মচারীরা,অবৈধ টাকার মালিকরা,মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের সাথে জড়িত তাঁরা এবং তাদের বংশধররা,চোরা কারবারি কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা ও তাঁদের বংশধরা “লিফট “ব্যবহার করতে পারবে না এবং উঠা-নামার ক্ষেত্রে সিঁড়ি ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এই “লিফট”শুধুমাত্র খেটে খাওয়া এবং সৎ মানুষদের ব্যবহার জন্য এবং যার নির্দেশনামা প্রকাশ করা উচিত। আরও অনেক বিষয়ের মধ্যে একটি বিষয় সমাজে লক্ষ করলে দেখা যায়, আমাদের দেশের মানুষের সামাজিক মূল্যবোধ,পারিবারিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ দিনদিন কমে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের একান্নবর্তী পারিবারিক বন্ধন।

আজকাল সবকিছুই টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়। আপনি ঘুষখোর কিৎবা চোর-ডাকাত সেটা কোন ব্যপার না। আপনি যতুই জ্ঞাণী কিৎবা সৎ হউন না কেন? কোন দাম নাই,মূল্যায়ন নাই,কারণ আপনার টাকা নাই,নিজের বাড়ী-গাড়ী নাই,দুই চারটা এপাটমেন্ট নাই পরিচয় দেওয়ার মতো কিছুই নাই আপনার, আছে শুধু আত্বসস্মান বোধ ও মধ্যবিত্তের অহংস্কার নিয়ে বেঁচে থাকা। কোন ব্যক্তি সৎ চাকুরিজীবী কিৎবা শিক্ষক হলে তো ধরেই নেওয়া হয়,তাঁর উপরি ইনকাম নাই, মানে সামাজিক সস্মান পাওয়ার যোগ্যতাও নাই।আজকাল সস্মান টাকা দিয়ে কিনতে হয়। ঈদের আগে গাড়ী ভর্তি জামা-কাপড় গরিবদের মাঝে বিতরন করতে না পারলে,কিৎবা কোরবানীর ঈদে দুই-চারটা মোটা তাজা গরুর বা ছাগলের ছবি ফেসবুকে পোষ্ট না করলে স্ট্যাটাস থাকে না। এই বিষয়ে ধর্মীয় বিধানও মানি না,সাথে ধণী-গবীবের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করার জন্যই ধনতন্ত্রের দেশে ধনীদের আইন চলমান। সামাজিক অস্থিরতার কারনে মানুষগুলি আজ মানুষিক ভাবে অসুস্হ হয়ে উঠছে।সমাজে যোগ্যতার প্রতিয়োগিতার পরিবর্তে, অসুস্হতার প্রতিযোগীতায় আমরা সবাই ব্যস্ত।এর প্রভাব নতুন প্রজন্মের মধ্যেও গভীরভাবে লক্ষনীয়। ডিজিটাল যুগে এনালগের সুবিধাগুলিও প্রয়োজন যেটা তাঁদেরকে ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

তাই তো বলতে শুনি আজকালের ছাত্র-ছাত্রীরা ইংরেজী ও কম্পিউটারে অনেক ভাল,তবে কাগজ কলমে লিখতে গেলে বড়ই ভেজাল। আর শিক্ষার মানের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায়,সামান্য অংশই অতি উচ্চ মানদন্ডে,বাকীরা মেরুদন্ডহীন সার্টিফিকেটের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিৎবা মাষ্টার্স ডিগ্রীধারী পাস। বর্তমানে খুব বেশী ছাত্র-ছাত্রী জ্ঞান অর্জন করার জন্য পড়াশুনা করে না।জ্ঞান হচ্ছে নিজের আলো যা দিয়ে অন্যকে বা পৃথিবীকে আলোকিত করা যায়,যা সস্পুর্ণ নিজস্ব সত্বা শুধু বিলিয়ে দেওয়া যায় এবং যা ব্যক্তি জীবনের উৎকর্ষ সাধন করে। শিক্ষা মানুষকে নীতিবান ও বিবেকবান করে তোলে এবং জাতি গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে,তাই বাংলাদেশের জন্য বিজ্ঞান ভিত্তিক সৃষ্টিশীল জাতীয় শিক্ষানীতি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে গাদা গাদা বই থাকবে না,আর বইয়ের পড়া মুখস্ত করে শিক্ষকে উপস্হাপনের বিষয় থাকবে না।আপনার ছোট বাচ্চাটি কবিতা মুখুস্ত করে কি শিখছে? বাবা- মা’য়েদের চিন্তা করে দেখা উচিত। ছোট ছোট বাচ্চাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটি খেয়াল রাখতে হবে। সাথে বাচ্চারা বড় হয়ে কি হতে চাই সেটা বাবা-মা’য়েরা নির্ধারণ না করে, আপনার বাচ্চার কোন বিষয়ে পড়তে ভাল লাগে সেটা খেয়াল করুন।পড়াশুনা বা বড় হওয়ার ক্ষেত্রে আপনার বাচ্চার ইন্টারেস্টিং জায়গাটা খুঁজে বের করুন। নিজের অপরাগতা ও দুঃস্বপ্নের কারনে বাচ্চাকে দিয়ে স্বপ্ন পূরণের অভ্যাস ত্যাগ করা উচিত। কারন আমরা প্রতিটি মানুষ বিশেষ কোন বিষয়ে বা ক্ষেত্রে জিনিয়াস,যেটা সময় সুযোগ,পরিবেশ,বাস্তবতার কারণে পরিস্ফুটিত হয় না।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ডেনমার্ক আওয়ামী লীগ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত