প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গেঁটে বাতের লক্ষণ ও চিকিৎসা

ফারজানা শবনমঃ গেঁটে বাত (Gout) আর্থ্রাইটিসের একটি জটিল অবস্থা। একে ইউরিক এসিড আর্থ্রোপ্যাথি ও বলা হয়েথাকে। রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে গেলে এই গেঁটে বাত দেখা যায়। সাধারণত মহিলাদের তুলনায় পুরুষেরা ৫ গুণ বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকেন এ রোগে। আর এ অবস্হার জন্য দায়ী একটি কারণ, তা হল মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের ইউরিক এসিডের মাএা বেশি থাকে। এই রোগটি পুরুষ ও বয়স্ক মহিলাদের হ্মেএেই বেশি লহ্মণীয়। পুরুষদের ৩০ বছর বয়সের পর এবং মহিলাদের হ্মেএে মেনোপজ / রজোবন্ধ হওয়ার পর এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

রক্তে ইউরিক এসিডের স্বাভাবিক মাএাঃ
 পুরুষ ➡ (৩.৪ – ৭.০ mg/dL)
 মহিলা ➡ (২.৪ – ৬.০ mg/dL)

রক্তে এই ইউরিক এসিডের মাএা স্বাভাবিক মাএার চেয়ে বেশি হলে তাকে হাইপারইউরিসেমিয়া ( Hyperuricemia) বলে।

গেঁটে বাতের লহ্মণগুলো প্রথম দিকে তেমন একটা বোঝা যায় না। বলা যায় হঠাৎ করেই এ রোগের লহ্মণগুলো প্রকাশ পেয়ে থাকে এবং প্রায়শই রাতে রোগী ব্যথা অনুভব করেন। রোগীর তীব্র জয়েন্ট পেইন হয়ে থাকে। সাধারণত পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে প্রচন্ড ব্যাথা হয়। এছাড়াও গোড়ালি, হাঁটু, কনুই, কব্জি এবং আঙ্গুলের জয়েন্টে তীব্র ব্যথা হয় এবং ফুলে যায়।

প্রথমেই বলেছি ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে গেলে এই গেঁটে বাত হয়ে থাকে। মানবদেহের কোষে থাকা পিউরিন ভাঙনের ফলে এই ইউরিক এসিড তৈরি হয়। এই পিউরিন আমাদের দেহের প্রতিটি কোষেই পাওয়া যায়। কারণ, শরীরে পিউরিন তৈরি হয়ে থাকে। এছাড়াও বেশ কিছু খাদ্যে পিউরিনের উপস্থিতি রয়েছে। যেমনঃ অর্গান মিট, রেডমিট, সামুদ্রিক মাছ, শক্ত খোসাযুক্ত প্রাণী, ডাল জাতীয় খাদ্য, বাদাম, অ্যালকোহল এবং ফ্রুক্টোজ সমৃদ্ধ পানীয়।

ইউরিক এসিড প্রথমে রক্তে যায় এবং সেখান থেকে কিডনির মাধ্যমে মূএের সঙ্গে দেহ থেকে বের হয়ে যায়। যদি এ প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে তবেই ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে যায়। রক্তে এ ইউরিক এসিডের পরিমাণ বেড়ে গেলে অস্থিসন্ধিতে মনোসোডিয়াম ইউরেট মনোহাইড্রেট ক্রিস্টাল জমা হয় ফলে গেঁটে বাত দেখা যায়। গেঁটে বাত বা, Gout একবার শরীরে বাসা বাঁধলে তা থেকে একেবারের জন্য আরোগ্য লাভ বেশ কষ্টসাধ্য একটি বিষয়। তবে সর্তকতা, নিয়মমাফিক জীবনযাপন এবং সঠিক খাদ্যভাসের দ্বারা একে দমিয়ে রাখা সম্ভব। মানব শরীরের মোট ইউরিক এসিডের এক তৃতীয়াংশ ই আসে খাদ্য থেকে। তাই বেশ কিছু খাদ্য গেঁটে বাতের রোগীদের পরিহার করতে হবে।

পরিহারকৃত খাদ্যঃ
 অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস : ( গরু, খাসি, ভেড়া, মহিষ ইত্যাদি) ;
 অর্গান মিট( অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জাতীয় মাংস : লিভার, কলিজা, মগজ, জিহ্বা, গুর্দা ইত্যাদি) ;
 সামুদ্রিক মাছ : (টুনা, সারডিনস, কড, হেরিং, স্কাল্পস ইত্যাদি) ;
 শক্ত খোসাযুক্ত প্রাণী : (চিংড়ি, শামুক, কাকড়া ইত্যাদি) ;
 ডাল : (মসুর ডাল, মাষকলাই ডাল, মটর ডাল ইত্যাদি ) ;
 ডিমের কুসুম;
 বাদাম : ( চিনাবাদাম, কাঠবাদাম) ;
 বীচি জাতীয় খাদ্য : (সিমের বীচি, কাঁঠালের বীচি) ;
 শাক : ( পুঁইশাক, পালংশাক, মুলাশাক, পাটশাক ইত্যাদি) ;
 সবজি : ( ঢেঁড়স, মিষ্টিকুমড়া, ওলকপি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বিট, সজনে, সিম, বরবটি, বেগুন, টমেটো,
গাজর, কচু, মিষ্টিআলু ইত্যাদি);
 অতিরিক্ত তেল ও মশলাযুক্ত খাবার;
 অ্যালকোহল, ক্যাফেইন জাতীয় পানীয়, চা, কফি , কোমল পানীয়;
 এছাড়াও মাশরুম, হাঁসের ডিম, মাছের ডিম, পনীর, আচার, ইস্ট ও ইস্টের তৈরি খাদ্য ইত্যাদি।
গ্রহণযোগ্য খাদ্যঃ
 প্রোটিনঃ গেঁটে বাতের রোগীদের সাধারণত প্রোটিন জাতীয় খাদ্য বর্জন করার জন্য পরামর্শ দেয়া
হয়ে থাকে। তাই দেহের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে মিঠা পানির মাছ, চামড়া ছাড়া
মুরগীর মাংস , ডিমের সাদা অংশ, দুধ, টক দই ইত্যাদি খাদ্য গ্রহণ করা যেতে পারে।
 বেশি আঁশযুক্ত খাদ্যঃ {(শাকঃ লালশাক, ডাটাশাক, সবুজশাক, লাউশাক, সরিষাশাক ইত্যাদি) ( সবজিঃ
পটল, পেঁপে, ধুন্দল, চিচিঙ্গা, করল্লা ইত্যাদি) (লাল চালের ভাত ও রুটি) ( আঁশযুক্ত ফলমূলঃ সবুজ
আপেল, নাশপাতি, পাঁকা পেঁপে ইত্যাদি )} ;
 এন্টিঅক্সিডেন্ট জাতীয় খাদ্যঃ ভিটামিন সি জাতীয় ফল ( বীচি ছাড়া পেয়ারা, আমলকী, মাল্টা, কমলা,
আমড়া, লেবু, জাম্বুরা ইত্যাদি), এছাড়া ও লেবু চা ও গ্রীন টি;
 শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। প্রতিদিন কমপক্ষে (২ -৩) লিটার পানি
পানের অভ্যাস করতে হবে।

স্হূলতা, বিভিন্ন শারীরিক অসুস্হতা ( উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, মেটাবলিক সিন্ড্রোম এবং হার্ট ও কিডনি ডিজিজ ইত্যাদি) কারণে ও গেঁটে বাত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই গেঁটে বাত হলে উপরোক্ত খাদ্য নির্দেশনাগুলো মেনে চলার চেষ্টা করবেন। গেঁটে বাতের প্রধান সমস্যা যেহেতু ইউরিক এসিডের মাএা বেড়ে যাওয়া। তাই, ইউরিক এসিড নিয়ন্ত্রণে ঔষধের চেয়ে বেশি কার্যকর হচ্ছে সঠিক খাদ্যাভাস ও ডায়েট। সঠিক খাদ্যাভাস ও ডায়েটের মাধ্যমে খুব সহজেই আপনি এ সমস্যা থেকে পরিএাণ পেতে পারেন। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবনের পাশাপাশি একজন পুষ্টি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ ও আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ফারজানা শবনম আন্নী
নিউট্রিশনিস্ট অ্যান্ড ডায়েট কনসালটেন্ট
লেজার মেডিকেল সেন্টার লিঃ, গুলশান ব্রাঞ্চ।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত