প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

করোনা বিপর্যয়ের বছর ২০২০ ফিরে দেখা :স্বাস্থ্য খাত
আলোচনার শীর্ষে স্বাস্থ্য খাত

ডেস্ক রিপোর্ট: চলতি ২০২০ সাল জুড়ে দেশে আলোচনার শীর্ষে ছিল স্বাস্থ্য খাত। করোনা মহামারির সময় দেশের স্বাস্থ্য সেবা খাতের দুরবস্থার চিত্রও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পদে পদে অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, স্বজনপ্রীতির ঘটনা একে একে প্রকাশ্যে এসেছে। করোনার নমুনা পরীক্ষায় জালিয়াতি, মাস্ক কেলেঙ্কারি, চিকিত্সা খাতে অবকাঠামো নির্মাণ ও ক্রয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, রোগী ভোগান্তি, আইসিইউ সংকটসহ চিকিত্সার নামে মানসিক হাসপাতালে ধস্তাধস্তি করে রোগী হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। কোভিড-১৯ অজুহাতে অন্য জটিল রোগে আক্রান্তরাও সুচিকিত্সা পাননি। দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কার্যক্রম সঠিকভাবে মনিটরিং করা হয়নি। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে স্বাস্থ্য খাতে অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। চলতি বছর স্বাস্থ্য খাতের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত এমন কয়েকটি ঘটনা সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো:

১২২ চিকিত্সকের প্রাণহানি: করোনা মোকাবিলায় পুরো বিশ্বই যখন গলদঘর্ম, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন ডাক্তার-নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা। তারা করোনার বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধের সম্মুখসারির যোদ্ধা। পরিবারের আপন মানুষদের ছেড়ে দীর্ঘদিন হাসপাতালে থেকে দিন-রাত করোনার রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এ এমনই এক দুর্যোগময় মুহূর্ত, যখন অসুস্থের পাশে তার পরিবার বা বন্ধুরাও যেতে পারছেন না। এমনকি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের সময়ও কোনো প্রিয়জনের স্পর্শ পাচ্ছেন না। একমাত্র চিকিত্সাসেবীরাই সঙ্গী। এই ভয়াবহ মহামারির বিরুদ্ধে টানা যুদ্ধ করতে গিয়ে এই সম্মুখযোদ্ধাদের অনেকেই আজ পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত এবং মানসিকভাবে বিপর্যন্ত। দেশে করোনা ভাইরাস আসার পর প্রথম দিকে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্য সেবাকর্মীরা ভয় পেয়ে যান। যে কারণে চিকিত্সা সেবা কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছিল। বর্তমান সব ভয় কাটিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা দিচ্ছেন ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থ্য সেবা কর্মীরা। করোনা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে নিজেরাই আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ১২২ জন চিকিত্সক মারা গেছেন। নার্স মারা গেছেন ১৮ জন। এছাড়া এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৮৫ চিকিত্সক, ১ হাজার ৯৭৯ জন নার্স ও ৩ হাজার ২৮৫ জন স্বাস্থ্য সেবা কর্মী।

করোনার রিপোর্ট জালিয়াতি:করোনা ভাইরাসের মতো মহামারির সময়েও মানুষ অনিয়ম ও দুর্নীতি থেকে পিছু হটেনি। গত ২৩ জুন করোনার নমুনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট তৈরির অভিযোগে জেকেজি হেলথকেয়ারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ডা. আরিফুল হক চৌধুরীসহ ছয় জনকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা পুলিশ। একই অভিযোগে গত ১২ জুলাই জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন ও জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে তেজগাঁও থানা পুলিশ গ্রেফতার করে। রিমান্ড শেষে তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত।

সাহেদকাণ্ড:করোনার নমুনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট প্রদান ও সরকারের সঙ্গে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে রিজেন্ট হাসপাতাল। পরে উত্তরা পশ্চিম থানায় র্যাব বাদী হয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে ১ নম্বর আসামি করে মামলা করে। সেই মামলায় ৯ দিন পলাতক থাকার পর ১৫ জুলাই ভোরে সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্ত এলাকা থেকে সাহেদকে গ্রেফতার করে র্যাবের একটি দল। সর্বশেষ ২৩ আগস্ট সাত দিনের রিমান্ড শেষে সাহেদকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত।

মাস্ক কেলেঙ্কারি:বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে নকল ‘এন-৯৫’ মাস্ক সরবরাহের অভিযোগে ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগ নেত্রী শারমিন জাহানকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। পরে রিমান্ড শেষে ২৮ জুলাই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে ২০ হাজার ৬০০টি এন-৯৫ নামে নকল মাস্ক সরবরাহ করে জেএমআই গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও এমডি মো. আব্দুর রাজ্জাক। নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সরঞ্জাম সরবরাহে দুর্নীতির অভিযোগের মামলায় ২৯ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গ্রেফতার করে রাজ্জাককে।

লাশ ফেলে স্বজনদের পলায়ন:করোনায় মৃত ব্যক্তিদের আইসিইউতে রেখে দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে রাজধানীর কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল। অনেকে লাশ রেখে চলে আসেন। এমন কয়েকটি ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে আসে। এদিকে প্রথম দিকে করোনায় মৃতদের লাশ ফেলে স্বজনরা পালিয়ে যান। মাকে জঙ্গলে ফেলে রাখেন সন্তান। নারায়ণগঞ্জে সিঁড়িতে লাশ রেখে স্বজনরা পালিয়ে যান। পুলিশ এসে দাফনের ব্যবস্থা করে। এমনকি করোনায় মৃত অনেকের কবর খোঁড়ার লোকও পাওয়া যায়নি। সেক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কবর খোঁড়ার কাজও করেন। পরবর্তীতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে এখন স্বজনরা লাশ দাফন করছেন।

বেহাল হাসপাতাল-ক্লিনিক :করোনা মহামারির সময়েও সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলোর বেহাল দশা কাটেনি। চিকিত্সা নিতে এসে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা। ঢাকাসহ সারা দেশেই এখনো আইসিইউ সংকট রয়েছে। রাজধানীর বাইরে আইসিইউ তো সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া জেলা সদরের অধিকাংশ হাসপাতালই চিকিত্সক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী সংকটে রয়েছে।

গাড়িচালকের দুর্নীতি: করোনাকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ডিজি অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ নানা অনিয়মের অভিযোগ মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন। পরে তারই গাড়িচালক শত কোটি টাকার মালিক আব্দুল মালেক ওরফে মালেক ড্রাইভারকে অবৈধ অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি দেখানো, চাঁদাবাজি, জাল টাকার ব্যবসাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেফতার করে র্যাব। ঢাকায় তার ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। ধানমন্ডি, উত্তরাসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় বিলাসবহুল সাততলা তিনটি বাড়ি আছে। ছেলের নামে তুরাগে ডেইরি ফার্ম করেছেন কোটি টাকা দিয়ে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২৭ জন আত্মীয়কে বিভিন্ন পদে চাকরিও দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করতেন স্বাস্থ্যের গাড়ি বাণিজ্য।

‘মৃত’ নবজাতকের নড়ে ওঠা:গত ২০ অক্টোবর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এক নবজাতককে মৃত ঘোষণার পর দাফনের সময়ে ঐ শিশু নড়ে ওঠে। পরে সেই নবজাতক দুই দিন চিকিত্সাধীন থাকার পর ২২ অক্টোবর হাসপাতালে মারা যায়। এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্কালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেন, ২৬ সপ্তাহের অপরিণত বয়সে ভূমিষ্ঠ হয় শিশুটি। ভূমিষ্ঠ হবার পর চিকিত্সক, নার্স নিয়ম অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করেছে। তবে নবজাতকটির ‘সাইন অব লাইফ’ পায়নি। ঘণ্টা খানেক অবজারভেশনেও রাখা হয় নবজাতকটিকে। এরপরই মৃত ঘোষণা করে স্বজনদের কাছে দেওয়া হয়। এরপরও ৪/৫ ঘণ্টা নবজাতকটি তাদের কাছেই ছিল। পরে দাফনের জন্য নিয়ে গেলে সেখানে নড়েচড়ে উঠলে আবারও হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে শিশুটিকে লাইফ সাপোর্টে রাখলেও বাঁচানো যায়নি।

হাসপাতালে এএসপি হত্যা:গত ৯ নভেম্বর আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে চিকিত্সা করতে গিয়ে হাসপাতালটির কর্মচারীদের মারধরে নিহত হন পুলিশের এএসপি আনিসুল করিম শিপন। হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন ও হাসপাতালটির পরিচালক ফাতেমাকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।

স্বাস্থ্যে নতুন পরিচালক: অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের পদত্যাগের পর গত ২৩ জুলাই থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। পরে চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাকে আরো দুই বছরের চুক্তিতে একই পদে নিয়োগ দেয় সরকার। –ইত্তেফাক

সর্বাধিক পঠিত