প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রবীর বিকাশ সরকার: স্বাধীনতার ইতিহাসে চাই জাতিগত ঐক্য

প্রবীর বিকাশ সরকার: পৃথিবীতে যে সকল দেশ সাম্রাজ্যবাদীর দখল থেকে লড়াই করে, রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সেসব দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কতোখানি মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ সেটা যদি সে দেশের নাগরিক বিশেষ করে শিশু ও তরুণ প্রজন্ম অনুধাবন না করতে পারে তার চেয়ে হতাশাব্যঞ্জক আর কিছু হতে পারে না। ইতিহাসের কোনোই মূল্য নেই, অথচ সঠিক ইতিহাস ছাড়া একদিনও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভবপর নয়।

একটি দেশের নাগরিকদের মধ্যে রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় বা সম্প্রদায়গত যতোই বিভেদ-বৈষম্য-মতবিরোধ থাকুক না কেন, অন্ততপক্ষে মহান স্বাধীনতা, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ, নির্বিবাদ শ্রদ্ধাবোধ এবং মতৈক্য থাকতে হবে। এটাই শক্তিশালী জাতিগঠনের প্রধান শর্ত। যথার্থ দালালিক প্রমাণের ভিত্তিতে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে প্রজন্মের শিক্ষা স্তর ভেদে পাঠ্যপুস্তকে স্থান দেওয়াটাই রাষ্ট্রের যথা কর্তব্য। এইক্ষেত্রে সামান্যতম ভুল-ভ্রান্তি, স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিবিদ্বেষ অথবা অবজ্ঞা সমগ্র জাতি এবং রাষ্ট্রকে বিতর্কিত করবে, করবে কলুষিত, সর্বোপরি বিশ্ববাসীর কাছে হাস্যস্পদ করে তুলবে। যে কারণে জাতির ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস অত্যন্ত সতর্কতা ও গুরুত্বের সঙ্গে লেখার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে জনগণের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে নানামত ও বিভেদ বিদ্যমান। যা আদৌ কাম্য নয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বাধীনতার জন্য সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধে কার কী কী ভূমিকা ছিল সেসব প্রশ্নে বাঙালির জাতীয় ঐক্য আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যে কারণে স্বাধীনতার পর আমাদের স্বনির্ভর হতে বারংবার বাধাগ্রস্ত হতে হয়েছে, রক্ত দিতে হয়েছে, ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে সজ্ঞানে, সজ্ঞানে স্বাধীনতার সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর বাসভবনে এবং জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং ক্যাপ্টেন কামারুজ্জামানকে জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমন ধরনের হত্যাকাণ্ড বিশ্বের ইতিহাসে একেবারেই বিরল এবং কলঙ্কজনক। রাজনৈতিকভাবে এসব ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে বিতর্কিত করা হচ্ছে নানা মনগড়া তথ্য দিয়ে। এতে করে যে একটি জাতির জাতীয় দুর্বলতা ধরা পড়ে এবিষয়ে আমরা সচেতন নই।

মানুষ মাত্রই ভুল-ভ্রান্তি থাকে, কর্মে ও নেতৃত্বে ভুল থাকতেই পারে, মানবজীবনে এটা যথাস্বীকৃত, তাই বলে হত্যা করতে হবে এমন বিধান কোথাও নেই। বিশেষ করে, স্বাধীনতা সংগ্রামের লাড়কু বীর বা রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা কোনো আন্দোলনের মাধ্যমে বা বিনাবিচারে তা কোনোভাবেই যথার্থ কাজ নয়। তার গভীর বিরূপ প্রভাব পড়ে শিশু ও তরুণ প্রজন্মের ওপর। সেই প্রভাবই তাদের মানসিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি, ইতিহাস ও কর্মকাণ্ড বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত করে তুলতে থাকে। মহান স্বাধীনতার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় ঐক্য না থাকার কারণে তারা বিপদগামী হয়, অদৃষ্টবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বিগত ৫০ বছরে স্বাধীন বাংলাদেশে তাই হয়েছে। স্বাধীনতার জন্য লাগাতার সংগ্রাম, রক্তঢালা লড়াই, শ্রমসাধ্য নেতৃত্ব এবং শেষশেষ যুদ্ধের ক্ষেত্রে যাদের যতোখানি অবদান আছে তার ততোখানি মূল্যায়ন নিয়ে আজও বিতর্ক বিদ্যমান। চলছে স্বজনপ্রীতি, দলীয় স্বার্থ, অবজ্ঞা-অবহেলা, প্রতারণা যা সভ্য কোনো দেশে চিন্তাই করা যায় না।

একটি জাতির ইতিহাস, তার স্বাধীনতার ইতিহাস কোনোভাবেই অবজ্ঞা-অবহেলার বিষয় নয়। তার প্রমাণ পাওয়া যায় এশিয়ার একাধিক দেশে যেমন, ভারত, জাপান, চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান প্রভৃতি। এসব দেশগুলোতে ঐতিহাসিক ঘটনা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নানাবিধ সমস্যা থাকার কারণে সত্যিকার ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়নি, বরং সজ্ঞানে ভুলভ্রান্তি সাজিয়ে ইতিহাস লিখিত হয়েছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে ভুল ইতিহাস শেখানো হচ্ছে। এমনকি একাধিক দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব দেশের অবদান রয়েছে অথবা দেশগঠনে সার্বিক বিনিয়োগ ও সহযোগিতা রয়েছে সেসবও সজ্ঞানে অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভুলভ্রান্তি শিখে বড় হচ্ছে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং সহমর্মিতা জলাঞ্জলি দিচ্ছে। এমনকি, তারা জানতেই পারছে না তার দেশের সত্যিকারের ইতিহাস কতখানি সঠিক, কতোখানি যৌক্তিক এবং প্রামাণিক। সুতরাং এতে করে জাতিগত ঐক্যেই শুধু ফাটল নেইÑআঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও দুর্বল থাকতেই হয়, শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না ঘরে বাইরে তথা দেশে-বিদেশে। কাজেই স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে রাষ্ট্রের সঠিক ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে সর্বাগ্রে স্বাধীনতার ইতিহাস বিষয়ে সর্বজনের স্বীকৃতি ও নিরঙ্কুশ ঐক্য স্থাপনে। লেখক : কথাসাত্যিক ও রবীন্দ্রগবেষক

সর্বাধিক পঠিত