প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী: বাড়ির পাশে আরশিনগর, নেপাল ও শ্রীলংকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী:  পুষ্প কমল দহল প্রচন্ড নেপালের ক্ষমতায় এলেন দীর্ঘ তেরো বছরের গৃহযুদ্ধ অবসান শেষে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত একটা পরিচ্ছন্ন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এ ঘটনায় ভারত সাফ জানিয়ে দিল তারা প্রচন্ডকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে না। আচ্ছা কেউ কি বলবেন, পড়শি বাড়ির কর্তা কে হলো তা নিয়ে যদি আমার ঘুম বন্ধ হয়ে যায় তবে সে দায় কার ? ভারত কেন প্রচন্ড’কে মেনে নিবে না তা তারা একটা অদ্ভুত ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে তীরে তরী ভেড়াতে চাইল। ব্যাখ্যাটা কি ? ভারতের কথা হলো, কমলের সাথে ভারতীয় মাওবাদী সন্ত্রাসীদের সখ্য আছে। ভারত কোনো রকম তথ্য প্রমাণের ধার ধারল না। নেপালী গৃহযুদ্ধে ভারতের ভুমিকা আর ব্রিটিশ ফরাসী ১০০ বছরের যুদ্ধে নাথান মেয়ার রথচাইল্ডের ভুমিকাকে মনে করিয়ে দেয়। যিনি একই সাথে ইংল্যান্ড এবং ফরাসী সরকারকে ঋণ দিয়ে, ঋণের জালে ফেলে নাস্তানাবুদ করে ফেলেছিলেন। অবশ্য ভারত টাকার খেলা খেলে না। তারা যথেষ্ট-ই গরীব। তারা অন্যান্য দেশের ইয়াং অফিসারদের প্রমোদ ভ্রমন করায় ভারতে। ব্যাক্তিদের পদ পদবি এবং আনুগত্য ধরে ধরে কিনতে থাকে।

ভারত একই কান্ড করেছে শ্রীলংকায়ও। ১৯৭৮ সালে ভারতীয় তামিলদের অস্ত্র শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল ভেল্লপিল্লাই প্রভাকরন। পাকিস্তান ভেংগেছে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ১৯৭২ সালে প্রশিক্ষন দিতে শুরু করেছে সন্তু লারমাদের। দক্ষিন এশিয়ায় ভারতের বন্ধু থাকতে পারে, মিত্র নেই। এটা নিশ্চিতভাবে-ই বলা যায় যে এখানে তারা মিত্রতার সংকটে পড়েছে নিজেদের দাদাগিরির কল্যানে। নেপাল ভুটান বাংলাদেশের এক সময়ের স্বাভাবিক রেওয়াজ এই ছিল যে,এ অঞ্চলের নতুন বা পুরাতন যে শক্তি-ই ক্ষমতায় আসুক, ভারত সফরের মধ্যে দিয়ে-ই তাদের নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হতো। কমল সেসব পাত্তা না দিয়ে তার সরকারের প্রথম সফর হিসেবে বেছে নেন চায়নাকে। বুঝতে পারছেন কত দশকের ট্রেন্ড ভংগ করার সাহস তিনি দেখালেন। চায়নাতে সফরকালীন সময়ে-ই তিনি বুঝেছিলেন, বেশিদিন ক্ষমতায় টিকতে পারবেন না। পুষ্প কমল দহল যত শক্তিশালী-ই হোক না কেন, নেপালী কংগ্রেস যাকে ভারতীয় কংগ্রেসের বি টিম বলা হয়ে থাকে, সেই তারা ছোট ছোট দল কিংবা দল নিরপেক্ষ আসন গুলোর উপর নিজেদের পুর্ন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করল। প্রশাসন, সেনা, পুলিশ কিংবা সরকারী দফতর সমুহ এতোদিন পরিচালিত হয়েছে নেপালি কংগ্রেস সমর্থিত আমলাদের দ্বারা। ফলে ক্ষমতায় এসেই তিনি যে আমুল পরিবর্তন করে ফেলতে পারবেন সে ভাবনা বোধকরি কেউ-ই ভাবেন নি। যা হবার তা-ই হলো।

তিনি ২০০৮ থেকে ২০০৯ সালেও নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
প্রচণ্ড ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ থেকে একীকৃত নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) বা সংক্ষেপে নেকপা (মাওবাদী)কে সাম্যবাদী বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। আসন্ন গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে, ১৭,০০০ নেপালি মারা যান। অবশেষে ২০০৮ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং নেকপা (মাওবাদী) শক্তিশালী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। আগস্ট ২০০৮-এ নেপালের সংবিধান সভা প্রচণ্ডকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে।[২] তিনি ছিলেন নেপালের ৩৪তম প্রধানমন্ত্রী। যা বলেছিলাম আগে, প্রচন্ড ক্ষমতায় আসার আগতক নেপাল শাসন করেছে নেপালী কংগ্রেস ও তার সাংগপাংগরা। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল রোকমানাগুড় কাটোয়ালকে বরখাস্তের চেষ্টা করার পর প্রেসিডেন্ট রাম বরন যাদব তার এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করলে তিনি ৪ মে ২০০৯ তারিখে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করেন।[৩] ( উইকি ) ধারনা করা হয় ভারতীয় ব্লু-প্রিন্ট বাস্তবায়নে প্রচন্ডের দল ছাড়া বাকি সবাই এতে যোগ দিয়েছিল। বাজপায়ী ভারতে প্রথমবারের মত ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় কংগ্রেস যেভাবে তাকে টেনে হিচড়ে নামিয়েছিল মনে আছে নিশ্চয়ই। সেটা ছিল তিন দিনের একটা সরকার আর এ কান্ডে-ই ভারত থেকে কংগ্রেসকে আজ অনেকটাই ছিটকে পরতে হয়েছে। সো, প্রচন্ড তা হতে দেননি। তিনি সোজা পদত্যাগ করে বসেন।

এখানে নেপালী সেনাবাহিনীর অনানুষ্ঠানিক ক্যু এর প্রেক্ষাপট রচনার রসদ যুগিয়েছিল খোদ ভারত। এ কথার কোনো প্রমান আমার হাতে অন্তত নেই। তবে প্রচন্ডের পদত্যাগ অন্তত্ সেদিকে-ই ইংগিত দেয়। তা না হলে একজন সেনা প্রধানের হাতে দেশের নির্বাচিত প্রধান নির্বাহী নাকাল হন কিভাবে, কেন তাকে পদত্যাগ করতে হলো ?

এরমধ্যে আরেকটি কারন যা ছিল সে হলো বাবুরাম ভট্ররাই। তিনি দহলের ডেপুটি ছিলেন এবং যে কোন ভাবে-ই হোক ভারত সরকার তার সাথে যোগাযোগ সম্ভব করে তোলে। নেপালী কংগ্রেসের জনসমর্থন সে সময় তলানীতে। ফলে ১৯৭৫ সালের পর ভারত যেমন বাংলাদেশে তাদের গোলামদের পুনর্বাসনে ঝুঁকি নিতে চায়নি ( গন বিদ্রোহের ভয়ে )ঠিক তেমনি তখন তারা নেপালি কংগ্রেসকেও দহলের স্থানে দেখতে চায়নি। সেন্টিমেন্ট ইস্যু ইজ এ ম্যাটার জানে ভারত। ফলে সেকেন্ড চয়েজ হিসেবে তারা আরেকজন এরশাদকে খুঁজতে থাকে এবং পেয়েও যায়। বাবুরাম ভট্ররা-ই কলেজ জীবন থেকেই মাওবাদে আসক্ত ছিলেন। ( এবং র কিভাবে তাকে পিক করে সে কথা বলা যাবে অন্য পর্বে। মনে রাখবেন উচ্চতর শিক্ষাজীবন ভট্ররা-ই পার করেছেন দিল্লীতে ।) আর এতসব যখন ঘটছিল তখন ভারতে চলছিল তাদের নির্বাচনকালীন সরকার। কমল সম্ভবত এটা বুঝতে পেরেছিল যে, নেক্সট নির্বাচনেও একই ফল আসবে এখন যেমন নেতানিয়াহুর বেলায় গত পাঁচটি অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচনে প্রায় একই ফল আসলো। ফলে পরে নির্বাচনে জিতে কমল দেশের প্রেসিডেন্ট হলেন এবং ডেপুটি বাবুরাম ভট্ররাই-কে করলেন গনতান্ত্রিক নেপালের প্রধানমন্ত্রী। এবার আর ভারত নীতিতে দহল স্বাভাবিক আচরনও করতে পারলেন না। তিনি মনে করলেন, ভারত সাবোটাজের চেষ্টা করছে। কেন এমন ভাবলেন সে উত্তর পরে দিচ্ছি । ভারত তো সুযোগের অপেক্ষায় রইলো। এখানে কনস্পিরেসি খোঁজা লোকেরা জিগেস করতে পারেন ১৭০০০ লোক যার যুদ্ধের কারণে মারা গেল সে কিভাবে জনপ্রিয় থেকে জনপ্রিয়তর হয়ে উঠে তার দেশে। উত্তর হলো- অন্যের গোলামীর কোরমা খাওয়ার চেয়ে নিজের শাক সবজি অনেক উপাদেয়, অনেক সম্মানের। এটা নেপালী জাতি বুঝেছিল। বুঝেনি নেপালী কংগ্রেস।   নেপাল বিশ্বের একমাত্র হিন্দু রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও কেন ভারত বিরোধিতায় এক হয়ে যায় ?

নির্বাচনে সাধারণ জনগণের মধ্যে ভারতের দাদাগিরী বিরুপ প্রতিক্রিয়ার বিস্ফোরন ঘটে যেমন ৭১ সালে বিস্ফোরিত হয়েছিল বাংলাদেশ। ভারত তাদের চানক্য নীতির বাস্তবায়নকারী বলে-ই আজ ভারতের একটা প্রতিবেশী রাষ্ট্রও নেই যার সাথে ভারতের বিশ্বাসের সম্পর্ক রয়েছে। তাদের ভাবনা হলো- প্রতিবেশী মানেই শত্রু। শত্রুর শত্রু হলো তোমার বন্ধু। চানক্যের এ নীতি-ই ভারতকে সর্বনাশের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছে। চাণক্যের হুকুম পালন করার কথা ছিল পাকিস্তানের। চাণক্য ও তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানে অবস্থিত। চানক্য একজন আচার্য হয়ে উঠেন তক্ষশীলার হাত ধরে-ই।

পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে ভারত তাদের চানক্য বিশ্বাস থেকে কখনো-ই বিচ্যুত হয়নি। ভারত সরকারে বাজপেয়ি আছেন নাকি সোনিয়া আছেন নাকি বল্লভ ভাই প্যাটেল আবার পুনর্জীবন লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তাতে কিছু যায় আসে না। তাদের নীতি সেই একই। নেপালে এ কথা অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য ভাবে প্রচলিত আছে যে, ২০০১ (?)সালের রাজপরিবারে গনহত্যা ঘটে ভারতের চালে। তারা সেখানে বীরেন্দ্রকে রাজা বানিয়ে, স্বীকৃতি দিয়েও রাজ সিঙ্গহাসনে অধিষ্টিত করতে পারেননি। নেপালী হিন্দুরা-ই দুনিয়ার বুকে একমাত্র জাতি হিসেবে নিজেদের প্রকাশ করেছে যে,দুই দেশ একই ধর্মের অনুসারী হলেও জাতিস্বত্তা এবং সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে। বাংলাদেশ পাকিস্তানের কথাও এখানে ভাবা যেতে পারে যদিও প্রেক্ষাপট দুর্বল।

ডা. জাকারিয়া চৌধুরী: ডেন্টাল সার্জন, কলামিস্ট

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত