প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রফতানিকারকদের পথ দেখিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠন করা রফতানি উন্নয়ন তহবিল

অর্থনৈতিক ডেস্ক: প্রথম প্রজন্মের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের পুঁজি ছিল সামান্যই। নগদ অর্থ দিয়ে ঋণপত্র খুলে বিদেশ থেকে শিল্প উপকরণ আমদানি ছিল বেশির ভাগ উদ্যোক্তার দুঃস্বপ্ন। আবার ব্যাংক খাতের ঋণের সুদহারও ছিল প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি। এ পরিস্থিতিতে বারবার হোঁচট খাচ্ছিলেন শিল্পোদ্যোক্তারা। তৈরি পোশাক খাতের এ শিল্পোদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়াতে দেশের ব্যাংক খাতে প্রচলন করা হয় ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের। আর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নতুন এ ঋণপত্রের ধারণাকে সমৃদ্ধ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠন করা রফতানি উন্নয়ন তহবিল বা ইডিএফ।

মাত্র ৩ কোটি ১২ লাখ ডলারের তহবিল নিয়ে ১৯৮৯ সালে ইডিএফ তহবিলের যাত্রা। সময়ের বিবর্তনে রফতানিকারকদের জন্য চালু করা এ তহবিলের আকার ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই এ তহবিলে যুক্ত করা হচ্ছে আরো ৫০ কোটি ডলার। বৈদেশিক মুদ্রায় স্বল্প সুদের এ তহবিলের ঋণই দেশের রফতানি খাতের প্রবৃদ্ধিতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ মুহূর্তে রফতানি উন্নয়ন তহবিল থেকে ঋণ আছে ১ হাজার ৬৭০টি প্রতিষ্ঠানের নামে। ৫০০ কোটি ডলারের তহবিলের মধ্যে ৪৯২ কোটি ১০ লাখ ডলারই ঋণ হিসেবে বিতরণ হয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় ঋণের এ অর্থের পরিমাণ ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ইডিএফ থেকে ঋণ দেয়া হয় ছয় মাস মেয়াদে। এ হিসেবে প্রতি বছরই দুবার আবর্তন হয় এ তহবিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ তহবিল থেকে দেশের রফতানি খাতের সব শিল্প উদ্যোক্তাই উপকৃত হয়েছেন। এজন্য দেশের রফতানি খাতের সমৃদ্ধিতে ইডিএফকে মনে করা হয় প্রধানতম সহযোগী।

রফতানিতে সমৃদ্ধির পাশাপাশি ইডিএফের মাধ্যমে মুনাফাও করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ তহবিল থেকে ৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার মুনাফা হয়েছে। এর আগের বছরে ইডিএফ তহবিল থেকে ১০ কোটি ডলারের বেশি মুনাফা হয়েছিল। মুনাফার অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগ করে আনুপাতিক হারে বেশি মুনাফা হচ্ছে ইডিএফ থেকেই।

প্রায় শূন্য থেকেই শুরু হয়েছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের রফতানি খাত। রফতানি পণ্য বলতে ছিল, অল্প কিছু কাঁচা পাট-চামড়া আর চা। বিদেশের সঙ্গে ব্যবসা করবেন এমন অভিজ্ঞ বণিকের সংখ্যাও ছিল হাতে গোনা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরেও বাংলাদেশের রফতানি আয় ছিল মাত্র ২৯৭ মিলিয়ন ডলার। এ রকম একটি নাজুক পরিস্থিতি কাটিয়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে দেশের বার্ষিক রফতানি আয়। দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮৫ শতাংশই আসছে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত থেকে।

বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের সমৃদ্ধি ও বিস্তৃতিতে ইডিএফ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী এমপি। এনভয় গ্রুপের এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বর্তমানে বাংলাদেশে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ইএবি) সভাপতি পদেও দায়িত্ব পালন করছেন।তিনি বলেন, দেশের রফতানি খাতের সমৃদ্ধিতে ইডিএফের সাফল্য অভূতপূর্ব। এ তহবিল থেকে স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়ায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পেরেছেন। অন্যদিকে ইডিএফের মাধ্যমে ঋণপত্র খুললে বিদেশী ক্রেতারাও আস্থার সঙ্গে পণ্য সরবরাহ করেছেন। এজন্য শুরু থেকেই ইডিএফ থেকে ঋণ নিতে রফতানিকাররা উৎসাহী ছিলেন। পরিস্থিতির বিচারে এ তহবিলের আকার ও কার্যপরিধি আরো বড় করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ মুহূর্তে রফতানি উন্নয়ন তহবিল থেকে ঋণ নেয়া গ্রাহকের সংখ্যা ১ হাজার ৬৭০। এ উদ্যোক্তারা তহবিল থেকে ৪৯২ কোটি ১০ ডলারের ঋণ নিয়েছেন। ইডিএফ থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্যরা। সংগঠনটির সদস্যদের মধ্যে ৬১৩টি প্রতিষ্ঠান ইডিএফ থেকে ঋণ পেয়েছে। ইডিএফ থেকে ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এ মুহূর্তে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বস্ত্র খাতের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সদস্যরা। বিটিএমএ সদস্যভুক্ত ২৫৪টি প্রতিষ্ঠান ঋণ পেয়েছে ইডিএফ থেকে। তৃতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্যভুক্ত ২০২টি প্রতিষ্ঠান ইডিএফ থেকে ঋণ নিয়েছে। এছাড়া ডাইং ইয়ার্নের ১১১টি, প্যাকেজিংয়ের ১৪৫টি, চামড়া শিল্পের ২০টি, প্লাস্টিক শিল্পের ১৭টি এবং অন্যান্য খাতের ৩০৮টি প্রতিষ্ঠান ইডিএফ ফান্ড থেকে ঋণ নিয়ে ঋণপত্র খুলেছে।

ইডিএফ থেকে উদ্যোক্তারা ঋণ পায় তফসিলভুক্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। ছয় মাসের মধ্যে এ তহবিলের ঋণের বিপরীতে রফতানি বিল প্রত্যাবাসিত না হলে সমপরিমাণ অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হিসাব থেকে কেটে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে রিজার্ভের অর্থে গড়ে ওঠা এ তহবিল শুরু থেকেই নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইডিএফকে দেশের তৈরি পোশাক খাতের বেড়ে ওঠার সঙ্গী বলে মনে করেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি ও এভিন্স গ্রুপের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, ইডিএফ দেশের তৈরি পোশাক খাতকে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছে। এ তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সরকারও লাভবান হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভের যে অর্থ বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে বিনিয়োগ করে, সেখানে মুনাফা পায় ১ শতাংশের কম। আর ইডিএফের সুদহার এখনো ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ইডিএফ হলো রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগের সবচেয়ে উত্কৃষ্টতর উদাহরণ।

এ তহবিল থেকে সরকার প্রতি বছরই ভালো মুনাফা পায়। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় চলমান মহামারীতে ইডিএফ সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন এ শিল্পোদ্যোক্তা।

ইডিএফের গুরুত্ব ও কার্যকরিতা অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে চলমান করোনা মহামারীতে। বিদায়ী বছরের শুরুতে বিশ্বব্যাপী মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর থমকে গিয়েছিল রফতানি খাত। এ পরিস্থিতিতে রফতানিকারকদের বিপদের সঙ্গী হয়েছে ইডিএফ। সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী, ইডিএফের আকার ৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ৫ বিলিয়নে উন্নীত করা হয়। একই সঙ্গে সুদহার কমিয়ে আনা হয় ১ দশমিক ৭৫ শতাংশে। এতদিন শুধু দেশীয় উদ্যোক্তাদের ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্রের বিপরীতে ইডিএফ থেকে ঋণ নেয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) কার্যরত দেশী-বিদেশী যৌথ মালিকানার পোশাক কারখানাগুলোকেও ইডিএফ থেকে ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে নতুন করে এ তহবিলে ৫০ কোটি ডলার জোগান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন। ইডিএফ থেকে আগে উদ্যোক্তারা একসঙ্গে ২ কোটি ডলার ঋণ নিতে পারতেন। ঋণ নেয়ার সীমা ৩ কোটিতে উন্নীত করার পাশাপাশি এ তহবিলের ব্যাপ্তি বাড়ানোরও উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ইডিএফ থেকে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এতদিন শুধু ব্যাক-টু-ব্যাক এলসিকে বিবেচনায় রাখা হতো। সাম্প্রতিক সময়ে ডেফারেল এলসির ক্ষেত্রেও ইডিএফের ঋণ উন্মুক্ত করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সুযোগটি রফতানি খাতের সমৃদ্ধিতে আরো বেশি ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি দেশের তৈরি পোশাক খাতকে পথ দেখিয়েছে। এ ঋণপত্রের ধারণাটি ব্যাংকারদের কাছে স্পষ্ট ছিল না। দেশের প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলো ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে রফতানিকারকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। পরে ইডিএফ যুক্ত হয়ে দেশের রফতানি খাতের সমৃদ্ধির গতিকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

রফতানি উন্নয়ন তহবিল গঠন ও পরিচালনাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় সাফল্য হিসেবে মনে করেন নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রফতানি খাতের সমৃদ্ধি ও বিস্তৃতিতে ইডিএফ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এ তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা প্রত্যাশা অনুযায়ী স্বল্প সুদে ঋণ পেয়েছেন। তহবিলটি পরিচালনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকাও প্রশংসিত। পরিস্থিতির বিচারে সময়ে সময়ে ইডিএফের আকার বাড়ানো হয়েছে। ৫০০ কোটি ডলারের সঙ্গে আরো ৫০ কোটি ডলার যুক্ত করে ইডিএফের আকার সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ মুখপাত্র। – বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত