প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এম আমির হোসেন: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী, অতীতের আলোকে প্রেডিকশন

এম আমির হোসেন: বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রটির বয়স পঞ্চাশ বছর হলো। কিন্তু এ অঞ্চলের ইতিহাস হাজার বছরের। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে বহমান ছিলো এ অঞ্চলের ইতিহাস-প্রবাহ। বাংলাদেশকে বুঝতে হলে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রেডিকশন করতে হলে এ অঞ্চলের ইতিহাস গভীর মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করা জরুরি।

ইতিহাসের জ্ঞান ছাড়া জ্ঞানার্জন কখনো পূর্ণতা পায় না। মানবসভ্যতার বিকাশ বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে হয়েছে। নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের আবহাওয়া, পরিবেশ ও প্রতিকূলতার প্রভাবে ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয়ে গড়ে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন জাতি। মানুষের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের ভিন্নতাও সঙ্গত কারণেই হয়েছে। জাতিতে জাতিতে মানুষের এই বিভক্তি কেবল অসৎ উদ্দেশ্যে হয়নি। এটি মানব প্রজাতির অনিবার্যতাও। অন্যান্য প্রাণি থেকে মানুষ উন্নত প্রাণি বলেই তারা বিভক্ত হয়েছে। মানুষের উন্নত মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন হয় বহুমাত্রিক চিন্তাধারা। আর চিন্তাধারার বহুমাত্রিকতার কারণেই তারা জাতিতে জাতিতে বিভক্ত। একেক জাতির ইতিহাসপরিক্রমা একেক রকম। মেধা, বুদ্ধি ও বিকাশ-প্রক্রিয়ায় পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবও একেক রকম। ইতিহাসের এই ধারা পর্যবেক্ষণ করে একটি জাতির ভবিষ্যৎ কী হতে পারে তা প্রেডিকশন করা যায়। পরবর্তী সময়ে কোনো জাতি কি বিকশিত হবে নাকি বিলুপ্ত হবে, খরস্রোতা হবে নাকি মরা-নদী হবে তা আগেভাগেই ঠাহর করা যায়। এজন্য ইতিহাসকে বিজ্ঞানের মতো অধ্যয়ন করতে হবে। ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার জন্যও ইতিহাসবিজ্ঞানের অধ্যয়ন অত্যন্ত জরুরি।

বাঙালি জাতির উৎপত্তি কোথায়? আমরা জানি, বাঙালি মিশ্র জাতি। শতকরা হিসেবে যৌগিক এই জাতির সত্তরভাগ এসেছে অস্ট্রিক জাতি (Proto Australoid)থেকে, অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের সাথে এদের বেশ মিল রয়েছে। এদেশে এই রক্তের অবিকৃত উদাহরণ হলো সাঁওতালসহ আরো কিছু আদিবাসী। বিশভাগ এসেছে ভোট-চিনীয় জাতি (Sino-tibetan)  থেকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা এই রক্তের ক্লাসিক উদাহরণ। পাঁচভাগ এসেছে নিগ্রো (Negroid)  রক্ত থেকে এবং বাকি পাঁচ ভাগ অন্যান্য রক্ত থেকে। এ সকল রক্তধারার সংমিশ্রণ থেকে উদ্ভূত এই জাতি। মৌলিক পদার্থের সংমিশ্রণে যে নতুন যৌগ উৎপন্ন হয় এর থাকে নতুন ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। তাই বাঙালি জাতির বৈশিষ্ট্যও সম্পূর্ণ নিজস্ব। আধুনিক ও গণতান্ত্রিক ধারণার রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বাঙালির খুব বেশি দিনের নয়। বিশ্বে বাংলাদেশই বাঙালির একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র। বাঙালির যৌগিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব-দরবারে বাংলাদেশকে সম্মানের আসনে বসানোর সময় এখনও ফুরিয়ে যায় নি। বাংলাদেশ পারবে, বাঙালি পারবে-এ শুধু আবেগী বিশ্বাসের কথা নয়; নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও বস্তুবাদী ব্যাখ্যাও বলে বাঙালির দুর্দম গতিকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আগামী পঞ্চাশ-ষাট বছরেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উন্নত এক রাষ্ট্র হয়ে ওঠবে।

সন্দেহ নেই যে, ‘বাংলাদেশি’ আমাদের নাগরিক জাতীয়তার পরিচয়, বিশ্বের কাছে রাষ্ট্রীয় আইডেন্টিটি আমাদের এটিই। কিন্তু ‘বাঙালি’ আমাদের সাংস্কৃতিক জাতীয়তার পরিচয় যা সহস্র বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। আমরা ‘বাংলাদেশি বাঙালি’। এখানে আরও আছে বাংলাদেশি চাকমা, মারমা, গারোসহ নানান বাংলাদেশি আদিবাসী। ধর্মীয় পরিচয় সাংস্কৃতিক ও পারলৌকিক বিশ্বাসগত একটি পরিচয়। একজন মানুষ যেমন কারো বন্ধু, কারো ভাই, কারো সন্তান, কারো পিতা এমন অনেক পরিচয়ে পরিচিত, তেমন একটি জাতিরও অনেক পরিচয় থাকে। কিন্তু আমাদের সকল পরিচয়ের প্রধান পরিচয় আমরা মানুষ।

এ অঞ্চলের প্রাচীন ধর্ম হলো সনাতন ধর্ম। অন্যান্য ধর্ম থেকে সনাতন ধর্ম কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। প্রধান সকল ধর্মেই স্রষ্টা কর্তৃক আদিষ্ট প্রধান একজন প্রচারক থাকে। কিন্তু সনাতন ধর্মে তেমন প্রধান কোনো প্রচারক নেই। ভারতবর্ষের আদিকাল থেকে প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আচার নিয়ে গড়ে উঠেছে এই ধর্ম। বিভিন্ন মুনি-ঋষিরা সনাতন ধর্মের দার্শনিক ভিত্তি দিয়েছেন, প্রয়োজন মতো প্রচার ও সংস্কার করেছেন ধর্ম-সংস্কারকরা। একপর্যায়ে এই ধর্মের সুবিধাভোগী অংশটি অপর বিরাট অংশকে নানানভাবে নিগ্রহ করতে থাকে। নিগৃহীত নিম্নবর্গের এই অংশের কাছে সঙ্গত কারণেই প্রথমত সহজ প্রেমের বৌদ্ধধর্ম ও পরবর্তী সময়ে সুফি-সাধক কর্তৃক প্রচারিত ইসলামধর্ম প্রিয় আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। নিম্নবর্গের ধর্মান্তরিত সনাতনধর্মীরাই মূলত বাঙালি মুসলমানের পূর্বপুরুষ;-ঐতিহাসিক এই সত্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু মানুষ কেন নিম্নবর্গের হয়? এই জন্য সামাজিক অপশাসন যেমন দায়ী তেমনি নিম্নবর্গের মানুষের আলস্য, ভাগ্য-নির্ভরতা, মেধাহীনতাও কম দায়ী নয়। বাঙালি মুসলমানের পূর্বপুরুষদের এই বৈশিষ্ট্যগুলো যে ছিলো তা নিঃসন্দেহে ধরে নেওয়া যায়। এর সত্যতা বর্তমানেও পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু তাই বলে কি এই অবস্থার পরিবর্তন অসম্ভব? আমি তা মনে করি না।

বাঙালি মুসলমানের কাছে মুসলমানত্ব বড় নাকি বাঙালিত্ব বড়-এই প্রশ্ন তুলে কিছু বুদ্ধিকৌশলী আত্মপরিচয়ের সঙ্কট তৈরি করতে চায়। বুদ্ধিতে এ জাতিকে অবদমিত রেখে বুদ্ধি-উপনিবেশ জারি রাখার এ এক পুরনো কৌশল। অত্র অঞ্চলে ধর্ম যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উপাদান তাই বাঙালিত্বের সাথে ধর্মীয় কিছু উপাদানের অভিযোজন থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। মুসলমানদের ধর্মের উৎপত্তিস্থল আরবদেশে বলে বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিতে বাঙালিত্বের পাশাপাশি কিছু আরবি সৃংস্কৃতিও যুক্ত হয়েছে। এবং এটাই স্বাভাবিক। যেমন হিন্দু বাঙালির সংস্কৃতিতে বাঙালিত্বের পাশাপাশি হিন্দুধর্মীয় সংস্কৃতির সংযোগ আছে, ঠিক তেমন। ক্রমশ যোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে একটি জাতির সাংস্কৃতিক প্রবাহ এগিয়ে চলে। একে স্থির রাখা অসম্ভব; এবং অপ্রয়োজনীয়ও। ধর্ম জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ; তবে ধর্মকেন্দ্রিক জঙ্গিবাদ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ইস্যু। ধর্ম-কেন্দ্রিকতার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদ, আঞ্চলিকতাবাদ, সমাজতন্ত্রসহ যে কোনো মতাদর্শকে ঘিরেই জঙ্গিবাদ সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে জঙ্গিবাদ বলতে মূলত ধর্মের আশ্রয়ে বেড়ে-উঠা উগ্র মতাদর্শকেই বোঝায়। শান্তি ও সৌহার্দপূর্ণ বাঙালিত্বের বিকাশে জঙ্গিবাদ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এই জঙ্গিবাদের পিছনে বৈশ্বিক রাজনীতির অনেক হিসাব-নিকাশও আছে। কমিউনিস্ট ব্লকের পতনের পর ক্যাপিটালিস্ট ব্লকের ‘শত্রু-শত্রু’ খেলার বর্তমান অপন্যান্ট হলো জঙ্গিবাদ। ধর্মীয় জঙ্গিবাদকে মোকাবেলার পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদী এই খেলাকেও মোকাবেলা করতে হবে। বুদ্ধিজীবী ও সচেতন মহলের এই বিষয় নিয়েও উচ্চবাচ্য করতে হবে। অন্যথায় মানব সভ্যতার এই সঙ্কট চলমানই থাকবে। সহজে বন্ধ হবে না। বাংলাদেশও পারবে না এর বাইরে থাকতে।

আশার কথা হলো, বাঙালি মুসলমানের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি তাদের বাঙালি পরিচয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা বায়ান্নতে ভাষার জন্য, একাত্তরে দেশের জন্য লড়াই করে সফলতা ছিনিয়ে আনতে পেরেছিল। মুসলিম-প্রধাম পাকিস্তান ভেঙ্গে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠন করেছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিদ্যমান বাঙালি জাতির মধ্যে এই পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের তথাকথিত নিম্নবর্গের বাঙালিদেরই আছে গর্ব করার মতো সাফল্য। ভবিষ্যতেও এই সাফল্য চলমান থাকবে। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পর ইউরোপের সব দরিদ্র, নিম্নবর্গের ভাগ্যান্বেষীরা ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সেখানে গমন করত। স্বাধীনতার পর সঠিক সংবিধান ও রাজনীতির কারণে সেই আমেরিকা আজ বিশ্ব নেতৃত্বের অধীশ্বর। একাত্তরের পর-পর বাঙালিও একটি সংবিধান তৈরি করেছিল যার মধ্যে ছিলো এ দেশের মুক্তির দলিল। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এ দেশ ভুল পথে চলে গেলেও ঐতিহাসিক সূত্রমতে বাঙালিরা একসময় ঠিকই এ দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। গণতন্ত্র, কল্যাণ জাতীয়তাবাদ, সুশাসন, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকে গড়ে উঠবে আলোকিত এক বাংলাদেশ। একদিন বিশ্ব-বাঙালির মুখউজ্জ্বল করে দাঁড়াবে এই জাতিরাষ্ট্রটি। এবং বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসাবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমার বিশ্বাস, কাঙ্ক্ষিত সেই দিন খুব দূরে নয় আমাদের। লেখক : চিকিৎসক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত