প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাঈদ তারেক: দুরপাল্লার বাস, লঞ্চ, ট্রেন, ফেরি খুলে দিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত যাতায়ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে গাদাগাদি করে বাড়ি ফেরার চাইতে বেশি সংক্রমণের আশঙ্কা নেই

সাঈদ তারেক : নানাবিধ ভোগ-বিলাসে মত্ত বিত্তবান এবং শহুরে আরাম-আয়েশে মগ্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির একদল উন্নাসিক মনে করেন ঈদ চান্দে ছুটিছাটায় মানুষ বুঝি আনন্দ ফুর্তি করার জন্যই গ্রামের বাড়ি যায়। যেন বাড়ি যাওয়াটা তাদের একধরনের বিলাসিতা। ধারণাটা ঠিক না। এই মহামারির মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে যারা পথে বেরোন তারা গরু ছাগল না, পরিস্থিতির গুরুত্ব কেউ যে কম বোঝেন তাও না। সবাই সচেতন। তারপরও যখন গাট্টীবোচকা নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় বুঝতে হবে নিদারুন ঠ্যাকায় পড়েই জেনেবুঝেই এই দুর্ভোগ যাত্রা। ঢাকা শহরে বসবাসকারি পঞ্চাশ থেকে ষাট লক্ষ মানুষের পরিবার পরিজন থাকে গ্রামের বাড়িতে। তাদের অধিকাংশই নিম্নআয়ের মানুষ, খুবই অল্প বেতনের চাকুরে। পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়া বা কিছুদিন একসাথে কাটানোর জন্য ঈদ চান্দের লম্বা ছুটিগুলোই একমাত্র উপায়। অনেকে আছেন ছুটিতে ঢাকায় থাকার মতো অবস্থা থাকে না, বাধ্য হয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যেতে হয়। ঈদের মধ্যে কারো বাবা মা অপেক্ষায় থাকে স্ত্রী সন্তানরা আশায় থাকে পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি কখন আসবে। অনেকের পারিবারিক কিছু কাজ থাকে, পরিবারের কেউ অসুস্থ হতে পারে। নানা কারণেই লম্বা ছুটিতে মানুষকে বাড়ি যেতে হয়। এটাই আমাদের ঐতিহ্য, কালচার। আবহমান কাল ধরে প্রতিবার ঈদেই তাই হয়ে আসছে। এই নিরুপায় মানুষ ঢাকা ছাড়তে শুরু করলেই ওই উন্নাসিকগুলো ‘সব গেল সব গেল’ রবে মাতম শুরু করে দেন। গতবার ঈদেও সবকিছু বন্ধ করা হয়েছিল, কিন্তু মানুষের ঘরেফেরা ঠেকানো যায়নি। তখনও একই রবে চীৎকার চেঁচামেচি শোনা গেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল মানুষের এই যাতায়তে সংক্রমণের কোনো হেরফের হয়নি। এবার অবশ্য ভিন্ন চিত্র। সব খোলা শুধু দুরপাল্লার বাস ট্রেন লঞ্চ বন্ধ। কাদের স্বার্থে বা সুবিধার্থে এই ব্যবস্থা বোধগম্য নয়। তাতে কি মানুষের ঘরেফেরা আটকে রাখা গেছে না যাচ্ছে। ব্যয় বেড়েছে চার থেকে পাঁচগুন।
ঈদ বোনাস কামাই হয়ে গেছে বিশেষ এক ধরনের মানুষের। দুইদিন ফেরিঘাটগুলোয় ঘরমুখো অসহায় মানুষদের বাড়ি ফিরতে মরনপন সংগ্রামের দৃশ্য দেখে সারা দেশের বিবেকবান মানুষের হৃদয় যখন আলোড়িত তখনও ওই উন্নাসিককুল বলছে সরকারি নির্দেশ অমান্য করে বাড়ি ফিরতে চাওয়ার অপরাধে হতভাগা মানুষগুলোর বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। কি অদ্ভুত মানসিকতা। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ রাস্তায়। ভেঙ্গে ভেঙ্গে, তিন চারগুন বেশি ভাড়া দিয়ে, আট সীটের গাড়িতে ময়দার বস্তার মত গাদাগাদি করে পনেরজন বসে গন্তব্যে যাচ্ছে, ফেরিঘাটে হাজার হাজার মানুষ পারাপারের অপেক্ষায় আহাজারি করছে, কই তাদের প্রতি সমবেদনা সহানুভূতি জানাবে সরকারের কাছে মানুষের ভোগান্তিমুক্ত নিরাপদ বাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করার দাবি করবে উল্টো এই লক্ষ লক্ষ মানুষের কঠোর শাস্তি দাবী করছে! বলিহারি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো সু-শীল সমাজ ন্যায়াধিকার মানবাধিকারের সোল এজেন্টরা- ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে কেউ টু শব্দটি করছেন না। যেন তারা মানুষ না, একপাল গরুছাগল। এই ঘরেফেরা মানুষগুলো নাকি সারা দেশে করোনা ছড়িয়ে দেবে, যেন সবাই একএকজন করোনার ডিপো। আচ্ছা বলুন যে লোক করোনায় আক্রান্ত এই ভীড় ঠেলে তার বাড়ি যাওয়ার মত শারিরীক অবস্থা আছে। হয় তাকে হাসপাতালের বেডে শুয়ে অথবা বাড়িতেই বসে থাকতে হবে। তাছাড়া এবারের ভাইরাস সময় দিচ্ছে না। ধরার বারো-পনের ঘন্টার মধ্যে জীবন মরন ফাইনাল করে দিচ্ছে। কাজেই ফেরিতে চেপে যাদেরকে নদী পার হতে হচ্ছে বা ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছে তাদের মধ্যে দুইএকজন বাহক থাকলেও তারাই যে সারা দেশে করোনা ছড়িয়ে দেবে এ এক অমুলক ধারণা। প্রধানত: তারা সমাজের নীচের স্তরের মানুষ, মেহনতি জনগন। তারা শারিরীক পরিশ্রম করে, এই শ্রেণির মানুষের ইমিউন শক্তিশালী। তাদের ভ্যাকসিন লাগে না এমনিতেই শরীরে এন্টিবডি তৈরি আছে।
তাদের মাধ্যমে করোনা সংক্রমনের শংকা পাঁচ পার্সেন্টও না। গত বছর তারা একইভাবে হুরোহুরি করে বাড়ি গেছে এসেছে, এমন কোনো প্রমান নেই তাদের মাধ্যমে গ্রামেগঞ্জে করোনা সংক্রমিত হয়েছে। যদি তাই হতো এতোদিনে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যেতো। দু:খের বিষয় এক শ্রেণির লোক নিজেরা আরাম আয়েশে ঘরে বসে অযথা জুজুর ভয় ছড়িয়ে চলেছে। এইযে সারা দেশে আজ পরিবহন নৈরাজ্য, এর জন্য দায়ী কে? একটিবারও তো কেউ ভাসুরের নাম মুখে আনছে না। টিভি নিউজে টক শো’র টকাররা ইনিয়ে বিনিয়ে শুধু পাবলিককে দোষারোপ করে চলেছে। কেন তারা বাড়ি যাবে। কেউ তো বলছে না কেন তাদের বাড়ি যাওয়া দরকার। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কাউকে তো কিছু বলতে দেখছি না। মানুষের এই যাতায়ত নিরুপদ্রুত করতে সরকারের প্রতি কাউকে দাবি জানাতে শুনছি না। একই বাহানা- ‘কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না’ আর ‘গ্রামে গিয়ে সবাই করোনা ছড়িয়ে দেবে’! এইসব উষ্ট্রপক্ষী কি জানে মানুষ এখন আগের চেয়ে কতো বেশি সচেতন। কতো পার্সেন্ট লোক মাষ্ক ব্যবহার করে। ঘরে কতোটা সাবধানতা অবলম্বন করে থাকে। তা যদি না করতো সংক্রমণ এবং মৃত্যু এমনি এমনি কমে আসে। এখানে সরকার বা কার কি কৃত্বিত্ব? যা কিছু কৃতিত্ব- পাবলিকের, আমজনতার। কোথাও কোনো পজিটিভ নিউজ নেই, শুধু হতাশা আতংক আর ভয় দেখানো। গণবিরোধী দালাল মিডিয়াগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগীতা করে শুধু একটাই পজিটিভ প্রচারণা চালাচ্ছে- সমস্ত প্রশংসা সরকারের।
প্রথম থেকেই বলে আসছি ‘না ঘরকা না ঘাটকা’গোছের তথাকথিত কঠোর লকডাউন এক ধরনের তামাশা ছাড়া কিছু না। এখানে মাঝামাঝির অবকাশ নেই। শতভাগ কঠোরতা আরোপ বা বাস্তবায়ন যখন সম্ভব না ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক করে দেওয়াই উত্তম। সরকার সে পথেই গেছে। একে একে সবই খুলে দিয়েছে। ভালো কথা। দুরপাল্লার বাস ট্রেন লঞ্চ কেন বন্ধ রাখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল মানুষ যেন এক জায়গা থেকে অন্যত্র যেতে না পারে। কিন্তু সকল যানবাহন খোলা রেখে তা কীভাবে সম্ভব এই সাধারণ বোধটা কারো মাথায় কাজ করলো না। নীতিনির্দ্ধারকরা কি করে ধরে নিলেন দুরপাল্লার বাস বন্ধ রাখলেই মানুষ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যেতে পারবে না। তারও চেয়ে বড় কথা- এটা তো জানা ঈদে মানুষ বাড়ি যাবেই। তারা কেন মনে করলেন একটা প্রজ্ঞাপন বা হুকুম জারি করলেই সবাই সুবোধ বালকের মতো সুড়সুড় করে গিয়ে ঘরে বসে থাকবে। বাঙ্গালি কি সেই জাত। এটা বাঙ্গালির ঐতিহ্য। নানা কারণেই ছুটিছাটায় বাড়ি যাবে।
এইসব কর্তাব্যক্তিরা কি বিদেশ থেকে আগত। বাঙ্গালি চরিত্র মন মানসিকতা কেন বুঝবেন না। তারপরও যখন দেখা গেল হাজার হাজার মানুষ রওনা হয়ে গেছে, পথে পথে চেকপোষ্ট বসিয়ে আটকানো যায়নি- উচিত ছিল না কি বাস্তবতা মেনে নিয়ে তাদের নিরাপদ যাত্রাটুকু নিশ্চিত করা। একটি জনকল্যানধর্মী সরকারের তো সেটাই কাজ। উল্টো কি করা হলো- এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলো যাতে জনদুর্ভোগ আরো বাড়ে। ফেরিই বন্ধ করে দেওয়া হলো। আজ থেকে ঘাটে ঘাটে বিজিবি বসে গেছে। আল্লাহই জানেন হতভাগা মানুষগুলোর ভাগ্যে আরো কি কি দুর্ভোগ আছে। আমি জানিনা এইসব বুদ্ধি পরামর্শ কারা পাকান বা নীতিনির্দ্ধারনী পর্যায়ে কারা আছেন। খুব সহজ ব্যপারকে জটিল করে তোলা হয়েছে। আবারও বলছি, সবই যখন খুলে দেওয়া হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে দুরপাল্লার বাস ট্রেন লঞ্চ চলাচলে অনুমতি দিলে কোনো ক্ষতি হতো না। তাতে গাদাগাদি করে যাতায়তের কারণে করোনা ছড়ানোর শংকা তৈরি হতো না, মানুষও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ করতে পারতো। এখনো ঈদের বাকি পাঁচ দিন। যাবার যারা তাদের অর্দ্ধেকও ঢাকা ছাড়েনি। কলকারখানা বেসরকারি অফিসে বেতন ভাতা পাওয়ার পর বুধবার থেকে নামবে আর একটা ঢল। এদিকে গার্মেন্টসয়ের শ্রমিক কর্মচারিরা ছুটি বাড়ানোর জন্য আন্দোলনে নেমেছে। তারা এখনও রওনা হয়নি। লম্বা লকডাউনের শুরু থেকেই সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিদের কিছু অংশ ইতিমধ্যেই বাড়ি গিয়ে বসে আছে। ঈদের ছুটি তিনদিনের কারণে তাদেরকে ১৬ তারিখের মধ্যে ঢাকা আসতে হবে (যদি ‘কঠোর লকডাউন’ বা সরকারি চাকুরেদের সাধারণ ছুটি আরও বাড়ানো না হয়)। সে ক্ষেত্রে ঈদের পরদিন থেকে শুরু হয়ে যাবে আর এক দফা।
তখন কি মানুষের ঢাকা ফেরাও আটকানো হবে। এই লকডাউন সাধারণ ছুটি গণপরিবহন ঈদের ছুটি সবশেষ মানুষের যাতায়ত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যা করা হলো তা কোনো সুস্থ চিন্তাভাবনার প্রমাণ বহন করে না। বাংলায় একে বলা হয় ‘হুজ্জুতি’! আমাদের নীতিনির্দ্ধারকরা এতোটাই উন্নাসিক বা অদুরদর্শী তা মনে করতে চাই না। পাঁচদিন সময় আছে, সরকার যে জনদুর্ভোগের না, জনকল্যানের- প্রমাণ করতে এখনও কিছু বাস্তব এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। দুরপাল্লার বাস লঞ্চ ট্রেন ফেরি খুলে দিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত যাতায়ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে গাদাগাদি করে বাড়ি ফেরার চাইতে বেশি সংক্রমণের আশংকা নেই। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত