প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শূন্যস্থান কখনো পূরণ হবার নয়

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী: আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চলাইট শুরু করার মাধ্যমে যে গণহত্যা শুরু করেছিল, তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিদের হত্যা করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের প্রাক্কালে ১৪ ডিসেম্বর ঢাকায় বেছে বেছে শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিক, লেখক, সাহিত্যিকদের ঘর থেকে ধরে ধরে নিয়ে বধ্যভ‚মিতে হত্যা করে ফেলে দেওয়া হয়।

এদিন অসংখ্য বুদ্ধিজীবী শুধু পাক হানাদার বাহিনী নয়, দেশীয় আলবদর, আলসামস বাহিনীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে নির্মমভাবে তাদের হাতে শহীদ হন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিশেষভাবে আক্রমণাত্মক ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল বুদ্ধিজীবীরা বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশ স্বাধীন করার শক্তি হিসেবে কাজ করেছিলেন। একইভাবে যখন তারা বুঝতে পেরেছিল যে, বাংলাদেশে তাদের পরাজয় নিশ্চিত তখন তারা দেশকে মেধাশূন্য করার জন্য বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নীল নকশা বাস্তবায়নে আলবদর, আলসামসদের দায়িত্ব প্রদান করে। এর উদ্দেশ্য হলো স্বাধীন দেশে যেন মেধাবী ও বুদ্ধিজীবী মানুষের সংকট তীব্রতর হয়।

আলবদর, আলসামস বাহিনীর নেতৃবৃন্দ ও সদস্যরা জামায়াত ইসলামের নেতা ও কর্মী ছিল। তারাও বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্তানের শত্রæ মনে করতো। সে কারণে বুদ্ধিজীবীদের ঘর থেকে ধরে ধরে তারাই নিয়ে যায় এবং বধ্যভ‚মিতে বুদ্ধিজীবীদের ক্ষতবিক্ষত দেহ নিক্ষেপ করে তাদের প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের স্বাক্ষর রাখে। বস্তুত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর এমনকি এরপরও নানা ছলছাতুরীর মাধ্যমে ফিরে আসা কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে ঘর থেকে ঢেকে নিয়ে তারাই হত্যা করেছে। এর মধ্যে জহির রায়হানের নাম অন্যতম ছিল যিনি যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের সন্ধান পেতে গিয়ে চিরতরে ঘাতকদের হাতে নিহত হন, হারিয়ে যান। যদিও মুক্তিযুদ্ধে কতজন বুদ্ধিজীবী শহীদ হয়েছেন এর প্রকৃত অর্থ এখনও আমাদের জানা নেই। তারপরও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষকতা, উকালতি, ডাক্তারি, সাংবাদিকতা ইত্যাদি পেশায় কর্মরত অনেকেই পাকিস্তানি হানাদার এবং তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলসামস বাহিনীর হাতে নয় মাস কোথাও না কোথাও প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের হত্যা করার মাধ্যমে ঘাতকরা প্রতিহিংসা, জিঘাংসা এবং যুদ্ধরত দেশ ও জাতিকে মেধাশূন্য করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। সেক্ষেত্রে তারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে নতুন রাষ্ট্রের মেধার স্থান অনেকটাই শূন্য করে রেখে গিয়েছে।

যারা সেই সময় ঘাতকদের হাতে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন তারা প্রত্যেকেই ছিলেন দেশপ্রেমিক, মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক এবং দেশ ও জাতির জন্য নিবেদিত প্রাণ। সেই কারণে তাদের মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারিয়েছে শুধু মেধাবী নয় দেশপ্রেমিকদেরও। স্বাধীনতার এই ৪৯ বছরে আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে নানা উত্থান পতন ঘটে। বিশেষত ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত রাজনৈতিক হত্যাকাÐ এবং পরিবর্তনের পর দেশের সকল ক্ষেত্রে বিভাজন নতুনভাবে শুরু হয়। একদিকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রের রেখে যাওয়া ভাবাদর্শের রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি। সুতরাং দ্বিতীয় ধারার পক্ষেও রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিভিত্তিক চিন্তাধারার প্রসার ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক ধারার বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা আশানুরূপভাবে বিকশিত হতে পারেনি। একটা বড় ধরনের বিভ্রান্তি ও দিকভ্রান্তি বুদ্ধিভিত্তিক চর্চাতেও স্থান করে নিয়েছে। ফলে এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের বুদ্ধিভিত্তিক মহলেও বহুধা বিভক্তি ভর করে উঠেছে। এর ফলে আমাদের নতুন প্রজন্ম এই বিভ্রান্তি ও ইতিহাস বিকৃতির শিকার হচ্ছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন আর অসাম্প্রদায়িক দর্শনে পুরোপুরি নেই। এটিও বহুধা বিভক্ত। এর ফলে বাংলাদেশ রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মেধামননসহ বুদ্ধিভিত্তিক চিন্তার ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের মুল ধারা থেকে অনেকটাই ছিটকে পরেছে।

আগামী বছর বাংলাদেশ রাষ্ট্র পঞ্চাশ বছর পূর্তি উদ্যাপন করতে যাচ্ছে। এ বছর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বছর অতিক্রম করছে। কিন্তু আমাদের বুদ্ধিজীবী মহল বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন কিংবা আগামী বছর আমাদের রাষ্ট্রের পঞ্চাশ বছর পূর্তি দেশ ও জাতির অসাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনায় একমত হয়ে পালন করছে না, আগামী বছরটিও সেভাবে পালিত হবে না। দেশে এখনও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে একটি ক‚টতর্ক উত্থাপিত হয়েছে। অথচ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে জিয়াউর রহমানের বেশকিছু ভাস্কর্য রয়েছে। সেটি নিয়ে কেউ কখনও কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। অথচ বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের একটি মহল নীরবতা পালন করছে। এখানেই স্পষ্ট হচ্ছে আমাদের বুদ্ধিভিত্তিক মহল আধুনিক চিন্তা চেতনাতেও ঐক্যবদ্ধ নয়। এই বিভাজন ১৯৭১ সালে ছিল না। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে সৃষ্ট শূন্যতায় বেড়ে ওঠা রাজনীতি সাম্প্রদায়িকতার যে জায়গা করে দিয়েছে তার ফলে আমাদের অভিন্ন ও ঐক্যবদ্ধ বুদ্ধিজীবী মহল সৃষ্টি হতে পারেনি। এটি পাকিস্তানি ঘাতক এবং তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলসামসরা ১৯৭১ সালে পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করে গেছে। সেই শূন্যস্থান আমাদের আজও পূর্ণ হয়নি।
লেখক : শিক্ষাবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত