প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাহবুব মোর্শেদ: আমার গুরু মিজানুর রহমান খান

মাহবুব মোর্শেদ : খুঁজলে হয়তো দিনতারিখ পাওয়া যাবে। এখন ভারাক্রান্ত মনে সে ইচ্ছা কাজ করছে না। ২০০৫ সালের শেষ দিকের কথা। সেদিনই মিজান ভাই সমকালে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। সাধারণত কোনো লেখা লিখতে বসলে মিজান ভাই সরবে লিখতেন। টেবিলজুড়ে রেফারেন্স বই মেলে ধরে তিনি অস্থিরভাবে হেঁটে বেড়াতেন। আর একজন টাইপিস্টকে ডিকটেশন দিতেন। ফাঁকে ফাঁকে আমাদের ডেকে নানা বিষয় আলোচনা করতেন। তিনি যা লিখছেন সে সম্পর্কে কোনো তথ্য জানার থাকলে বা ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে জানার থাকলে বলতেন। কিন্তু এই লেখাটা দুদিন ধরে তিনি একা একাই লিখছিলেন। সেটা যে একটা পদত্যাগপত্র হতে পারে, সেটা লেখা শেষ হওয়ার পর আমাকে একা ডেকে নিয়ে বলার আগে আমি বুঝতে পারিনি। খবরটা আমার মন খারাপ করে দিলো। পদত্যাগপত্রটা পড়তেও দিলেন। পদত্যাগপত্র না বলে সেটাকে বলা যায় গোলাম সারওয়ারের উদ্দেশে দেওয়া এক দীর্ঘ মানপত্র। সারওয়ার ভাইয়ের হাজারো প্রশংসার পর মিজান ভাই লিখেছেন ভারাক্রান্ত হৃদয়ে একান্ত ব্যক্তিগত কারণে তিনি সমকালে আর কাজ করতে পারছেন না।

মিজান ভাই চিঠিটা নিয়ে সমকাল অফিসে গেলেন। তখন তেজগাঁওয়ে সমকালের অফিস হলেও ফিচার ও এডিটরিয়ালের স্থান হয়েছে হামীম গার্মেন্টের তেরোতলার টপ ফ্লোরে। আর নিউজের স্থান গার্মেন্টেরই একটা ওয়্যার হাউস খালি করে তাড়িঘরি তৈরি করা অফিসে। ইউটিসি বিল্ডিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতভিন্নতার কারণে রাতারাতি কাওরান বাজারের অফিস ছেড়ে এই দুই জায়গায় পুনর্বাসিত হয়েছি আমরা।

মিজান ভাই ছিলেন সমকালের দ্বিতীয় ব্যক্তি। যুগান্তর থেকে সারওয়ার ভাই একঝাঁক সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী নিয়ে সমকালে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অনেক সিনিয়র সাংবাদিক ছিলেন। কিন্তু সারওয়ার ভাই মিজান ভাইকেই ডেপুটি এডিটর করেছিলেন। পরে মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু ভাইও ডেপুটি এডিটর হিসেবে যোগ দেন। প্রকাশিত হওয়ার পরপরই সমকালে একটা বিভাজন ঘটে যায়। প্রায় তিনটি দল সেখানে সক্রিয় হতে থাকে। মিজান ভাই সাংবাদিকতায় দক্ষ হলেও স্বভাবগতভাবে খুবই ইন্ট্রোভার্ট ছিলেন। অফিসের অন্তর্দলীয় বিষয়গুলোতে তার ভূমিকা ছিলো খুবই নিষ্ক্রিয়। তাছাড়া নিউজ আর এডিটরিয়াল আলাদা ভবনে থাকায় সারওয়ার ভাইয়ের সঙ্গে একটা অবস্থানগত বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিলো তার। এই ফিজিক্যাল দূরত্বকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজে অন্যেরা সারওয়ার ভাইয়ের কাছে তাকে ভিলেন বানিয়ে দিয়েছিলো। মিজান ভাই মাঝে মাঝে বলতেন সে কথা। আমরা অফিস থেকে বের হতাম রাত বারোটার দিকে। নাবিস্কো মোড় থেকে হাঁটতে থাকতাম। সোনারগাঁও মোড়ে এসে দুদিকে চলে যেতাম। হাঁটতে হাঁটতে মিজান ভাই অনেক কথা বলতেন। তার পেশাগত জীবনের কথা। সাংবাদিক হয়ে ওঠার কথা। সারওয়ার ভাইয়ের কথা। মিজান ভাই বলতেন, মাহবুব সাংবাদিক হওয়ার জন্য জ্যাক অব অল ট্রেডস হতে হয়, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু গুড ফর নাথিং হওয়া যাবে না। কোনো একটা স্পেশাল অঙ্গনে দক্ষতা তৈরি করতে হবে। আমাকে মাঝে মাঝে নানা বিষয়ে আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করতেন। মিজান ভাইয়ের দক্ষতা ছিলো পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা, আইন ও সংবিধান বিষয়ে। আরও নানা বিষয়ে ছিলো। কিন্তু এগুলোই প্রধান। এসব বিষয়ে যে কোনো প্রশ্নের উত্তর তার কাছে ছিলো। এসব বিষয়ে তার সোর্স ছিলো সর্বোচ্চ লেভেলের। একটা উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হবে। সংবিধান, আইন ও বিচার সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি ফ্রিকোয়েন্টলি কথা বলতেন দুই প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল ও মুহম্মদ হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। খুব অর্থপূর্ণ ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্ক ছিলো। মিজান ভাইয়ের কাজ ও আগ্রহের যে ব্যাপ্তি তাতে শুধু সম্পাদকীয় পাতায় তার কনটেন্ট ধরানো যেতো না। অনেক সময়ই তিনি এক্সক্লুসিভ নিউজ করতেন। এসব বিষয়ে সম্পাদক হিসেবে গোলাম সারওয়ার খুই উদার ছিলেন। তিনি প্রথম পাতায় মিজান ভাইয়ের লেখা উদারভাবে ছেপেছেন। তাকে নানা সমর্থন দিয়েছেন। সমকালে মিজান ভাই সম্পাদকীয় ও অনুবাদ বিভাগের জন্য যে টিম করেছিলেন তা এখন পর্যন্ত যে কোনো বিবেচনায় সবচেয়ে বড় টিম। আমাদের পরিকল্পনা ছিলো, নিউজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মতামত ছাপতে হবে। মতামতে আমরা সবচেয়ে এগিয়ে থাকবো। প্রথম পাতায় খবর পড়ে পাঠক ভেতরের পাতায় বিশ্লেষণ ও মতামত পেয়ে যাবে। এসব বিষয়ে সারওয়ার ভাইয়ের সমর্থন ছিলো। মিজান ভাই টিমের প্রত্যেকের জন্য শুধু কম্পিউটার বরাদ্দ করেননি, ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সে সময়ে এটা প্রায় অকল্পনীয় ব্যাপার ছিলো। আমাদেরকে বিদেশের সেরা পত্রিকাগুলো পড়তে উৎসাহ দিতেন। পত্রিকার মেকাপ থেকে শুরু করে কনটেন্ট সব কিছু নিয়ে নানা গবেষণায় খুব উৎসাহ দিতেন। টিমের প্রত্যেকের পিসিতে দুই রকমের এনসাইক্লোপেডিয়া ইন্সটল করে দিয়েছিলেন।

অফিস সময় বলতে যে ব্যাপারটি আজকের কাগজে মেনটেন করতাম সেটা পুরো ভেঙে দিয়েছিলেন তিনি। নেশা ধরিয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার। যখন তিনি পদত্যাগ করার দারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন তখন গোপন মার্কিন ডকুমেন্টগুলো নিয়ে প্রতিদিন লিখছেন সমকালের পাতায়। বাংলাদেশে ওটাই ও নিয়ে প্রথম কাজ। বিপুল আকারের ডকুমেন্ট। আমাদের জ্বালিয়ে মারতেন সে সময়। এটা লাগবে ওটা লাগবে বলে অস্থির করে ফেলতেন। ডকুমেন্ট অনুসারে সাপোর্টিং লেখাপত্র, ছবি জোগাড় করতে করতে আমরা অস্থির হয়ে যেতাম। একটা নেশার মতো ব্যাপার। তিনি যখন এই কাজে ডুবে তখন তার খেল খতম হচ্ছে সমকালে। শেষে তিনি পদত্যাগ করলেন। পদত্যাগপত্র দিয়ে তিনি অফিসে ফিরলেন। আমি তার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। তিনি কাগজপত্র গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। আরও আগে থেকেই হয়তো গোছাচ্ছিলেন। একজনকে দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। রাত এগারোটার পর আমি আর মিজান ভাই বের হলাম। নাবিস্কো থেকে হেঁটে শংকর পর্যন্ত তার বাসায় গেলাম। যা কথা হলো সবই আবেগের। বললেন, মতি ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রথম আলোতে যোগ দেবেন। কটা দিন গেলে আমাকে নেবেন সঙ্গে। মাঝে মাঝে সেই রাতটার কথা মনে পড়ে আমার। ২০০৫ সাল জুড়ে প্রায় পুরো একটা বছর প্রতিদিন মিজান ভাইয়ের সঙ্গে কেটেছে। কিন্তু ওই রাতটার কথা আমি ভুলতে পারি না।
আমি যখন প্রথম আলো ছাড়ি তখন মিজান ভাই অনেকবার বুঝিয়েছেন। বলেছেন, আমার সঙ্গে সমকালে কী হয়েছে সেসব জানার পরও প্রথম আলো ছেড়ে আবার আপনি সমকালে যেতে চাইছেন। কিন্তু তখন আমার মনে হয়েছিলো ব্লগের মডারেটর হয়ে সাংবাদিকতা থেকে আমি পিছিয়ে পড়বো। তাই মিজান ভাইয়ের কথা অমান্য করেই প্রথম আলো ছেড়েছিলাম। আমিও খুব ইন্ট্রোভার্ট। সহজে কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারি না। তবু মিজান ভাইয়ের সঙ্গে একটা যোগাযোগ ছিলো। যেদিন কথা হতো সেদিন কমপক্ষে ঘণ্টাখানেক চলতো আলাপ। আমি বলেতাম, মিজান ভাই, মতি ভাইয়ের ওখানে গিয়ে আপনার নিজের মতটা হারিয়ে যাচ্ছে। মিজান ভাই হাসতেন। খুব মিষ্টি লাজুক একটা হাসি ছিলো তার। খুব মগ্ন একটা মানুষ। খুব ভালোবাাসা ছিলো। আমি অনেক ভালোবাসা পেয়েছি তার। সেসবের ঋণ থেকে গেলো। সাংবাদিকতা নিয়ে কতো পরিকল্পনা ছিলো মিজান ভাইয়ের। সেসব না দেখাই থেকে গেলো। কিছুই ভালো লাগছে না। মিজান ভাই, অকালে অশ্রুসজল হৃদয়ে আপনাকে বিদায় জানাতে হবে কখনো ভাবিনি। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত