প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কাজী শাহেদ আহমেদ: দুঃখ প্রকাশে দুঃসাহসী

নাঈমুল ইসলাম খান: [১] নভেম্বর শেষ সপ্তাহ ২০০০ সাল। ধানমন্ডি সড়ক ২/এ, কাজী শাহেদ আহমেদের বাসায় গেলাম সন্ধ্যার কিছু পরে। সুনসান নীরবতা। একধরনের নিস্তব্ধতা।

[২] পরিচয় দিতেই অভ্যর্থনাকারী লিফটে নিয়ে আমাকে পৌঁছালো সম্ভবত চতুর্থ তলায় যেখানে কাজী শাহেদ আহমেদ তার পরিবার নিয়ে বসবাস করেন।

[৩] নির্দিষ্ট আসন দেখিয়ে বিশাল লিভিং রুমে আমাকে বসতে বলে কিছুটা অপেক্ষা করতে বললেন অভ্যর্থনাকারী।

[৪] ১১ বছর আগে এই ভবনেরই ৩ তলায় সাপ্তাহিক খবরের কাগজের অফিস ছিলো। তখন এই বিল্ডিংয়ের লিফট ছিলো না।

[৫] ১৯৯২ সালে ২৮ জানুয়ারি দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর এই প্রথম কাজী শাহেদ আহমেদের আমন্ত্রণে তার বাসায় এসেছি।

[৬] আমাকে খুব বেশি অপেক্ষা করতে হলো না। কাজী শাহেদ আহমেদের কনিষ্ঠ পুত্র ইনাম এসে ঘরে ঢুকলো। আমি কেমন আছি জেনে করমর্দন করে মনে হলো তার নির্ধারিত আসনেই সে বসলো।

[৭] শাহেদ ভাই সবসময় কায়দা কানুনের মানুষ। অভিজাত। তার বিশাল বসবার ঘর অত্যন্ত সুরুচি সম্মতভাবে সাজানো।

[৮] এর মধ্যে ঘরে আসলো শাহেদ ভাইয়ের মেজো ছেলে কাজী আনিস আহমেদ। আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে করমর্দন করে গিয়ে বসলো নিজের আসনে।

[৯] নির্দিষ্ট ছন্দে একে একে সবাই আসছেন বুঝা যাচ্ছে। এবার এলেন কাজী নাবিল আহমেদের স্ত্রী আমাদের প্রিয় ভাবী রমা। উচ্ছ্বসিত শুভেচ্ছা বিনিময়ে এবং করমর্দনের পর তিনিও গিয়ে বসেছেন তার নির্ধারিত আসনে।

[১০] এবার বুঝাই যাচ্ছে কাজী নাবিল আহমেদের পালা। তিনি এলেন এবং সম্ভাসন ও করমর্দন শেষে রমা ভাবীর পাশে বসলেন।

[১১] পাঠক আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন এবার কাজী শাহেদ আহমেদের স্ত্রী মীনা ভাবীর পালা। আমিনা আহমেদ ভাবী এসে সুপরিচিত মানুষের মতোই স্বতঃস্ফূর্ত সম্ভাসন এবং হ্যান্ডশেক করে গিয়ে তার চেয়ারে বসলেন।

[১২] অন্যান্যদের বিরতির চাইতে এবারের বিরতিটা একটু দীর্ঘতর। কয়েক সেকেন্ড বেশি। সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পড়া শশ্রুমন্ডিত, হাতে ছড়ি নিয়ে শাহেদ ভাই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কাছে এসে জানতে চাইলেন আমি কেমন আছি। তারপর হ্যান্ডশেক করে আসন গ্রহণ করলেন।

[১৩] এবার ১০ সেকেন্ড নিরবতা যেনো একটি বিরতি। যেনো একটি নাটকের অংশ শেষ। সামান্য বিরতির পর নাটকের পরবর্তী অংশ।

[১৪] নিরবতা ভাঙ্গলেন শাহেদ ভাই। বললেন, আমরা পারিবারিকভাবে বেশ কিছুদিন তোমাকে নিয়ে ভেবেছি, নিজেদের মধ্যে কথা বলেছি এবং অবশেষে উপলব্ধি করেছি তোমার সাথে আমাদের একটা ভুল হয়েছে। আমরা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেই ভুলের জন্য আমরা পারিবারিকভাবেই দুঃখ প্রকাশ করবো। তাই আমরা তোমার কাছে আমাদের সিনসিয়ার রিগ্রেইটস প্রকাশ করছি। তুমি কি আমাদের রিগ্রেইটস এক্সেপ্ট করেছো? এই ছিলো আমার কাছে প্রশ্ন।

[১৫] কাজী শাহেদ আহমেদের মুখোমুখি হলাম প্রায় ৯ বছর পর। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতবিহ্বল।

[১৬] হকচকিত আমি বললাম শাহেদ ভাই , এতো ঘটা করে আয়োজন করে দুঃখ প্রকাশের কোনো প্রয়োজনই ছিলো না। টেলিফোনে ছোট্ট করে বললেই চলতো।

[১৭] শাহেদ ভাই আমাকে ছাড়লেন না, বললেন দুঃখ প্রকাশ গ্রহণ করেছ কিনা বলো। তখন আমি বললাম নিশ্চয়ই করেছি।

[১৮] বুঝা গেলো নাটকের দ্বিতীয় খণ্ডে প্রবেশ করছি। শাহেদ ভাই আবার চমৎকার নাটকীয়তায় প্রস্তাব করলেন, তুমি আবার দৈনিক আজকের কাগজে ফিরে আসো। ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসো’

[১৯] এবার আমি একটু সময় চাইলাম, বললাম এই ব্যাপারটা আমি আমার স্ত্রী মন্টির সাথে পরামর্শ করে জানাতে চাই। আমাকে একটু সময় দেন। শাহেদ ভাই ৩দিন সময় দিলেন ভাবনা চিন্তা এবং পরামর্শের জন্য।

[২০] শাহেদ ভাই বললেন, ‘ঠিক আছে তুমি অবশ্যই পরামর্শ করো এবং আমাকে জানাও। যদি সম্মত হও ১ ডিসেম্বর ২০০০, তারিখে আজকের কাগজে সম্পাদকের দায়িত্ব নিবে উপদেষ্টা সম্পাদকের পদ গ্রহণ করে।

[২১] আমি বললাম, জানাবো তিন দিনের মধ্যেই। এই অংক শেষ হলো।

[২২] তারপর ছিলো আপ্যায়ন পর্ব। সামনে বিশাল সুন্দর টেবিলে এতো কিছু পরিবেশন করা ছিলো কিন্তু আমি চা পান করার কথাটুকু ছাড়া কিছুই মনে করতে পারছি না। কেবল মনে করতে পারছি তখন খাবারের সাথে সাথে নিজেদের মধ্যে গল্প জমে উঠেছে।

অনুলেখক: ফাহমিদা তিশা
রচনার তারিখ: ২ এপ্রিল ২০২১

সর্বাধিক পঠিত