প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সালেহ বিপ্লব: আমার কাছে হেলিকপ্টারই ভালো

সালেহ বিপ্লব : [১] এরোপ্লেনের চেয়ে হেলিকপ্টারের প্রতি আকর্ষণটা আমার বেশি। অনেক অনেক বেশি। সেই ছোটবেলা থেকে, যখন আমবাগান রেলওয়ে কলোনীতে থাকতাম। মাঝে মাঝে কপ্টারগুলো খুব নিচ দিয়ে উড়ে যেতো। কতোটা নিচ দিয়ে সেটা বোঝানোর জন্য বলি, পাইলট মাথা বের করলেই তাকে স্পষ্ট দেখা যাবে, এতোটা নিচ দিয়ে। তো যতোই নিচে নামতো, ততোই জোরালো হতো গর্জন। হেলিকপ্টার শুধু দেখা নয়, শোনারও বিষয় আছে।
[২] আমবাগান রেলওয়ে কলোনীতে বারোটা চার ফ্ল্যাটের দোতলা ছিলো, ছাদ ছিলো টিনের। রাশিয়ান ডিজাইনের বাসাগুলো ১৯৫০ সালে তৈরি। এই বারোটা ছাড়া আর সব কোয়ার্টার ছিলো একতলা। দুটো বিশাল মাঠ কলোনীতে। তো হেলিকপ্টার যখন উড়ে যেতো, দোতলা বাড়িগুলো থেকে এক ধরনের প্রতিধ্বনি আসতো। মাঠের পারে নিচতলার দেয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনি হতো ভিন্নরকম। [৩] কলোনীর উত্তর দিকে পাহাড়। বাম দিকে ইদ্রিস সাহেবের বাংলো যেই পাহাড়ে, সেই পাহাড়। আর ডান দিকে একদম টাইগারপাস পর্যন্ত আরেকদিকে বাঘঘোনা পর্যন্ত টানা যে পাহাড়, সেটা একে খানের পাহাড়।
[৪] ইদ্রিস সাহেবের বাংলো পাহাড়ে গাছ ছিলো তুলনামূলক ঘন। পড়ন্ত দুপুরে শাল-সেগুনের পাতা মাড়িয়ে যখন পাহাড় ভাঙতাম, পাহাড়ের মাথায় গিয়ে হাঁটতাম- হেলিকপ্টারের দেখা মিলতো। আসলে এতো বেশি কপ্টার উড়তো, সকাল-দুপুর-বিকেল সব সময় দেখা মিলতো তাদের। ইদ্রিস সাহেবের পাহাড়ে প্রতিধ্বনি এক রকম, আবার ঠিক আরেক রকম শব্দ খেলা একে খানের পাহাড়ে।
[৫] একে খানের পাহাড়েও আবার নানা রকম শব্দ খেলা। সাবেক এই মন্ত্রীর বাড়ি যে পাহাড়ে, সেটা সীমানা প্রাচীরে ঘেরা। ভেতরে পাহাড়ের ঢালে নিজেদের চিড়িয়াখানা। দুই পাহাড়ের মাঝখানে রাস্তা। সেখানে যে কোনও হাইভলিউম শব্দ নিজস্ব একটা স্টাইলে ইকো হয়। তেমনটি পৃথিবীর আর কোথায়ও হয়তো পাওয়া যাবে না।
[৬] ছোট্ট বেলা থেকেই উড়ে যাওয়া হেলিকপ্টার নিয়ে গবেষণা করতে করতে এর প্রতি আলাদা একটা আকর্ষণ জন্ম নিয়েছে। বাবা বলতেন, বড়ো হয়ে ডিসি হতে হবে। আমি জানতে চাইতাম, ডিসি হলে কি হেলিকপ্টারে চড়তে পারবো? বাবা তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হো হো করে হেসে উঠতেন। আর বলতেন, ডিসি হলে সব কিছু পাবি। [৭] ডিসি-এসপি হওয়ার পথ যখন বন্ধ হয়ে গেলো, মাঝে মাঝে ভাবতাম, প্লেনে তো চড়তে পারবো, সমস্যা নেই। কিন্তু হেলিকপ্টার পাবো কই?
[৮] ১৯৯৭ সালে হেলিকপ্টার চড়ার প্রথম সুযোগ এলো। তখন আমরা সন্দ্বীপে অবস্থান করছিলাম। দৈনিক রূপালীর সম্পাদক আলহাজ্ব মুস্তাফিজুর রহমান এমপি (আল্লাহ তাকে বেহেশত নসীব করুন) প্রতি মাসেই এলাকায় যেতেন। প্রথম দিকে তার সঙ্গে যেতেন সিনিয়র রিপোর্টার সোহেল মাহমুদ, তিনি তখন এমপি সাহেবের এপিএস। সোহেল ভাইর পর আমি যেতাম সন্দ্বীপ ট্যুরে। [৯] এমন এক ট্যুরে সাঙ্গু কর্তৃপক্ষ সাগরে তাদের রিগ দেখার আমন্ত্রণ জানালো এমপি সাহেবকে। আমরা সন্দ্বীপ থেকে স্পিড বোটে এলাম সীতাকুণ্ড। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে ঝড়ের গতিতে সাগর পারি দিতে মিনিট বিশেক লাগলো। লাঞ্চের পর হেলিকপ্টারে চড়ে আমরা সাঙ্গু গ্যাসফিল্ডে যাবো।
[১০] খেতে বসে বিশাল এক চিংড়ি পেয়ে যতো না খুশি হলাম, তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেলাম বৃষ্টিতে চপার উড়বে না জেনে। খেয়েদেয়ে ফিরে গেলাম সন্দ্বীপ। হেলিকপ্টার চড়া হলো না। [১১] তিন বছর পর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০০০ সালের শুরুর দিকে, আমি তখন দৈনিক সংবাদে কাজ করি। কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর ওপর প্রথম সেতু নির্মাণ করা হবে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অফিস থেকে আমাকে অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হলো। [১২] যথাসময়ে পৌঁছে গেলাম পুরানো এয়ারপোর্টে, সামরিক বাহিনীর হেলিপ্যাডে। দুটো হেলিকপ্টার প্রস্তুত। একটিতে প্রধানমন্ত্রী এবং তার কর্মকর্তারা। অপরটিতে সাংবাদিক ও সিকিউরিটি ফোর্স।
[১৩] ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট এয়ারটাইম, ফিরে আসতেও তাই। হেলিকপ্টার চড়া হলো, পুরণ হল অনেক বছর পুষে রাখা আশাটুকু। [১৪] ধরলা ব্রিজ নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন, ক্ষমতায় এলো বিএনপি। আগের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা সেতুর উদ্বোধন করলেন নতুন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। উদ্বোধনের অনুষ্ঠানও আমি কাভার করেছি, তখন ছিলাম চ্যানেল আইতে।
[১৫] হেলিকপ্টারে আরামসারাম যতো কমই হোক, গতির বিষয়টা হেলিকপ্টারেই ভালো বোঝা যায়। প্লেনে শুধুমাত্র টেক অফ ও ল্যান্ডিং-এর সময় কিছুটা গতির ধাক্কা গায়ে লাগে, তাছাড়া প্লেনের আর কোনও গতি আছে বলে আমার মালুম হয় না। [১৬] অতি ক্ষুদ্র বলে ক্ষুদ্রতেই আমার তৃপ্তি, বড়ো কিছু না পাওয়ার হাহাকার আমাকে গ্রাস করে না।

 

সর্বাধিক পঠিত