প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রভাষ আমিন: দেশে বিরোধী দল নেই

প্রভাষ আমিন:  বাংলাদেশে এখন বিরোধী দল নেই বললেই চলে৷ কাগজে-কলমে সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি আসলে সরকারেরই অংশ৷ প্রকৃত বিরোধী দল বিএনপি অথর্ব, নিষ্ক্রিয়৷ তারা কোথাও নেই৷ দেশে এখন গণতান্ত্রিক স্পেস সঙ্কুচিত৷ মতপ্রকাশের প্রাতিষ্ঠানিক জায়গাগুলো ধ্বংসপ্রায়৷ এ অবস্থায় মানুষের মত প্রকাশের, ক্ষোভ প্রকাশের একমাত্র খোলা জানালা ফেসবুক৷ ২০১৩ সালে শাহবাগের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে যে ক্ষোভের আগুন জ্বলেছিল, তার স্পার্কটাও ছিল ফেসবুকেই৷ দুই বছর আগে নিরাপদ সড়কের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও ফেসবুক থেকেই শুরু৷ এবার ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনও ফেসবুক থেকেই শুরু৷ শুধু বড় আন্দোলন নয়, ছোট-বড় অনেক ঘটনাকেই বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব ফেসবুকের৷ একটু মনে করে দেখুন, সিলেটে রাজন নামের এক কিশোরকে চুরির অপরাধে বেঁধে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল৷ সাধারণভাবে এই ঘটনা জাতীয় দৈনিকের মফস্বল পাতার এক কলামের নিউজ৷ কিন্তু পেটানোর ভিডিও থাকায় রাজনের মৃত্যু সারাদেশের মানুষকে কাঁদিয়েছিল৷ মূল আসামী সৌদি আরব পালিয়ে গিয়েও রেহাই পায়নি৷ প্রবাসী বাংলাদেশীরা তাকে ধরে দেশে ফেরত পাঠিয়েছিল৷ এরচেয়ে কত ভয়ঙ্কর ও দুর্ধর্ষ আসামি দেশের ভেতরেই দাপটে ঘুরে বেরায়, পুলিশ ফিরেও তাকায় না৷ যেমন বেগমগঞ্জের গৃহবধূকে বিবস্ত্র করার ঘটনায় জড়িত দেলোয়ারের বিরুদ্ধে খুনের মামলা ছিল৷ খুনের মামলার আসামি হয়েও এলাকায় ঘুরে বেরিয়েছে রাজার হালে, নারীদের বস্ত্রহরণ করেছে৷ আর এখন সেই মামলার আসামী না হয়েও সারাদেশের মানুষের ঘৃণার তালিকায় এক নাম্বারে উঠে এসেছে দেলোয়ার৷ এখানেই সা্মাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শক্তি৷ সিলেটের রাজন না হয় মারা গিয়েছিল, সিলেটের এমসি কলেজের খাদিজা তো গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন৷ ছাত্রলীগ নেতা বদরুল তাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করেছিল৷ আবার অনুরোধ করছি, আবেগ সরিয়ে একবার ভাবুন, ‘প্রেমিকের কোপে কলেজছাত্রী গুরুতর আহত’ এই শিরোনাম আপনাকে কতটা স্পর্শ করতো? কিন্তু যখন আপনি সেই কোপানোর ভিডিও দেখেছেন, তখন আপনি আতঙ্কে-ঘৃণায় কেঁপে উঠেছেন৷ গত দুই দশকে দেশে কয়েক হাজার মানুষকে ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে৷ অথচ বছর দশেক আগে ঝালকাঠিতে লিমন নামে এক কিশোরের পায়ে গুলি করে বিপাকে পড়েছিল র‌্যাব৷ টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুলের কন্যার এক প্রশ্ন, ‘‘আব্বু, তুমি কান্না করতেছো যে?’’ চোখের জলে ভাসিয়েছে গোটা দেশকে৷ পুরান ঢাকার বিশ্বজিৎ, ফেনীর নুসরাত, বুয়েটের আবরার- ফেসবুকের কারণে বিচার পেয়েছে এমন ঘটনার তালিকা অনেক লম্বা৷

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, প্রতিবাদ, গড়ে ওঠা জনমত দারুণ ইতিবাচক৷ তবে আইনের শাসন আছে, সুশাসন আছে এমন রাষ্ট্রে এমনটা কাম্য নয়৷ অবশ্যই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ হবে, জনমত গড়বে; কিন্তু আইন তো চলবে তার নিজস্ব গতিতে৷ ফেসবুকে ভাইরাল হলে সুপারসনিক গতি, নইলে কচ্ছপের; এটা তো কোনো কাজের কথা নয়৷ বাংলাদেশে প্রতিদিন ধর্ষণ হয়, খুন হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যায়- অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা কয়টার প্রতিবাদ করবে৷ আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গড়ে ওঠা ধারণা দিয়ে তো বিচারক বিচার করবেন না৷ আইডিয়ালি বিচারকদের চোখ বাঁধা থাকার কথা৷ তারা শুধু সাক্ষ্য-প্রমাণ দেখবেন৷ কিন্তু বিচারকরাও তো এই সমাজেরই মানুষ৷ তাদেরও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে৷ তারাও পত্রিকা পড়েন৷ তাই রাস্তায় গড়ে ওঠা ধারণার প্রভাব পরে বিচারেও৷ সরকারের দায়িত্ব আইনের শাসন নিশ্চিত করা৷ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা-দুটো ঘটনা আলোড়ন তুলবে, ভাইরাল হবে, আন্দোলন হবে৷ আর সরকার সব ঘটনার ন্যায্য ন্যায়বিচার করবে৷

সরকার নারীদের জন্য, সব মানুষের জন্য নিরাপদ দেশ গড়বে; ধর্ষক, খুনী, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারীরা থাকবে আইনের আওতায়৷ সরকার যখন তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তখনই মানুষ সোচ্চার হয় প্রতিবাদে, রাস্তায় নামে৷ যতদিন সরকার সব ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করবে, অপরাধীদের না ধরবে; যতদিন বিচারের বাণী নীরবে কাঁদবে, যতদিন অপরাধীরা সরকারি দলের প্রশ্রয় পাবে; আপাতত ততদিন ফেসবুকই ভরসা৷ বাংলাদেশে ট্রাক, বাস, সিএনজি বা রিকশার মতো গণপরিবহণের পেছনে নানা চিত্তাকর্ষক বাণী লেখা থাকে৷ সবচেয়ে বেশি লেখা থাকে, মায়ের দোয়া বা আশীর্বাদ কামনা৷ তবে আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লেগেছে, ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আদালত মানুষের বিবেক৷’ কয়েকদিন পর যদি লেখা হয়, ‌‘বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ আদালত ফেসবুক’, আমি একদমই অবাক হবো না৷ ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত