প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মোরশেদ শফিউল হাসান: করোনা টিকা নিয়ে দুশ্চিন্তা

মোরশেদ শফিউল হাসান: করোনা প্রতিষেধক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এখন মডার্না, ফাইজার ও জনসন অ্যান্ড জনসন কোম্পানির টিকা দেওয়া হচ্ছে। এই তিনটি কোম্পানিই যুক্তরাষ্ট্রের। জানা মতে, অন্য অনেক দেশেও একাধিক কোম্পানির টিকা দেওয়া হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে আমরা করোনা প্রতিরোধে এখন পর্যন্ত একমাত্র ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের উৎপাদিত টিকা ব্যবহার করছি। এই টিকাও কিন্তু ভারতের আবিষ্কৃত নয়। যৌথভাবে এর উদ্ভাবক ব্রিটেনের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানি। তাদের অনুমতিক্রমেই সেরাম ইনস্টিটিউট ‘অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন’ নামে পরিচিত এই টিকাটি উৎপাদন ও অন্য দেশে তা রপ্তানির সুযোগ পেয়েছে। ভারতের পুনায় অবস্থিত সেরাম ইনস্টিটিউট বর্তমানে বিশ্বের সর্ববৃহৎ টিকা উৎপাদনকারী সংস্থা। কিন্তু যতো বড় কোম্পানিই হোক, তাদেরও উৎপাদন ক্ষমতার নিশ্চয়ই একটা সীমা আছে। আমাদের জানামতে, প্রথম পর্যায়ে তারা এক বিলিয়ন টিকা উৎপাদনের অনুমতি পেয়েছে, তাও এই শর্তে যে সরকার বা সরকারের মাধ্যমে ছাড়া তারা কাউকে এই টিকা সরবরাহ করতে পারবে না।

সাম্প্রতিক খবর হলো, খোদ যুক্তরাজ্যই তাদের চাহিদা মেটানোর জন্য সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছে টিকা চেয়েছে। আবারও মনে করিয়ে দিই, এই টিকা সে দেশেরই দুটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আবিষ্কৃত আর তাদের অনুমতি নিয়েই ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট তা উৎপাদন করছে। কাজেই তারা চাইলে নির্দিষ্ট পরিমাণ টিকা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের না দিয়ে সেরাম ইনস্টিটিউট বা ভারতের উপায় থাকবে না। ইউরোপীয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর কাছ থেকেও অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন চেয়ে ভারতের কাছে ইতোমধ্যেই অনুরোধ এসেছে বা সহসা আসবে বলে শোনা যাচ্ছে। অন্যদিকে ভারত সে দেশের ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে বলা যায় একরকম বঞ্চিত করেই দ্রুত বাংলাদেশে টিকা পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলো। আমরা যখন বাংলাদেশে সেরাম ইনস্টিটিউটের উৎপাদিত অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা নিতে শুরু করি, তখনও ভারতে চিকিৎসক-নার্সসহ কেবল নিরাপত্তা ঝুঁকির দিক থেকে সম্মুখ সারির লোকজনের ক্ষেত্রেই এই টিকাদান কর্মসূচি সীমাবদ্ধ ছিলো। এমনকি এখন অবধি ভারতের সর্বত্র ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের জন্যও এই টিকাকে সহজলভ্য করা যায়নি। সেদিক থেকে আমরা নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান ভাবতেই পারি। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ভারতের জনমনে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। নিজ দেশের চাহিদা না মিটিয়ে এভাবে অন্য দেশে করোনা টিকা পাঠাবার ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনাও সেদেশে শুরু হয়েছে। সামনে তা আরও বাড়তে পারে।

ভারত সরকারের তরফে বাংলাদেশে জরুরিভাবে এই করোনা টিকা পাঠাবার সিদ্ধান্ত, এর সবটাই যে বন্ধুত্ব ও সদিচ্ছার প্রকাশ ছিল না, এর পেছনে যে রাজনীতি-কূটনীতির ভূমিকাই ছিলো মুখ্য, সাধারণ বুদ্ধিবিবেচনা দিয়েও আমরা তখন সেটা বুঝতে পেরেছি। সে সময় চীনের সিনোভ্যাক কোম্পানির টিকা নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তাদের আলাপ-আলোচনা ও দেন-দরবার চলছিলো। ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের দৌড়ঝাঁপের মাধ্যমে চীনকে পাশে ঠেলে দিয়ে ভারত সে সময় বাংলাদেশে দ্রুত ও বিনামূল্যে টিকা সরবরাহের মাধ্যমে বলা যায় একরকম কূটনৈতিক বিজয় অর্জন করে। এটা ছিলো বৃহৎ শক্তি হিসেবে এ অঞ্চলে চীনের সঙ্গে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা আরও সঠিক অর্থে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের অংশ। তারপরও বিনামূল্যে ও সহজে সংরক্ষণযোগ্য এই ভ্যাকসিনগুলো পাওয়ার জন্য আমরা ভারত সরকার ও সেদেশের জনগণকে অবশ্যই কৃতজ্ঞতা জানাবো। ভারত কেন, কোনো শক্তিশালী দেশই তাদের জাতীয় স্বার্থদৃষ্টি উপেক্ষা করে কারো প্রতি সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়ায় না। চীনও তা করতো না বা করবে না। সুতরাং ভারতের টিকা নিয়ে আমরা মোটেও ভুল করিনি। কিন্তু পাশাপাশি ও কমবেশি অন্য বিকল্পও না রেখে, এভাবে একটি মাত্র দেশ বা কোম্পানির উপর  নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে আমাদের জন্য বড় বিপদের কারণ হয়ে দেখা দেবে কিনা সেটাই এখন একটা বড় প্রশ্ন বা দুশ্চিন্তার বিষয়।

বিশেষ করে ভারতের কাছে অন্য বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের টিকা চাওয়া এবং নিজ দেশের সুবিশাল জনগোষ্ঠীর বিশাল ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যাপারে ভারতের সক্ষমতা কতোদিন বা কতোদূর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে সেটা এই মুহূর্তে একটা বড় প্রশ্ন। আরও যখন জানা গেছে বাংলাদেশের জন্য ভারতের টিকার পরবর্তী একটা চালান যা এর মধ্যেই এসে পৌঁছানোর কথা ছিলো, তা অজ্ঞাত কোনো কারণে বিলম্বিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আলাপ-আলোচনা থেকে যতোটা বুঝেছি, তাতে খরচ ও আবহাওয়া বিবেচনায় ফাইজার বা মডার্নার টিকা আমাদের জন্য মোটেও উপযোগী হবে না। তবে সহজে সংরক্ষণযোগ্য ও মূল্য সাশ্রয়ী হিসেবে উন্নয়নশীল অনেক দেশের মতো আমরাও চীনের সিনোভ্যাক এবং রাশিয়ার স্পুটনিক টিকার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা বা তা পাওয়ার জন্য বোধহয় এখনই সচেষ্ট হতে পারি। না, ভারতীয় টিকা বাদ দিয়ে নয়, সম্ভাব্য বিকল্প বা পরিপূরক হিসেবে। বলা হয়, ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই বুদ্ধিমানের কাজ। উদাসীনতা বা পরনির্ভরতা আমাদেরকে যেন আগামীতে হতবুদ্ধিকর ও অসহায় অবস্থায় না ফেলে। ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত