প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কর্মসংস্থানে আলো দেখাচ্ছে ‘হোম ডেলিভারি’

ডেস্ক রিপোর্ট: উপজাতি যুবক বিপুল। নম্র ও বিনয়ী। করোনা পরিস্থিতিতে যখন লাখো মানুষ কর্মহীন হয়ে বেকারের খাতায় নাম লেখাচ্ছিলেন, তখন সহজেই বিপুলের কাজ মিলে যায় একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে। গত সাড়ে পাঁচ মাস ধরে ‘চালডাল ডট কম’- এ হোম ডেলিভারির কাজ করছেন তিনি। সাইকেল চালিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন বিভিন্ন পণ্য। খুশি বেতন-ভাতায়। নির্দিষ্ট বেতনের পাশাপাশি পান হাজিরা বোনাস। দৈনিক ১৭টির বেশি অর্ডার ডেলিভারি করলে পান আলাদা আর্থিক মুনাফা।

শুধু বিপুল নয়, করোনা পরিস্তিতিতে ই-কমার্সের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে হোম ডেলিভারিতে। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান কারও কাছে না থাকলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে হোম ডেলিভারিতে কাজ করছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ, যার একটি বড় অংশ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

আবার অনেকে নিজের পণ্য নিজেই ডেলিভারি করছে। ডাক ও কুরিয়ার সার্ভিসের রুগ্ন দশার মধ্যে ই-কমার্সের প্রসার ফের চাঙ্গা করে তুলেছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবসাকে। ডেলিভারিকেন্দ্রীক আত্মপ্রকাশ ঘটেছে ড্রপবিডি ডট কম, রেডএক্স ডেলিভারি ডট কম- এমন অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের।
ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ই-কমার্সের বাজার ৮ হাজার কোটি টাকার। সংগঠনটির সহ-সভাপতি মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন বলেন, বর্তমানে ই-ক্যাবের সদস্য ১ হাজার ৩৫০-এর মতো। হোম ডেলিভারিতে কাজ করছেন ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ। ই-কমার্সে মোট কর্মসংস্থান হয়েছে দুই লক্ষাধিক মানুষের। হোম ডেলিভারির জন্য কর্মী চাহিদা প্রতিদিনই বাড়ছে। করোনার কারণে অর্থনৈতিক ধাক্কাটা সামলে উঠলে এই খাতে কর্মী চাহিদা বছরের মধ্যেই দ্বিগুণ হবে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, করোনার এই সময়ে বাংলাদেশে অনলাইন কেনাকাটা বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও অনলাইনে পণ্য বিক্রি করছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। এখন তো ১৩ লাখ মুদি দোকানও অনলাইন প্ল্যাটফরমে আসছে। স্বপ্ন, মিনা বাজারের মতো অধিকাংশ সুপারশপ ইতোমধ্যে অনলাইন প্ল্যাটফরমে চলে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের পণ্য ডেলিভারিতে প্রচুর কর্মসংস্থান হচ্ছে। আশা করছি, ২০২৫ সালের মধ্যে শুধু ই-কমার্স থেকেই আরও পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবং প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য সন্তান ও আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ভাইয়ের সার্বক্ষণিক পরামর্শে গত ১১ বছরে গড়ে ওঠা তথ্য-প্রযুক্তি অবকাঠামোর কারণেই আজ ই-কমার্স খাতটির দ্রুত বিকাশ ঘটছে। ১১ বছরের কষ্টসাধ্য যাত্রা আজ সার্থক।

কী যোগ্যতা প্রয়োজন: হোম ডেলিভারিতে জনবল নিয়োগে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে শিক্ষিত শ্রেণি বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের। তবে ইংরেজিতে ঠিকানা পড়তে পারলেই অনেক প্রতিষ্ঠানে মিলছে চাকরি। তবে হোম ডেলিভারির ক্ষেত্রে কর্মীর বিনয়ী আচরণকে অন্যতম যোগ্যতা হিসেবে ধরা হচ্ছে। গ্রাহকের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে রয়েছে ওই কর্মীকে রেটিং দেওয়ার ব্যবস্থা। রেটিং ভালো হলে তরতর করে বাড়ছে বেতন-ভাতা। একই প্রতিষ্ঠানে ভালো রেটিং অর্জন করে কেউ দিনে পাচ্ছেন ৮০০ টাকা ও বিভিন্ন ভাতা, কম রেটিং নিয়ে কেউ পাচ্ছেন ৫০০ টাকা।

সুযোগ-সুবিধা: প্রতিষ্ঠানভেদে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য রয়েছে। তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে দিনে ১৫ থেকে ১৮টি ডেলিভারি দিয়ে দৈনিক ন্যূনতম ৫০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা মিলছে। সেই সঙ্গে মোটরবাইক থাকলে তার জন্য থাকছে পৃথক ভাতা ও জ্বালানি খরচ। ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে সেটা করে দিচ্ছে কিছু প্রতিষ্ঠান। কেউ কর্মীদের জন্য চালু করেছে বিমা। বাইক না থাকলে কিনে দেওয়া হচ্ছে সাইকেল। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করে নেওয়া হচ্ছে কর্মীকে। নির্ধারিত সংখ্যার অতিরিক্ত ডেলিভারি দিলে মিলছে বাড়তি মুনাফা। নির্দিষ্ট বেতন ছাড়াও দৈনিক ১৭টি ডেলিভারির পর প্রতি ডেলিভারির জন্য অতিরিক্ত ১০ টাকা ও ২৫ ডেলিভারির পর প্রতি ডেলিভারির জন্য অতিরিক্ত ১৫ টাকা করে দিচ্ছে একটি বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান।

এ ব্যাপারে দারাজ বাংলাদেশের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান শায়ন্তনি তিশা বলেন, মার্চে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর তাদের প্রতিষ্ঠানে পণ্যের অর্ডার ৩ গুণ বেড়েছে। হোম ডেলিভারির জন্য কর্মী চাহিদা বেড়েছে ৪০ শতাংশ। নতুন কর্মী নিয়োগ দিতে হয়েছে। বর্তমানে দারাজ ডট কমের পণ্য ডেলিভারির জন্য দেড় হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছে। এর মধ্যে ৫৫ ভাগ কর্মী এইচএসসি থেকে অনার্সে পড়ালেখা করছে। স্থায়ী কর্মীর পাশাপাশি অস্থায়ী ভিত্তিতেও অনেক কর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ক্যাম্পাইনের সময় অস্থায়ী কর্মীর প্রয়োজন পড়ছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা জেএসসি। অবশ্যই সৎ, কর্মঠ ও বিনয়ী হতে হবে। এছাড়া সাইকেল বা মোটরবাইক চালনা এবং স্মার্টফোনের ব্যবহার জানতে হবে।

এসিআই লজিস্টিক লিমিটেডের চেইন সুপার শপ ‘স্বপ্ন’-এর ই-কমার্স বিভাগের প্রধান খাজা আসহাদ বেলাল বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে গত মার্চে আমরা ‘ফোনে ফোনে অর্ডার’ সার্ভিস চালু করি। এতে আমাদের অনলাইন অর্ডার চার গুণ বেড়ে যায়। মার্চে আমরা ৬টি স্টোর থেকে ঢাকায় অনলাইন ডেলিভারি করতাম। এখন সেটা ৪০টিতে নিয়ে এসেছি। এপ্রিলে বেশ কিছু ফ্রিল্যান্সার বাইকারকে নিয়োগ দিয়েছি পণ্য ডেলিভারির জন্য। এছাড়া পণ্য ডেলিভারির জন্য ফুডপ্যান্ডা, পাঠাও ও সহজ ডট কমের সঙ্গে পার্টনারশিপ করেছি।

ফুডপ্যান্ডা বাংলাদেশ-এর প্রধান নির্বাহী আম্বারিন রেজা বলেন, আমরা ৪৭টি শহরে নিত্য পণ্যের পাশাপাশি রেস্টুরেন্টের খাবার হোম ডেলিভারি করছি। এজন্য প্রচুর কর্মীর প্রয়োজন হচ্ছে। রাইডারদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রদানের পাশাপাশি বীমার উদ্যোগ নিয়েছি।

‘অথবা ডট কম’- এর বিজনেস ডেভলপমেন্ট বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক শওকত ইলাহী বলেন, আমাদের এখানে এখন ৪০ জন হোম ডেলিভারির কাজ করছে। সবাই স্থায়ী নিয়োগ। বেতনও ভালো। বাইকের জন্য তেল খরচ দিচ্ছি। যার বাইক নেই তাকে সাইকেল কিনে দিচ্ছি। ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দিচ্ছি। বাইক চালানো প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম এসএসসি পাস ও ভালো ব্যবহারকে গুরুত্ব দেই আমরা। সম্প্রতি আরও কিছু রাইডার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। সেখানে অনেক উচ্চ শিক্ষিতরা আবেদন করেছে। শিগগিরই ‘ডেইলি শপিং’ সহ আরও বিভিন্ন সার্ভিস যোগ করব। তখন হোম ডেলিভারিতে আরও কর্মী প্রয়োজন হবে।

বিডি প্রতিদিন

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত