প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নাজমুল হক তপন : ‘খালি ম্যারাডোনা নামটাই বাংলা’

নাজমুল হক তপন : পৃথিবী গোল। ফুটবলও গোলাকৃতি। আবার ফুটবল গোলের খেলা। পৃথিবী, ফুটবল আর গোল এই তিনটা বিষয় কখন পরষ্পরের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠে? এই প্রশ্নের এক কথায় উত্তর, মারাদোনা। দিয়েগো মারাদোনা। আমাদের দেখা বিভেদ-বিভক্তির এই বিশ্বে মারাদোনার পায়ে বল, বোধকরি এরচেয়ে বড় সার্বজনীন উৎসব আর হয়নি।

বিশ্বকাপ চলছে। টিভির সামনে উপচে পড়া ভিড়। গ্রামের দাদিতুল্য সেই বয়স্ক নারীর ভাষায়, খেলার সব কথাই ইংরাজিতে। খালি ‘ম্যারাডোনা’ নামটাই বাংলা। কিংবা আর্জেন্টিনার খেলা শুরুর বেশ আগে থেকেই গ্রাম্য সেই চাচার হাঁকডাক, ‘সবাই রেডি হ। আজ ম্যারাডোনার দ্যাশের খেলা।’

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের খেলা দেখেছি গ্রামে। ‘ম্যারাডোনার দ্যাশ’ চিৎকার এখনো কানে বাজে। ‘ম্যারডোনার দ্যাশ’ আসলে কোনটা? প্রত্যন্ত গ্রামের বয়স্কা নারীর কাছেও, মারাদোনা নামটা বাংলা! এটা কিভাবে হয়? বিষয়টা অনেক পরে অনুধাবন করেছি। আসলে ফুটবল মাঠে ম্যারাডোনা নামলেই, মানুষের তৈরি দেশের সীমানা লজ্জায় মুখ ঢাকত।

সম্ভবত সময়টা ২০০৮ সাল। তখনো আর্জেন্টিনার কোচ হননি মারাদোনা। ওই সময় দুই হাজার মিটারের চেয়ে বেশি উচ্চতায় ফুটবল খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করল বিশ্ব ফুটবল অভিভাবক ফিফা। যার অর্থ লাতিন আমেরিকার দুই দেশ বলিভিয়া ও ইকুয়েডরের ফুটবল চিরতরে শেষ হযে যাওয়া। কেননা সমুদ্রপৃষ্ট থেকে কুইটোর উচ্চতা আড়াই হাজার মিটার আর লাপাজের উচ্চতা সাড়ে তিন হাজার মিটারেরও বেশি। এরকম একটা সময়ে লাপাজে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে লাখো জনতার সামনে আবেগঘন ভাষায় মারাদোনা বললেন, “ফুটবল খেলা মানুষের জন্মগত অধিকার। মানুষের এ অধিকার স্বয়ং ঈশ্বরও কেড়ে নিতে পারেন না। আর এ তো সামান্য ফিফা!”

এ ঘোষণা থেকে ফিফা সরে আসে। এরপর আর্জেনটিনার কোচ হিসেবে নিয়োগ পান মারাদোনা। যতদূর মনে পড়ে, ওই বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকা জোনের বাছাইপর্বে লাপাজে বলিভিয়ার কাছে ছয় গোল খেয়েছিল আর্জেন্টিনা। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে এত উঁচুতে খেলতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল লিওনেল মেসিদের। মারাদোনার ফুটবল ভক্তির তুলনায় এসব হার-জিত আসলে কোন গুরুত্বই বহন করে না।

১৯৮৬ এর বিশ্বকাপে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দুটো গোলই মারাদোনার। একটিতে ইংল্যান্ডের পাঁচ পাঁচজনকে কাটিয়ে গোল করেন। আর একটি গোল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত মারাদোনার ভাষায় ‘ঈশ্বরের হাত’ দিয়ে। এই গোল নিয়ে মারাদোনা বলেছিলেন, “ফকল্যান্ড যুদ্ধে আমাদের দেশের মানুষের মনে যে কষ্ট দিয়েছিল সেটাই আমি ফেরত দিতে চেয়েছিলাম।”

‘ঈশ্বরের হাত’ নিয়ে মারাদোনার বিপক্ষে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করে ব্রিটিশ মিডিয়া।

একবার লন্ডনে বিশাল একটা হলরুমে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছেন মারাদোনা। দর্শকের আসনের চারিদিক থেকে মারাদোনাকে লক্ষ্য করে ছুটে আসছে অসংখ্য কটূ বাক্য, দুয়োধ্বনি। এরই মধ্যে একজন দর্শক একটা কাগজের টুকরোকে গোলাকৃতি ছোট বল বানিয়ে ছুঁড়ে দিলেন মারাদোনার দিকে। কাগজের বলটা লাগল মারাদোনার কপালের একটু ওপরে। কি একটা বিশেষ কায়দায় ওই বল প্রথমে ডান, এরপর বা পায়ে নিয়ে সজোরে কিক করলেন মারাদোনা। উড়ন্ত বল গিয়ে লাগল বল যিনি ছুঁড়েছিলেন সেই ভদ্রলোকের মাথায়। প্রথমে দশর্করা হতভম্ব। এরপর করতালিতে ফেঁটে পড়ল হল রুম।

সর্বকালের কে সেরা ফুটবলার, এ বিতর্কেও কোন মীমাংসা হয়ত কখনোই হবে না। ‘লা নোচে ডেল’ ( দশ নম্বরের রাত) নামে একটা টিভি প্রোগ্রাম করতেন মারাদোনা। ওই প্রোগ্রামে অংশ নিতেন বিশ্বের সব নামী-দামী মানুষজন। ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ছাড়াও শো-বিজের খ্যাতিমানরাও আসতেন ওই অনুষ্ঠানে। যা হোক, একবার ওই প্রোগ্রামে এসেছিলেন পেলে। উপস্থিত দর্শকরা ছেঁকে ধরলেন দুজনকেই। সবার দাবি, সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে, এটা আজ আপনারা দুজন ফয়সালা করে দিয়ে যান। প্রথমে পেলে। কূটনীতির কায়দায় পেলে খুব সুন্দরভাবে গুছিয়ে বললেন, “ফুটবল উপভোগের বিষয়। দুজন সৎ মানুষ। কেন প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা আসছে। আর তাছাড়া দু সময়ের দুজন …।” এমন সব কেতাবী-কথাবার্তা আরকি!

ওসব কেতাবী কথার ধার দিয়েও গেলেন না মারাদোনা। বললেন, “এর উত্তর খুব সোজা। পেলের মা মনে করেন, পেলে সর্বকালের সেরা ফুটবলার। আর মারাদোনার মা মনে করেন মারাদোনা সর্বকালের সেরা।”

 

সূত্র- বিডিনিউজ

সর্বাধিক পঠিত