প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশে অপার সম্ভাবনার নীল অর্থনীতি 

মেহেদী হাসান: নীল অর্থনীতি বা হল Blue economy সামুদ্রিক অর্থনীতির বিকাশ। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমুদ্র এবং সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার। বেলজিয়ামের গুল্টার পউলি উত্থাপিত এই ধারনাটি ২০১২ সালে রিও সম্মেলনে স্বীকৃত হয়।
নীল অর্থনীতির পরিসর অত্যন্ত বিস্তৃত। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বন্দর, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ, সমূদ্র উপকূলের লোনা জলে মাছ ও লবন চাষ, খনিজ সম্পদ আহরণ, পর্যটন, সামুদ্রিক জীবাশ্ম আহরণ, খনিজ সম্পদ আহরণ, নীল শক্তি ব্যবহার করে জ্বালানী উৎপাদন, ইত্যাদি।

নীল অর্থনীতির রয়েছে অনেকগুলো শক্তিশালী ক্ষেত্র রয়েছে যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নীল শক্তি। উপকূলবর্তী অঞ্চলে সামুদ্রিক ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে জোয়ার ভাটায় বিদ্যুৎ উৎপাদন। সামুদ্রিক ঢেউ ব্যবহার করে বিদুৎ উৎপাদন। সমুদ্র স্রোত ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন। সমুদ্র তীরে বা আগভীর সমুদ্রে বা চরাঞ্চলে সোলার প্যানেল স্থাপন করে বা বাতাস কল ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন। মহাসামুদ্রিক তাপীয় শক্তি– মহাসমুদ্রের গভিরের শীতল জল এবং নিরিক্ষীয অঞ্চলের সমুদ্রের উপরিভাগের উষ্ণজল এর তাপমাত্রার তফাৎ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন। জীবাশ্ম জ্বালানি হতে বিদুৎ উৎপাদন।

নীল শক্তির বাইরেও জলজ চাষ, সামুদ্রিক পর্যটন, সামুদ্রিক খনিজ সম্পদ, নীল জৈবপ্রযুক্তি, অভ্যন্তরীন নৌ পথ এবং সমুদ্র তীরের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডসহ আরও অনেক ক্ষেত্র রয়েছে নীল অর্থনীতির।

২০১২ সালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বিষয়ক বিশ্ব সম্মেলনে নীল অর্থনীতি স্বীকৃতি পায়। ৯ অক্টোবর ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত ভারত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা এ্যাসোসিয়েশনের মন্ত্রী পরিষদের সভায় নীল অর্থনীতি ধারনাটি সদস্য রাষ্টগুলো কতৃক গৃহীত হয় এবং ভারত মহাসাগরকে ঘিরে কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র বিমোচন ও টেকসই ব্যবসা ও অথনৈতিক উন্নয়ন মডেল তৈরিতে সকলে একমত পোষণ করে।

নীল অর্থনীতি বিষয়ক ইন্ডিয়ান ওশেন রীম এ্যাসোসিয়েশনের প্রথম মন্ত্রী পরিষদের সভা ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মরিশাস এ অনুষ্ঠিত হয়, ২০১৭ সালে মে মাসে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় এবং ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ১৯তম সভা আবুধাবীতে অনুষ্ঠিত হয়।

১৯তম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে ০৩-০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ এ টেকসই নীল অর্থনীতি উন্নয়ন সংক্রান্ত ঢাকা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং বাংলাদেশের মানণীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা উক্ত সম্মেলন উদ্ভোধন করেন।

বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির বিষয়টি উঠে আসে মূলত মিয়ানমার ও ভারতের সাথে ২০১২ সালে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ সংক্রান্ত বিরোধের পর থেকে। ২০১৪ সালে হেগের আর্ন্তজাতিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশকে বঙ্গোবসাগরের ১,১৮,৮১৩ বর্গ কিমি বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে সামুদ্রিক সম্পদ অন্বেষণ, শোষণ, সংরক্ষণ ও পরিচালনার একচেটিয়া অধিকার দেয়া হয়।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দাবী সমূদ্র সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আদালত কর্তৃক ১৪ মার্চ ২০১২ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সমূদ্রসীমা নির্ধারণ সংক্রান্ত রায়ে বাংলাদেশ ১,১১,৬৩১ বর্গ কিমি সমূদ্র এলাকা এবং মিয়ানমার ১,৭১,৮৩২ বর্গকিমি সমূদ্র এলাকা প্রাপ্ত হয়।

নেদারল্যান্ডের হেগের আন্তর্জাতিক স্থায়ী আদালত কর্তৃক ২০১৪ সালে প্রদত্ত রায়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২৫,৬০২ বর্গ কিমি বঙ্গোবসাগরের বিরোধপূর্ণ সমূদ্র এলাকার মধ্যে বাংলাদেশ ১৯,৪৬৭ বর্গ কিমি এলাকা প্রাপ্ত হয়।

বঙ্গোবসাগরের নীল জলের নীচে বিশাল সম্পদের ভান্ডার রয়েছে, যার টেকসই ব্যবহার, আহরণ ও সংরক্ষণের জন্য বিশেষ নীতিমালার জরুরী প্রয়োজন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার বেশ কয়েকটি আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে।

বর্তমানে দেশের আমদানি-রফতানির ৯৫ শতাংশ বঙ্গোপসাগর নির্ভর। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী উপসাগরের ২০০ নটিক্যাল মাইল ( ১ নটিক্যাল মাইল = ১.১৫১ মাইল ) অবধি একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল। এ ছাড়াও সমুদ্র তীরে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার এখন চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর হতে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত।

বিশ্বের ৬৪৮টি উপসাগরের মধ্যে বঙ্গোপসাগর বৃহত্তম উপসাগর এবং বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ডের প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মানুষ বঙ্গোপসাগরের উপকূল রেখায় বাস করে।

বাংলাদেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বাস করে এবং প্রায় ৩০ মিলিয়ন মানুষের জীবন ও জীবিকা (মৎস, কৃষি, নৌপরিবহনের ও পর্যটন) এর উপর নির্ভরশীল।

বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৮ সালের এক গবেষনা অনুসারে, সমুদ্র বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ১.২ বিলিয়ন টাকা মূল্য বা ৩.০৩ শতাংশ জিডিপিতে অবদান রাখছে।

তারমধ্যে পর্যটন ও বিনোদন (২৫%), সামুদ্রিক মৎস ও জলজ পালন (২২%), পরিবহন (২২%), অফসোর তেল/গ্যাস উত্তোলন (১৯%), জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙ্গা (৯%) এবং খনিজ (৩%) রয়েছে।

মৎস ও জলজ চাষে সম্পূর্ণ ও খন্ডকালীন কর্মসংস্থানে ধরা হয়েছে ১৩ লক্ষ এবং সমুদ্রতীরে লবন উৎপাদন ও জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পে দেড়লাখ মানুষ নিযুক্ত রয়েছে।

আর্ন্তজাতিক আদালতের রায়ে জয় করা নতুন সামুদ্রিক সীমানায় তেল ও গ্যাসের এক সম্ভাবনাময় মজুদের আশা করা যাচ্ছে। এছাড়াও শিপ বিল্ডিং এবং শিপ ব্রেকিং ভবিষতের দিনগুলিতে বড় আকারে বৃদ্ধি পাওয়ার এবং পর্যটন খাতে পরবর্তী দশকে প্রতিবছর ৯.০০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বিশাল জনসংখ্যার কর্মসংস্থান, জ্বালানী শক্তির ঘাটতি মোকাবেলাসহ রপ্তানীর মাধ্যমে জিডিপি বৃদ্ধিতে নীল সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার/আহরনে মনোযোগী হওয়া আবশ্যক বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদগণ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত