প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুই অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা: মৎস্য খাদ্যের রফতানি বাজার হারানোর শঙ্কা

বণিক বার্তা: ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের একটি কোম্পানির সঙ্গে গত বছর ১০ হাজার টন মৎস্য খাদ্য রফতানির বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি করে দেশের অন্যতম ফিড উৎপাদক আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেড। চুক্তির আওতায় প্রথম চালানে ১০০ টন মাছের খাবার রফতানি করা হয়। তবে চলতি বছর পরের চালান রফতানির উদ্যোগ নিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও কার্যকর নীতিমালার অভাবে এ খাতে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সমস্যার শুরু হেলথ সার্টিফিকেট ইস্যু করা নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী, মৎস্য ও পশুখাদ্য রফতানির জন্য হেলথ সার্টিফিকেট জমা দিতে হয়। এ সনদটি দেশভেদে ভিন্ন নামে চাওয়া হয়। কোথাও একে বলা হয় ‘হেলথ সার্টিফিকেট’, কোথাও ‘স্যানিটারি সার্টিফিকেট’ বা ‘ভেটেরিনারি হেলথ সার্টিফিকেট’। এ সনদ ইস্যু করতে দরকার হয় একজন ভেটেরিনারি কর্মকর্তার, যে পদটি মৎস্য অধিদপ্তরের নেই।

ফলে প্রথম চালান যখন ভারতে যায়, তখন হেলথ সার্টিফিকেট দিয়েছিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস)। যাদের রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ও কার্যকর নীতিমালা। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ডিএলএস কেবল পোলট্রি খাদ্য রফতানির জন্য সনদ দেবে। মৎস্য খাদ্যের জন্য সনদ দেয়ার দায়িত্ব মৎস্য অধিদপ্তরের। এ অধিদপ্তরে মৎস্য খাদ্য রফতানি-সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা নেই, অভাব রয়েছে উন্নত মানের পরীক্ষাগারের।

যেহেতু কোনো নীতিমালা, পরীক্ষাগার বা ভেটেরিনারি কর্মকর্তা নেই, তাই মৎস্য খাদ্যের দ্বিতীয় চালানের জন্য হেলথ সার্টিফিকেট ইস্যু করা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। মোট কথা, দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই চলতি মাসে মৎস্য খাদ্য রফতানির বাজার হারানোর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ভারতের সাত অঙ্গরাজ্যসহ নেপাল ও ভুটানের বাজারে ফিডের চাহিদা আড়াই থেকে তিন লাখ টন। এরই মধ্যে বাংলাদেশে দুটি প্রতিষ্ঠান ভারতে প্রায় ৪০০ টন মৎস্য ও পোলট্রি খাদ্য রফতানি করেছে। আরো দুটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০০ টন রফতানির প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্বল্প পরিসরে নেপালে রফতানি শুরু হয়েছে। নতুন চুক্তির কারণে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে ভুটানের বাজারেও। সব মিলিয়ে হাজার কোটি টাকার ফিডের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ এ প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা ও নীতিমালার অভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে ‘মৎস্যখাদ্য বিধিমালা-২০১১’-তে সংশোধনী আনা হচ্ছে। সংশোধনীতে মৎস্য অধিদপ্তর তাদের ফিশ ইন্সপেকশন অ্যান্ড কোয়ালিটি কন্ট্রোল (এফআইকিউসি) ল্যাব থেকে স্যানিটারি সার্টিফিকেট ইস্যু করার বিধান যোগ করেছে। তবে কোনো দেশ যদি স্যানিটারি সার্টিফিকেটের পরিবর্তে হেলথ সার্টিফিকেট চায়, সেক্ষেত্রে আবার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাছেই যেতে হবে।

এক্ষেত্রে আরেকটি সমাধান হতে পারে, সেটি হলো মৎস্য অধিদপ্তরে প্রফেশনাল ভেটেরিনারিয়ান বা পশুচিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে তার মাধ্যমেই সার্টিফিকেট ইস্যু করা। ফলে এখন প্রথম যে কাজটি করতে হবে তা হলো, ‘মৎস্যখাদ্য বিধিমালা-২০১১’ সংশোধন করা ও পশুচিকিৎসক নিয়োগ দেয়া।

সমস্যা সমাধানে মৎস্য অধিদপ্তর তাদের কাজ শুরু করেছে। ১১ এপ্রিল ‘মৎস্যখাদ্য বিধিমালা-২০১১’-এর সংশোধনী বিষয়ে একটি সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভার জন্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কিছু দাবি জানানো হয়েছে।

এসব দাবির মধ্যে রয়েছে—স্বল্পতম সময়ের মধ্যে মৎস্যখাদ্য বিধিমালা সংশোধন ও অনুমোদন, মৎস্য অধিদপ্তরের এফআইকিউসি ল্যাবে প্রফেশনাল ভেটেরিনারিয়ান নিয়োগ, সংশোধিত বিধিমালা অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত রফতানিতে যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে সমন্বয় করা।

এ বিষয়ে আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ফিআব) সাবেক সভাপতি আবু লুেফ ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার বলেন, ভারতের বাজারে প্রবেশ করাটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। আমরা সেই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। ভারতসহ নেপাল ও ভুটানের বাজারে দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পোলট্রি ও মৎস্য খাদ্য প্রবেশ করতে পেরেছে। প্রথম চালানেই গুণগত মান ও তুলনামূলক কম খরচের কারণে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে আমাদের পণ্য। কিন্তু দ্বিতীয় চালানের সময়ই আমরা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছি। দ্রুত পণ্য পাঠাতে না পারলে বাজার হারানোর শঙ্কা রয়েছে। আগে যেহেতু ডিএলএস সনদ দিত, এখনো যদি তারা সেটি দেয় তাহলে বাজারটি ধরে রাখা সম্ভব হবে। পরবর্তী সময়ে মৎস্য অধিদপ্তর যখন নীতিমালা ও পরীক্ষাগার স্থাপন করবে তখন তাদের কাছে প্রক্রিয়াটি হস্তান্তর করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্টাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) হিসাব অনুযায়ী, দেশে পোলট্রি ও প্রাণী খাদ্যের মাসিক উৎপাদন ছাড়িয়েছে প্রায় চার লাখ টন। এর বাইরে গ্রামে বা শহরগুলোতে অনানুষ্ঠানিকভাবে মাসে প্রায় ৫০ হাজার টন ফিড উৎপাদন হচ্ছে। সে হিসেবে প্রতি বছর দেশে ফিডের উৎপাদন ছাড়িয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টন। চলতি বছরের শুরুতে ভারতের সেভেন সিস্টার্স হিসেবে খ্যাত সাত রাজ্যে প্রথম চালানে প্রায় ১০০ টন পোলট্রি ফিড রফতানির মাধ্যমে যাত্রা করে প্যারাগন। নেপালের বাজারেও পোলট্রি ফিড রফতানি করে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি ভারতে রফতানি প্রক্রিয়া শুরু করে কোয়ালিটি ফিড ও নারিশ। আফতাব বহুমুখী ফিড কোম্পানি প্রায় ১০০ টন মাছের খাবার রফতানি করে। সম্প্রতি ভুূটানের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) সম্পন্ন হয়েছে। এ চুক্তির মাধ্যমে সেদেশেও ফিডের বাজার আরো সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা। নেপালের সঙ্গে চুক্তি হলে সেখানেও ফিডের রফতানি বাড়ানো সম্ভব হবে।

রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ভারতের সেভেন সিস্টার্সে কয়েক দিনের মধ্যেই বৃষ্টিপাত শুরু হবে। বৃষ্টির পর পরই সাধারণত মাছের খাদ্যের চাহিদা বাড়ে। ফলে তার আগেই এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা মাছের খাদ্য আমদানি শুরু করেন। এ সময়ে ভারতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ থেকে পণ্য না পেলে শ্রীলংকা থেকে আমদানির উদ্যোগ নিতে পারেন। শ্রীলংকা বা অন্য কোনো দেশের পণ্য ভারতে প্রবেশ করলে সেই বাজারে আবার বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ কঠিন হয়ে যাবে। তাই মৎস্য খাদ্য রফতানির জন্য স্বল্প মেয়াদে বিকল্প পন্থা প্রত্যাশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি ও প্যারাগন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মসিউর রহমান বলেন, আমরা একটি সম্ভাবনাময় একটি বাজারে কেবল প্রবেশ করলাম। দেশের ব্যবসায়ীদের এ উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও উন্নত করতে হলে সরকারের বড় ধরনের ভূমিকা প্রয়োজন। ফিড রফতানি বাজারে বাধাগুলো দ্রুত সমাধান করতে হবে। বন্দরগুলোতে অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। গ্রেন হ্যান্ডলিং টার্মিনাল করতে পারলে ফিডের পরিবহন খরচ অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মনে করেন মসিউর রহমান। এছাড়া প্রতিবেশী দেশের অনুমতি নেয়া ও বাংলাদেশের রফতানি অনুমতি প্রক্রিয়াতে বেশকিছু জটিলতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এগুলো দূর করে রফতানির পথ সুগম করতে মন্ত্রণালয়ের আরো বেশি উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন এ ব্যবসায়ী।

সর্বাধিক পঠিত