প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রবীর বিকাশ সরকার: স্মৃতিতে পুলিশ ফাঁড়িটি

প্রবীর বিকাশ সরকার: ১৯৭১ সালে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ ও জনগণের মধ্যে সংঘর্ষের খবর দৈনিক পত্রিকায়  দেখতাম। বাসায় দৈনিক সংবাদ রাখতো বাবা। বড় বড় ছবি দেখেছি সংগ্রামরত মানুষের। তখন একটা থমথমে ভাব কুমিল্লা শহরব্যাপী নেমে আসছিল। কিছু একটা হবে এরকম শঙ্কা, উৎকণ্ঠা মানুষের চোখেমুখে। কিন্তু আমার নয়, কারণ তখন আমি মাত্র ১২। শহর ছেড়ে ধীরে ধীরে মানুষ চলে যেতে লাগলো গ্রামের দিকে। শঙ্কিত বা দূরদর্শী হিন্দুরা তো আরো আগেই। বাবা বললো, ‘পাকিস্তানিরা হামলা করতে পারে সেরকম  ঘোট পাকাচ্ছে।’

বাবার আশঙ্কাই সত্যি হলো। মার্চের ২৫ তারিখ মধ্যরাতে বিকট রকম দ্রাম-দ্রুম, ঠাস ঠাস, টা টা টা শব্দে ঘুম ভেঙে আমাদের। লাফ দিয়ে উঠে বসলাম বিছানায়। অন্ধকারে কোথা থেকে এই শব্দ আসছে সহসা বুঝতে পারলাম না! বাতাসে একটু হিম। আধখোলা জানালা দিয়ে দেখলাম পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের আকাশ ভীষণ লাল! ক্ষণে ক্ষণে হলদে আর কমলা রঙের আগুন কুণ্ডুলি পাকিয়ে উঠছে ওপরের দিকে শব্দ করে, আবার নিভে যাচ্ছে। পুরো শহরই মিসমিসে কালো অন্ধকার। অনবরত শব্দে বোমা নাকি যেন ফাটছে আর চারদিক ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে! অস্পষ্ট হৈহল্লাও ভেসে আসছে। বারুদের তেজষ্ক্রিয় খুশখুশে গন্ধ বাতাসে ধেয়ে আসছে এদিকেই এবার। বাবা গায়ে শার্ট চড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। আমিও গেলাম বারান্দায়। মাও উঠে এসেছে পেছনে পেছনে। ছোটভাই ও বোন দুটো গভীর ঘুমে। দেখলাম লাগোয়া প্রতিবেশী হরেন্দ্রনাথ দাশ ও তাঁর বড় ছেলে কালীদাও এসে পাশে দাঁড়িয়েছেন। বাবা হরেন জেঠুকে বললেন, ‘পুলিশ লাইন আক্রান্ত হয়েছে।’ হরেন জেঠু বললেন, ‘হ্যাঁ। পুলিশ লাইনই হবে। শেষ পর্যন্ত নামলো সামরিক জান্তা!….স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না কিন্তু জেলখানা রোড ধরে মানুষ পালিয়ে যাচ্ছে, ছুটছে, দেখুন!’

অন্ধকারেও আবছায়া দেখা যাচ্ছিলো মানুষ ছুটছে ধুপধাপ শব্দ করে। তারা যে পুলিশ তাতে কোনো ভুল নেই। ছোটরা পাইক পুকুরের উত্তর-পূর্বকোণে অবস্থিত আমাদের বাসা থেকে সরাসরি দেখা যাচ্ছিল পুলিশ ফাঁড়ি এবং জেলখানা রোড যেটা পুকুরের পশ্চিম পাড় ধরে কালিয়াজুড়ি হয়ে গোমতী নদীর দিকে চলে গেছে। কয়েক ঘণ্টা পর গোলাগুলি তিথিয়ে এলেও ভোরবেলা পর্যন্ত ঠাস ঠুস করে বন্দুকের আওয়াজ পাওয়া গেলো। বাকি রাত আর ঘুম হলো না। এবার অজানা একটা ভয় আমাকেও পেয়ে বসলো। সকালবেলা প্রতিবেশী কেউ কেউ এসে বললেন, ‘ফাঁড়িতে যেসকল পুলিশ ছিল তাদেরকে হত্যা করেছে, কিছু ধরেও নিয়ে গেছে।’

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই ফাঁড়িটির সঙ্গে আমার শৈশব থেকে তারুণ্য পর্যন্ত গভীর সম্পর্ক ছিলো। কারণ ফাঁড়ি সংলগ্ন এবং বাসার নিকেটেই ডিসি অফিস প্রাঙ্গণে কুমিল্লা সদর পুলিশ কোর্ট ছিলো। বাবা পুলিশ অফিসার হিসেবে এখানে কাজ করেছে বহু বছর। কাজেই পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশরা আমাকে খুব ভালো করে চিনতেন এবং স্নেহ করতেন ‘বাবুর ছেলে’ বলে। মাঝেমাঝে যেতাম বন্ধুদের নিয়ে তখন তারা আদর করে বিস্কুট, মোয়া, মুড়ি, চকোলেট খাওয়াতেন। দেখেছি স্বল্প বেতনে কতো কষ্ট সহ্য করে দায়দায়িত্ব পালন করতেন তারা। গ্রামে বা অন্য জেলায় তাদের স্ত্রী ও সন্তান ছিলো, ছুটি-ছাটা না থাকার কারণে যেতে পারতেন না। তাই স্নেহের ভাণ্ডার উপচে পড়ত আমাদের মতো ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ওপর। এমনকি বড় হয়েও মাঝেমাঝে যেতাম তাদের আহ্বানে, চা এনে খাওয়াতেন। এরকম একটা মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল যা স্বাধীনতার পরও ছিল।

ঐতিহাসিক এই পুলিশ ফাঁড়িটি ছিলো কুমিল্লার একটি স্মারক স্তম্ভ কারণ মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ততা। শহীদ হয়েছেন যারা বা পাকসেনার দ্বারা অপহৃত হয়েছেন তারা কেউ আর ফিরে আসেননি। সেই হারিয়ে যাওয়া পুলিশ কর্মীদের কারও কারও মুখ আজও চোখে ভাসে। স্বাধীনতার পর দেখেছি তাদের আত্মীয়-স্বজনরা এসে ফাঁড়িটি পরিদর্শন করতেন। পরিত্যক্ত জিনিস ও চিঠিপত্র নিয়ে যেতেন।

সম্প্রতি ফাঁড়িটি ভেঙে লোপাট করে দেয়া হয়েছে। অগ্রজ বন্ধু শাহ্জাহান চৌধুরী যখন জানালেন, আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম! দুচোখ থেকে শুধু তপ্ত জল গড়িয়ে পড়েছিলো। ভীষণ বেদনাহত হয়েছি। জাপান হলে এটা হত সাংস্কৃতিক সম্পদ বা মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিঘর। পথিকৃৎ কুমিল্লার এরকম একটি স্মারক স্তম্ভ লোপাট করাটা কি ভালো কাজের লক্ষণ?  লেখক : কথাসাহিত্যিক ও রবীন্দ্রগবেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত