প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার: করোনায় বিপাকে নন-এমপিও শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার: করোনার কারণে চলতি বছরের মার্চ থেকে অদ্যবধি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে l সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সময়মতো বেতন-বোনাস পেলেও নন-এমপিওভুক্ত এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা কোনরকম বেতন পাচ্ছে না l এধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো শতভাগ শিক্ষার্থীদের বেতনের উপর  নির্ভরশীল l কিন্তু যেহেতু স্কুল বন্ধ – তাই নেই কোনো কালেকশন – নেই কোনো বেতন l শুধু তাই নয়, স্কুলের ভবন ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল  খরচ ইত্যাদি সমন্বয় করতে না পেরে অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে l শহরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে  এবং দেওয়ালে প্রায়শই দেখা যাচ্ছে  ফার্নিচারসহ স্কুল বিক্রির বিজ্ঞাপন l পত্রিকায়ও ছাপা হচ্ছে ছোট ছোট বিজ্ঞাপন l ফলে বেকারত্ব হয়ে পড়েছে হাজার হাজার শিক্ষক ও কর্মচারীবৃন্দ l অন্যান্য পেশার লোকজন কাজ বা চাকরি হারিয়ে এখনো যারা কোন রকমে বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন, তারা পুরনো পেশা বদলে নতুন পেশা বা ব্যবসা ধরেছেন। কিন্তু শিক্ষক বলে কথা – মানুষ গড়ার কারিগর, জাতির বিবেক এবং সকলের শ্রদ্ধার পাত্র l যেকোনো পেশা কি বেছে নিতে পারেন? আর এটাই হচ্ছে একজন শিক্ষকের এখন বড় সমস্যা l না পারে কারো কাছে হাত পাততে – না পারে অন্য কোন কাজে যুক্ত হতে l

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নন-এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের  বেতন দেওয়া হচ্ছে না, এমনকি চাকরীচ্যুত করা হয়েছে অনেককে l নামিদামি অনেক স্কুলের শিক্ষকগণ কোনরকম উপায়ন্তর না পেয়ে পেটের দায়ে কৃষিকাজ করছেন, ভ্যান চালাচ্ছেন, ইজিবাইক চালাচ্ছেন, ফল ও সবজি বিক্রি করছেন, ভেটেরিনারি ওষুধ বিক্রি করছেন, রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন। মাদারীপুর জেলার এককালের স্কুল শিক্ষক জনাব আবুল কালাম আজাদ সংসারের ঘানি টানতে ময়মনসিংহ নগরীতে করতেন টিউশনি। আসলো করোনার ঝড়, বন্ধ হলো টিউশনি, বন্ধ হলো আয় রোজগার। পরিবারের প্রয়োজনে ধরলেন রিকশার হাতল, হয়ে গেলেন গৃহশিক্ষক থেকে রিক্সাওয়ালা। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ‘মিরপুর মাহমুদা চৌধুরী কলেজ’-এর সমাজবিজ্ঞানের প্রভাষক আরিফুর রহমান। করোনার কারণে গত মার্চে কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে তার বেতন-ভাতাও বন্ধ। তাই এপ্রিল মাস থেকে স্থানীয় বাজারে গরু-ছাগলের ওষুধ (ভেটেরিনারি মেডিসিন) বিক্রি করছেন। একই জেলার ‘কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ’-এর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক ইমরুল হোসেন। কলেজ থেকে বেতন না পেয়ে পেটের দায়ে এই শিক্ষক কষ্টসাধ্য কৃষিকাজে নেমে পড়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে শিক্ষকদের এইসব দুর্দশার আরো অনেক চিত্র প্রতিনিয়ত ফুটে উঠছে – যা কখনোই সভ্য সমাজের কাম্য নয়।

অবশ্য নিজেই ভবন ও স্কুলের মালিক, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো রকমে টিকে থাকলেও – সেখানেও শিক্ষার্থীদের বেতন আদায় নিয়ে চলছে নানা রকম বিশৃঙ্খলা l বেতন আদায়কে কেন্দ্র করে স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং অভিভাবকদের মধ্যে চলছে নানা রকম কর্মসূচি l প্রায়ই প্রতিবাদ ও সমাবেশ হচ্ছে শহীদ মিনার কিংবা প্রেসক্লাবের সামনে l মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৯৭% শিক্ষা কার্যক্রম বেসরকারি খাতে  পরিচালিত হয় l ব্যক্তিমালিকানাধীন ও নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না l প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত টিউশন ফি আয় থেকে প্রতিষ্ঠান ব্যয় নির্বাহের পর কর্মচারীদের খুবই সামান্য বেতন দেওয়া হয় l এসব শিক্ষক প্রাইভেট পড়িয়ে কিছু আয় করে কোনরকমে জীবিকা নির্বাহ করেন l কিন্তু এখন সেটাও বন্ধ l সামর্থ্যবান কিছু স্কুলে অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা করা হলেও – এখানে সেটাও সম্ভব হচ্ছে না l এসব স্কুলের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী কারো পক্ষেই ল্যাপটপ কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে অনলাইন ক্লাস করার সামর্থ্য রাখেনা l  এধরনের প্রায় ৬৫হাজার কিন্ডার গার্ডেনের ৭ লক্ষাধিক শিক্ষকের বেতন বন্ধ আছে l মাধ্যমিক পর্যায়ে ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট  চার কোটি শিক্ষার্থী, ১৪লাখ শিক্ষক এবং ৮লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন l সবচেয়ে বেশি সংকটে আছেন নারী শিক্ষক-কর্মচারীরা। না খেয়ে থাকলেও কাউকে কিছু বলতে পারছেন না। অবশ্য এবার করোনাকালে সরকার ৮০হাজারের বেশি নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে প্রণোদনা দিলেও এই তালিকার বাইরেই রয়ে গেছে একটি বৃহৎ অংশ। তথ্যমতে, সারা দেশে তিন শতাধিক এমপিওভুক্ত ডিগ্রি কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সে প্রায় ৫হাজার নন-এমপিও শিক্ষক রয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৮ থেকে ১০লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও একই অবস্থা l

তবে স্কুল খোলা রাখলে শিক্ষার্থী আসবে, টিউশন ফি জমা দেবে, এই বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গাজীপুরের কোনাবাড়ির  জরুন ন্যাশনাল স্কুল খোলা রেখে পরীক্ষা নেওয়ার অপরাধে  স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ৭দিনের কারাদণ্ড এবং অপর  এক মহিলা শিক্ষিকাকে ৫হাজার টাকা জরিমানা করা হয় l একই কারণে হরিনাচালা এলাকার অরবিট  এডুকেয়ার  স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ১০হাজার টাকা এবং এসরার নগর এলাকার অক্সফোর্ড মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ৫হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয় l অপরদিকে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলকে ২০হাজার টাকা ও কামরুজ্জামান স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ৫০হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। “শিক্ষক: সংকটে নেতৃত্বদান, ভবিষ্যতের পুনর্নির্মাণ” প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হলো (৫ অক্টোবর) বিশ্ব শিক্ষক দিবস l বাংলাদেশে ঐদিন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার নন-এমপিও ভুক্ত অনার্স অনার্স মাস্টার্স কলেজের শিক্ষক জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এমপিওভুক্তির দাবিতে দিবসটি পালন করতে দেখা গেল l যদিও ২০১৮সালেই এইসব শিক্ষকদেরকে এমপিওভুক্ত করার ব্যাপারে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন l কিন্তু কি কারণে তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি তা কারো জানা নেই l  অথচ মাত্র ১২কোটি এবং বছরে ১৪৪কোটি টাকার যোগান দিলেই তাদের দাবি পূরণ হয়ে যায় l

১৯৭৩সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ৬ হাজার ১৬০টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছিল l দীর্ঘ ৪০বছর পর ২০১৩সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। কিন্তু বাদ পড়ে যায় ৪ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়। করোনার দুর্যোগে চরম বিপদে আছেন এসব বিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে ১৬হাজার শিক্ষক ও কর্মচারী। রোজগারহীন হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন তারা। দেশের স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদেরও একই অবস্থা l ৪৩১২টি মাদ্রাসার ২১হাজার শিক্ষক দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। অবশ্য করোনাকালে লক্ষাধিক নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে বিতরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪৬কোটি ৬৩লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। যেখানে একজন শিক্ষক এককালীন ৫হাজার টাকা এবং কর্মচারী ২.৫হাজার টাকা পেয়েছে l ইবতেদায়ী মাদ্রাসার ৪৩১২শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২১হাজার শিক্ষক আছেন l এরমধ্যে ১৫১৯টি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকগণ ২.৫হাজার টাকা ও সহকারি শিক্ষকদের ২৩০০টাকা সরকারি ভাতা পান l অবশিষ্ট শিক্ষকদের দুরাবস্থার কথা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় l

বিভিন্ন গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে যে শিক্ষকতা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী পেশা l ২০১৯ সালের শিক্ষক মঙ্গলসূচক অনুযায়ী ৭২% শিক্ষক মানসিক কাজ করেন l এর ফলে ৭৮% শিক্ষকের মধ্যে কোনো না কোনো আচরণগত, মানসিক বা শারীরিক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে l অথচ একজন শিক্ষকের সামগ্রিক অবদান এবং প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয় তা কেউ বলতে পারবেনা l  এজন্য জাতি গড়ার সুনিপূণ কারিগর এই শিক্ষকদের মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখা খুবই জরুরী l ১৯৬৬সালে ইউনেস্কো  শিক্ষকের মর্যাদা ও অধিকার বিষয়ক সম্মেলনে সমাজের প্রতি শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনটা বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে। এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে রাষ্ট্র প্রদান করবে শিক্ষকের অধিকার ও মর্যাদা, সমাজ প্রদান করবে শিক্ষকের মর্যাদা আর শিক্ষকের কর্তব্য শিক্ষকরা নিজেরাই পালন করবেন। এমনকি শিক্ষকের চাকরির নিরাপত্তা, বেতন, পদোন্নতি  এবং অন্যান্য সুযোগ সুযোগ-সুবিধা স্বাভাবিক সময়ের মত কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কালেও একই রকম রাখার কথা বলা হয়েছে l

প্রকৃতপক্ষে শিক্ষকদের পেটে খিদে রেখে শ্রেণিকক্ষে ভালো পাঠদান সম্ভব নয়। তাই তাদের সংসারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে এগিয়ে আসা উচিত l নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এমপিও করা উচিত। শিক্ষকদের এ দুর্দশা লাঘব ছাড়া গুণগত শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তাই শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে সর্বাগ্রে এই শিক্ষকদের দুর্দশা লাঘব করতে হবে। পাশাপাশি স্কুল মালিকগণকেও দুর্যোগকালীন সময়ে কিভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া যায় সে ব্যাপারে তহবিল গঠন করার উদ্যোগ নিতে হবে l সরকারের অনুমতি ছাড়া যত্রতত্র স্কুল খুলে সরকারকে বেকায়দায় ফেলানো যাবে না l আমরা সকলেই কোন না কোন শিক্ষকের ছাত্র l  কিন্তু সেই শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সমাজ পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে আছে – মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর l তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত জাতি গঠনের এই কারিগরদেরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি l আমরা সকল শিক্ষকদের শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাই এবং ইউনেস্কো ঘোষিত শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা, সম্মানসহ নিরাপদ জীবনের বাস্তবায়ন চাই l

লেখক: তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক ও পরিচালক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বাধিক পঠিত