প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খান আসাদ: কেন হেফাজত এতো আগ্রাসী?

খান আসাদ : জঙ্গি আক্রমণ থেকে হুজুগে বর্বর ধর্ম-সন্ত্রাস। কেন হেফাজত এতো আগ্রাসী? বাংলাদশের পত্রপত্রিকা ঘেঁটে ১৩৩টি ইসলামী জঙ্গি সংগঠনের নাম পাওয়া গেছে। কোনটা কতোটা শক্তিশালী বা একই দল ভিন্ন ভিন্ন নামে কিনা, এসব আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। প্রাসঙ্গিক হচ্ছে, বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গিবাদী সংগঠন আছে। তারা মূলত ট্রান্সন্যাশনাল। বাংলাদেশে আলকায়েদা ও আইসিস (ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া) যে সক্রিয় তা তাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়। বাংলাদেশে যে জঙ্গি দল রয়েছে, প্রায় সবগুলোর সঙ্গেই আন্তর্জাতিক জঙ্গিসংগঠনের সম্পর্ক আছে। তারা একটি নেটওয়ার্কের আওতায়। বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গিদল একটি ‘ইসলামী রাজনীতির’ সহযোগী শক্তি। যেমন ১৯৭১ সালে ‘ইসলাম’ রক্ষার জন্য রাজাকার আলবদর আলশামস নামের সামরিক সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছিলো। বাংলাদেশের ভেতরে যে ইসলামী সংগঠন, তারাও মূলত বাইরে থেকেই গড়ে তোলা।
প্রধানত মার্কিন-সৌদি-পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায়। আফগানিস্তানে ‘রাশিয়ান ইনভেশন’ ঠেকানো ছিলো একটি যুক্তি। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা ও ইসলামী মৌলবাদ সম্পর্কিত, একটি অখণ্ড ধারা। এটি একটি রাজনৈতিক আন্দোলন, শরিয়া আইন চালু, ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পুরুষ আধিপত্য কায়েমের। এই রাজনীতি অক্টোপাসের মতো, অনেকগুলো হাত পা আছে, যারা নানা সেক্টরে কাজ করে। তারা নানা রাজনৈতিক দলে ও সরকারি প্রশাসনেও আছে। তারা সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রগুলো দখলে নিতে চায়। সামরিক শাখার কাজ হচ্ছে, জঙ্গি আক্রমণ। ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ২২ জন বিদেশি নাগরিক হত্যার পর, বাংলাদেশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠে এবং প্রধানত জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত করার আন্তরিক উদ্যোগ নেয়। যদি লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখা যায়, ২০১৬ থেকে জঙ্গি হামলার সংখ্যা কমতে থাকে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর তৎপরতায়।
ইন্টারেস্টিং যে ২০১৭ সালে তারা ৭, ২৪ ও ২৫ তারিখে হামলা করে, যেখানে সিলেটে ৮ জন নিহত হয় ও ৪০ জন আহত হয়। ২০১৮ সালেও তারা অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলা করে ৩ মার্চ। তাদের হামলার পছন্দের মাস ফেব্রুয়ারি (অভিজিত, রাজীব), মার্চ ও আগস্ট। কেন তা মনে হয় বুঝিয়ে বলতে হবে না। পুরো উপমহাদেশেই জঙ্গিবাদী হামলা অনেক কমে গিয়েছে, বেড়েছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আনুপাতিক হারেই। রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ার জন্য প্রতি বছর নানা রকম নিরাপত্তা বাহিনীর পেছনে অনেক খরচ হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতা বাড়ানোর যুক্তি জঙ্গিবাদ দমন। কিন্তু এর কিছু পার্শ প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। যেমন এই সব বাহিনী দ্বারা বেআইনি হত্যাকাণ্ড, শ্রমজীবীদের আন্দোলন দমন ও আদিবাসীদের জমি দখলে ভূমিদস্যুদের সহায়তা দেয়া। সাম্প্রতিক ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যে হেফাজতের তাণ্ডব, তা বাংলাদেশ তথা এই উপমহাদেশ জঙ্গিবাদ দমনের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেহেতু ‘ইসলামী’ আন্দোলনটি তার সামরিক কার্যক্রম ভালোভাবে চালাতে পারছে না, তারা এখন অন্য কৌশল নিয়েছে। যে কৌশলের নাম মব ভ্যান্ডালিজম বা হুজুগে সন্ত্রাস। তারা তাদের সহিংস সক্রিয়তা বজায় রাখার জন্য এই নতুন পথ বেছে নিয়েছে।
এই মার্চে নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশে না এলেও, তারা মার্চমাসে কিছু না কিছু একটা করতোই। জঙ্গিবাদের মোকাবেলা করার জন্য কাউন্টার টেররিজম ইউনিট রয়েছে, কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে বা হাটহাজারিতে যা হলো, তা আগে থেকেই অনুমান বা মোকাবিলার কৌশল তাদের নাও থাকতে পারে। অথবা হতে পারে, সরকার সীমিত মাত্রায় মব ভায়োলেন্স হতে দেবে, তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে (এক্ষেত্রে বিএনপি) কোণঠাসা করতে। আমি নিশ্চিত নই। আগামী বিপদ কি? এক. রাষ্ট্রযন্ত্র ও জাতীয় এলিটেরা (থিঙ্কট্যাঙ্ক) মনে করে তারা জঙ্গিবাদ দমনে সক্ষম, যেটা তাদের ব্যাবসার পরিবেশের জন্য দরকার। কিন্তু জঙ্গিবাদ একটি ট্রান্সন্যাশনাল ব্যাপার। যেমন ভারত দায়ী করে পাকিস্তান ও চিনকে, আবার পাকিস্তান দায়ী করে ভারতকে, নিজ দেশের জঙ্গি তৎপরতার জন্য। যদি দক্ষিণ এশীয় দেশের বর্তমান ভারসাম্য বদলে যায়, যেমন মিয়ানমারে এসেছে সামরিক জান্তা, তখন যদি জঙ্গিবাদ নতুন রসদ বাইরে থেকে পায়, তাহলে আবার আগের মতো সক্রিয় হবে। দুই. যেহেতু তারা জঙ্গিবাদী কার্যক্রম করতে বাধা পাচ্ছে, তাদের নতুন কর্মক্ষেত্র হবে সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট ও প্রকাশ্য মব ভায়োলেন্স। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সেই ইংগিত দেয়। তারা স্থানীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী, নারী, সেক্যুলার সংস্কৃতি কর্মী তথা সফট টার্গেট বেছে নেবে, প্রকাশ্যে হামলা করবে। রাস্তায় প্যান্ট খুলে দেখবে খতনা করা আছে কীনা। নারীর চুল দেখা যায় কীনা। অর্থাৎ সমাজে তাদের সহিংস আধিপত্য বেড়ে যাবে।
দুর্নীতি ও অবিচার, সংস্কৃতি কর্মীদের ওপর রাষ্ট্রের নিপীড়ন, শ্রেণি শোষণ, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বেআইনি হত্যা-সহ নানা বিষয়ে যে সংকট বা অপশাসন রয়েছে তার কারণ ব্যক্তি হিসেবে সরকার প্রধান শেখ হাসিনা এবং ‘ফ্যাসিস্ট’ আওয়ামী লীগকে দায়ী করার একটি প্রচার রয়েছে। প্রধানত বিএনপি-জামায়াত ও প্যাথলজিক্যাল আওয়ামীবিরোধীদের দিক থেকে। অর্থাৎ অন্য কথায় বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, অবিচার, অপশাসন, বৈষম্য ও নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হবে, ব্যক্তি হিসেবে সরকার প্রধান ও দল হিসেবে আওয়ামী লীগের পতন হলে। এটি তাদের ক্ষমতার হাত বদলের বা রেজিম চেঞ্জের রাজনীতি। আজকের বাংলাদেশ একটি নতুন পর্বে এসেছে। শাল্লা, হাটহাজারি কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আমরা যা দেখছি, তা একটি নতুন প্রবণতা যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়বে বলে আমার ধার না। সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী কি করবে আমরা নিশ্চিত নই। এই প্রেক্ষাপটে, বামপন্থীদের কার্যকর ভূমিকা নির্ধারণের সময় এসেছে। যে ব্যবস্থা এই সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের ভিত্তি, সেই ব্যবস্থা পরিবর্তনের রাজনীতি এবং একইসঙ্গে আশু হুমকি মোকাবেলার জন্য যুগোপযোগী রাজনীতি এখন সময়ের দাবি। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত