প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী: বাড়ির পাশে আরশিনগর, নেপাল ও শ্রীলংকার রাজনীতিতে ভারত

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী: নেপালের এখনকার প্রেসিডেন্ট পুষ্প কমল দহল প্রচণ্ডের জীবনে তার ডেপুটি ছিলেন বাবুরাম ভট্টরাই। তিনি দিল্লীর নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেক্টে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। নেপালে ফিরে গিয়ে সোজা দহলের সাথে যুদ্ধে যোগ দেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বাবুরাম ভারতের বিরুদ্ধে প্রক্সিযুদ্ধে কখন ফ্রন্টলাইনে আসেন ? জানা নেই। সরকারের বিরুদ্ধে শ্যাডো ওয়ার গেমে দিল্লীতে থাকাকালীন সময়ে তার ভুমিকা কী ছিল জানা নেই। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, ভারত তাদের দেশে পড়তে যাওয়া উপমহাদেশের শিক্ষার্থীদের উপর কড়া নজর রাখে। যেসব ‘মাল’ জানে যে, সে ভারতে থাকা কিংবা বাংলাদেশে থাকায় আলাদা কোনো মানে বহন করে না এবং নিজের কিছু করার যোগ্যতা নেই। এরাই সাধারনত ফরমায়েশি কামলা দিতে দিতে দুই একজন ভারতের কর্তা ব্যক্তিদের বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেন তো কেউ বিগড়ে বসেন। বাংলাদেশের নুর এবং প্রয়াত কবি শহীদ কাদরির বেলাতেও একই ঘটনা।

 

কবি সাহেব ক্ষেপে গেলেন ভারতের দূতাবাসের কোনও এক কাণ্ডে। ‘বালের চাকরি করি ন ‘ বলে চলে আসলেন তো নুর সেটাকে সমর্থন দিয়ে বসে রইলেন। নুর কি পাশ করে ওদের দুতাবাসে চাকুরি জুটিয়েছিলেন তা জানা নেই, তবে তিনি তাদের কল্যানে যে এমপি মন্ত্রী হয়েছেন সে বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই। তারা দ্বিতীয় যে পন্থায় তাদের দালাল বানায় সেটা হলো সামান্য ও মাঝারি গোছের লোকেদের মধ্যে কারা কারা ইন্ডিয়া বলতে অজ্ঞান…… আবার এদেশের সরকারী নবীন চাকুরেদের ১০০ জনকে প্রতিবছর ভারত তাদের দেশে ঘুরতে নিয়ে যায়,তাদের প্রেসিডেন্টের সাথে ডিনার করায়। ওপাড়ে ঘুরতে যাবার সময় কেউ কেউ ওপাড়ের প্রেসিডেন্টের জন্য উপহার নিয়ে যান। প্রেসিডেন্ট জিগেস করেন, এটি কে পাঠিয়েছে ? অমুক পাঠিয়েছে। তাকে একটু আদর করে দেন খোদ ভারতের প্রেসিডেন্ট। ব্যাস হয়ে গেল। ভবিষ্যতের জন্য নতুন একজন বিশ্বস্ত গোলাম তাদের তালিকাতে যুক্ত হয়ে গেল। এই মেধাশুন্য ছেলেগুলা ভারত যাবার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত চলে বাপ চাচার পরিচয়ে। বাপ চাচারা মরার আগে ওদেরকে দিয়ে যায় দাদাদের হাতে…… আমাদের দেশে দালাল এভাবে বাড়তে-ই থাকে। এদের ওপর নজর রাখার চেষ্টা বোধহয় আমাদের দেশের নেই।

 

মূল কথায় যাই, এখন বাবুরামকে ভারত পিক করল নাকি বাবুরাম ভারতে ছিল নিজেদের সমন্বয়ের জন্যে সেটাও জানা নেই। জানা নেই ভারত তাকে কোনো এ্যাসাইনমেন্টের জন্যে পিক করেছিল কিনা !! জানি শুধু, দহল যে কারণে ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল, একই কারন তো বাবুরামের বেলাতেও খাটে- কই তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে ভারতের আপত্তি আছে এমন কিছু কিন্তু কখনো-ই তো শুনিনি। ফলে ধরে নেয়া যায় বাবুরাম ভারতের রিক্রুট না হলেও ভারতের সাথে সে ঠিকই একটা গ্রহনযোগ্য অবস্থান বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছিল। যার পরিণতিতে অগাস্ট ২০১১ থেকে মার্চ ২০১৩ পর্যন্ত তিনি নেপালের ৩৫ তম প্রধানমন্ত্রীরুপে দেশ পরিচালনা করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে,ভারতের নির্বাচনকালীন সময়ে ভারত সবচে বেশি আন্তর্জাতিক অপরাধ করেও পেয়ে যায় প্রধানত দুটি কারণে। এক, প্রতিবেশি দেশগুলোর মিডিয়া, সংখ্যালঘু এবং এক শ্রেনীর স্লিপার সেল তাদের থাকে যাদেরকে প্রয়োজনে জাগিয়ে তুলতে পারে। এদের অতি চিৎকারে এদেশের মানুষের বিচার পাবার অধিকার হারিয়ে গেছে চিরকালের জন্যে। এরা ভারতের পক্ষ নিয়ে পশুর মত চিৎকার করতে থাকে। আবার নেপাল বাংলাদেশের মত পড়শি রাষ্ট্রগুলো ভারতের নির্দিষ্ট কোনো সরকারকে অভিযুক্ত করতে পারে না। ভারত টিকে থাকে রাজার হালে। জাতীয় স্বার্থে তারা সবাই এক হতে পারে কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় আর কাউকে তারা এই স্বাধীনতা দিতে চায় না। তারা কি সেটা আটকে রাখে ? না। তারা অপর দেশের মিডিয়া এবং মুরগিদের দিয়ে আগে আগে ভারতের পক্ষে কথা বলাতে থাকে। এ কথা আগেও বলেছি। ২০১১ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দহল ক্ষমতায় থাকতে পারুক বা না পারুক তারা অতি অবশ্যই ভারতের গুণ্ডামি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করার সাহস নেপাল দেখিয়েছে। চলুন শ্রীলংকার দিকে তাকাই।

 

শ্রীলংকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে তার প্রথম সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে অভ্যন্তরীণ সমস্যায় অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পরেন। শ্রীলংকা যতবার এলটিটিই দমনের চেষ্টা করেছে ততবার-ই ভারত তাদের প্রক্সি হয়েছে। আবার শ্রীলংকা যখন ভারতের সেনা ভাড়া চাইলো তখন ভারত দুই পক্ষকেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লেলিয়ে দিল। এসবের জের ধরেই রাজিব গান্ধী হত্যা। যদিও তখন মাহিন্দা রাজাপাকসে কিংবা চন্দ্রিকা কুমারাতুংগারা ক্ষমতায় আসেননি। একুশ শতকের মাঝামাঝি সময় নাগাদ শ্রীলংকায় জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এর একটা বড় কারন ছিল তামিল বিষয়ে ভারতের নানামুখী এবং হিপোক্রেটিক কাণ্ডকারখানা। যেমন ভারত সরকার যখন লংকাকে সাহায্য করার জন্য যায় তখন তারা নিজেরাই নিজেদেরকে রাবন ভাবতে শুরু করে। এ আচরণ জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে মেনে নেয়া আসলেই কঠিন। এছাড়াও তামিলদের আলাদা স্বাধীন ভুমি দিতে তামিলনাড়ুর প্রতিটা ঘর মাসিক চাঁদা দিত ভেলুপিল্লাই প্রভাকরনের হাতকে শক্তিশালী করতে। অবস্থা এমন দাড়িয়েছিল যে, জাফনার গহীন বনে ভেলুপিল্লাই ছোটোখাটো রানওয়ে নির্মাণ করে ফেলেছিলেন। সরকারী সেনারা জাফনায় ডিউটি করত মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে। ভেলুপিল্লাই বিমান ঘাঁটি বানানোর পর মিনি টহল সাবমেরিন সংগ্রহ করেছিল বলে জানা যায়। গেরিলা দল হিসেবে এরা সে সময় বিশ্বে এক নাম্বারে ছিল। পরবর্তীতে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও এক নাম্বারে চলে আসে এলটিটিই।

 

রাজীব গান্ধী হত্যা নিয়ে ভারতের খুব গোস্যা হবার কারন দেখিনা। এ হত্যার অন্তত দেড়মাস আগে জার্মান গোয়েন্দারা ভারতকে অফিশিয়ালি জানিয়েছিল রাজিবকে হত্যা করা হবে। একজন নারী ও দুইজন পুরুষ সমেত তিনজনের একটা দল ৩৪ কিমি নৌপথ পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। ভারতের গোয়েন্দারা সেসব আমলে নেয়নি। ত্যাক্ত বিরক্ত শ্রীলংকান সরকার ৯০ এর গোড়ার দিকে ভারতীয় নৌ সেনাদের তাড়িয়ে দিলে ভারতের সাথে শ্রীলংকার সম্পর্ক খারাপের দিকে মোড় নেয় সত্য কিন্তু প্রভাকরন ও এলটিটিইর ক্ষমতা বাড়তে থাকে দিনকে দিন। ৯০ এর দশকে-ই শ্রীলংকার স্বাক্ষরতার হার ছিল শতভাগ। ভারতের হিংসার যেসব কারণ ছিল, এটি তার মধ্যে অন্যতম। এশিয়ার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দরনায়েকের সুযোগ্য কন্যা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা চন্দ্রিকা কুমারাতুংগা শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রীর আসনে আসীন হন নির্বাচনী ব্যবস্থা পাড়ি দিয়ে। সাল; ১৯৯৪- ১৯৯৮। তারপর প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। এর আগে দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন রানাসিংঘে প্রেমাদাসা ( ১৯৮৯-১৯৯৩ )। ইনিও প্রবল জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট ছিলেন। অকালে এলটিটি-ইর বোমা হামলায় যিনি নিহত হন। শ্রীলংকায় ডানপন্থীদের বিজয়রথ চলে আসছে ৭০ এর দশক থেকেই। প্রেমাদাসা হত্যাকান্ডকে নিয়ে আছে নানান কনস্পিরেসি থিউরি। আজকের প্রসংগ সেটা নয়। বলছি ভারতবেষ্টিত সকল দেশে-ই এখন ডানপন্থীদের জয়জয়কার। ভারতের উগ্রবাদ উপমহাদেশকে এক কনসেপ্টে আনতে বাধ্য করেছে বলে-ই মনে হয়। ভারতের কংগ্রেস কিংবা বিজেপিতে আলাদা কোনো পার্থক্য নেই। দুটো-ই উগ্র চরমপন্থী দল। ভারত যদি কখনো ভাল শাসক পেয়ে থাকে তবে সে হচ্ছে এস ডি দেবগৌড়া এবং ভিপি সিং। এরা কেউই আধা মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি কংগ্রেসের অত্যাচারে। ভারতের অত্যাচারে উপমহাদেশে সত্যিকার সেক্যুলারিজম ডেভেলপ করতে পারেনি। আমরা যে সেক্যুলারিজম কিংবা যে নির্বাচন কমিশন দেখি তা ভারতের নিঃশ্বাসের সাথে উঠা নামা করে। যা বলছিলাম, প্রেমাদাসা হত্যাকাণ্ড ছিল শ্রীলংকার নিয়তি। শপথ নেয়ার পর চন্দ্রিকা কুমারাতুংগা শান্তির বার্তা দেন তার প্রথম প্রতিক্রিয়াতেই।

 

চাল ডাল তেল রসদ ওষুধ চিকিৎসকদের সম্মিলিত একটি দল সমেত ১০০ বগির ট্রেন পাঠান জাফনায়। এটি ছিল তার সরকারের সর্বপ্রথম কাজ। তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে চান। মন্ত্রীপরিষদকে নির্দেশ দিলেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নের জন্য যেন ১০০ কোটি ডলারের পরিকল্পনা প্রনয়ণ করা হয়। তিনি প্রভাকরনের সাথে হ্যান্ডশেক করবেন আর সেজন্যই এত প্রস্তুতি। ফুলে ফুলে সাজানো রসদ ভর্তি ট্রেনটিকে সবুজ পতাকা নেড়ে বিদায় জানান স্বয়ং চন্দ্রিকা কুমারাতুংগা। জাফনাকে কেন্দ্র ধরে শ্রীলংকাকে শান্তির দ্বীপে পরিনত করতে চান প্রেসিডেন্ট মিসেস কুমারাতুংগা। শান্তির ট্রেন জাফনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ১৩-১৪ বছরের এক বাংলাদেশী যুবক প্রচন্ড অনিশ্চয়তা নিয়ে তাকিয়ে থাকে চলে যাওয়া ট্রেনটির দিকে। সে বিশ্বাস করেনি এতে শান্তি ফিরবে। ট্রেনের মিছিল কি আসলেই শ্রীলংকার আভ্যন্তরীন উত্তাপকে প্রশমিত করতে পেরেছিল ? প্রভাকরন চন্দ্রিকার দিকে তার হাত বাড়িয়ে দিলেন। তার উদ্দেশ্য কি ছিল ? শান্তির হাটে কি সে নৌকা পৌঁছেছিল ? (দ্বিতীয় পর্বের শেষ)

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী: কলাম লেখক

সর্বাধিক পঠিত