প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাবলু ভট্টাচার্য্য: জন্মদিনে স্মরণ, কে কে মহাজন

বাবলু ভট্টাচার্য্য: বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিনেমার মূল পরিকল্পনা থাকে পরিচালকের হাতে। সেগুলোকে পর্দায় তুলে ধরার এবং বাস্তবিক করার কাজটি করেন অভিনয়শিল্পীরা। ফলে কোনো সিনেমার যশ কিংবা খ্যাতি মানে এর নির্মাতা বা অভিনেতার ভূয়সী প্রশংসা।

কিন্তু সিনেমার মূল যে কাজ, অর্থাৎ ফ্রেমে একেকটা মুহূর্তকে বন্দী করা, চার দেয়ালের ভেতরে মূল গল্পটাকে নিয়ে আসা, দর্শকদের সিনেমার অন্তর্নিহিত অর্থকে জানানো, তা-ও আবার এত ছোট ফ্রেমে- এই জটিল ও সৃজনশীল কাজটি করে থাকেন একজন সিনেমাটোগ্রাফার।

১৯৬৬ সালের আগস্ট মাসের ৫ তারিখ। সিনেমাটোগ্রাফিতে গোল্ড মেডেল পেয়ে ভারতের ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে গ্র‍্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন কেওয়াল কৃষণ মহাজন। বন্ধুদের কাছে তিনি কে কে নামেই অধিক পরিচিত।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন তখনকার উঠতি নির্মাতা মৃণাল সেন, যিনি পরবর্তীতে বাংলা সিনেমার একজন ত্রাতা ও প্রবাদপুরুষ হিসেবে আখ্যায়িত হন, এমনকি বলিউডের সিনেমাতেও যুক্ত করেন নতুন ধারা। তিনি মহাজনের কাজ দেখেছিলেন। মহাজনের কাজ তাকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছিল। মৃণাল সেন তাকে বলেছিলেন, একদিন তারা হয়তো একত্রে কাজ করবেন।

একদিন তারা একত্রে কাজ করলেন। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দেয়া এক সিনেমায় আমরা দেখলাম নির্মাতা-সিনেমাটোগ্রাফারের চমৎকার যুগলবন্দী।

১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া মৃণাল সেনের সিনেমা ‘ভুবন সোম’ ভারতীয় সিনেমায় যুক্ত করে নতুন মাত্রা। যে সিনেমা বানানোর জন্য কলাকুশলীদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেয়ার মতো পয়সা পাচ্ছিলেন না নির্মাতা। উঠতি এক নির্মাতার এ প্রয়াসকে বড় মনে হলো মহাজনের কাছে। কিন্তু তার ভাগ্যেও তো ছিলো কানাকড়ি। কে কে মহাজন এগুলো আমলেই নিলেন না।

মহাজন তার ক্যামেরা হাতে নেয়ার প্রথমদিক থেকেই ‘হ্যান্ডহেল্ড’ শট নিতেন নিখুঁতভাবে। ‘ভুবন সোম’ সিনেমায় তিনি তার এ ধারা অব্যাহত রাখেন। মোড় ঘুরিয়ে দেয়া এই সিনেমায় তার আরেকটি প্রতিভা নতুন যুক্ত হয়। তিনি প্রাকৃতিক আলোকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, তা দেখিয়েছেন। সূর্যের আলোর কোন বাহারটি ফ্রেমকে বাস্তব করে তুলবে, তা ছিলো তার নখদর্পণে।

আরও একটি অনন্য কাজ হচ্ছে পর্দায় একাকিত্ব ফুটিয়ে তোলা। বিশেষ করে ভিন্ন ধারার সিনেমার ক্ষেত্রে যেটি খুবই জরুরি। মূলধারার সিনেমার বাইরে সূক্ষ্ম ও গভীর ভাবাদর্শের পরিচায়ক সিনেমাগুলোতে ফ্রেমকে এমনভাবে বানাতে হয়, যাতে দর্শকের মনোযোগ কমে না যায়। প্রতিটি দৃশ্যে থাকতে হয় নতুনত্ব। একঘেয়েমি যেন না হয়ে ওঠে, সেদিকে রাখতে হয় সজাগ দৃষ্টি।

সমাজের বাস্তব গল্প বলতে গিয়ে, কলকাতার মানুষের রোজকার চিত্র ফুটিয়ে তুলতে মৃণাল সেন নির্মাণ করেন ‘কলকাতা ট্রিলজি’। ইন্টারভিউ (১৯৭০), কলকাতা ৭১ (১৯৭২), পদাতিক (১৯৭৩); ছবি তিনটি ‘কলকাতা ট্রিলজি’ নামে পরিচিত। প্রত্যেকটি সিনেমায় ক্যামেরার পেছনে ছিলেন কে কে মহাজন।

মানুষের নিত্যদিনের গল্প নিয়ে একসাথে মৃণাল-মহাজন যুগলবন্দী আমাদের উপহার দেন ‘কোরাস’ (১৯৭৪), ‘মৃগয়া’ (১৯৭৬), ‘একদিন প্রতিদিন’ (১৯৭৯), ‘আকালের সন্ধানে’ (১৯৮০), ‘খারিজ’ (১৯৮২), ‘খন্দর’ (১৯৮৩) ও ‘একদিন আচানক’ (১৯৮৮)।

চারবার জাতীয় পুরস্কার জিতেছেন মহাজন। বসু চ্যাটার্জির ‘সারা আকাশ’ (১৯৬৯), মণি কৌলের ‘উসকি রুটি’ (১৯৭০), ভঁকুমার শাহানির ‘মায়া দর্পণ’ (১৯৭২) এবং মৃণাল সেনের ‘কোরাস’ (১৯৭৪) সিনেমার জন্য তিনি এ পুরস্কার পান।

কে কে মহাজন বাণিজ্যিক সিনেমাতেও ছিলেন সমান পারদর্শী। বিকল্প ধারার সিনেমার বাইরেও মূলধারার হিন্দি সিনেমায় তিনি কাজ করেছেন।

কাজ করেছেন নির্মাতা রমেশ সিপ্পীর সাথে ‘ভ্রষ্টাচার’, ‘আকল্য’ সিনেমায়। কাজ করেছেন সুভাষ ঘাইয়ের সাথে ‘কালিচরণ’, মোহন কুমারের সাথে ‘অবতার’, বসু চ্যাটার্জির সাথে ‘পিয়া কা ঘর’, ‘রজনীগন্ধা’, ‘ছোটি সি বাত’ ইত্যাদি সিনেমায়।

প্রায় ৮০টি ফিচার ফিল্ম, ১০০টি বিজ্ঞাপন, ২০টি ডকুমেন্টারি ও অনেক টিভি সিরিয়ালে সিনেমাটোগ্রাফারের কাজ করেন কে কে মহাজন। ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া (এফটিআইআই) থেকে গোল্ড মেডেল পাওয়া এ কারিগর তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন সবধরনের ক্যামেরার কাজেই।

পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে গ্রাজুয়েট মহাজন বেছে নেন ক্যামেরাকে। যখন ভারতীয় সিনেমায় একজন সত্যিকার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সিনেমাটোগ্রাফারের খুব দরকার ছিল।

বিখ্যাত নির্মাতা শ্যাম বেনেগালের সাথেও তার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার পুরস্কারজয়ী কয়েকটি ডকুমেন্টারি হলো শ্যাম বেনেগালের ‘চাইল্ড অব দ্য স্ট্রিট’ (১৯৬৭), কুমার শাহানির ‘আ সার্টেইন চাইল্ডহুড’ (১৯৬৭)।

সিনেমায় কাজ করার পাশাপাশি তিনি ক্যামেরার কাজের উপর ট্রেনিংও দিতেন। ওয়ার্কশপ করেছেন অনেক। ক্যামেরায় নতুন কারিগরদের হাত দেয়ার পেছনে তার অবদান ছিল অন্যতম। ভারতে যারা পরবর্তীতে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে নতুন ধারা যুক্ত করেছেন, তাদের অনেকেই তার অনুসারী।

২০০০ সালের নভেম্বরে মুম্বাই অ্যাকাডেমি অব দ্য মুভিং ইমেজ কে কে মহাজনকে প্রথম ‘কোডাক টেকনিক্যাল এক্সিলেন্স’ পুরস্কারে ভূষিত করে। যেখানেই পুরস্কৃত হয়েছেন, সেখানেই হাইলাইট করা হয়েছে তার রং নির্বাচনের কাজের দক্ষতাকে। পর্দায় আসল রং বেছে নেয়ার অসামান্য দক্ষতা তাকে আজও একজন ‘সিনেমাটোগ্রাফারের ভ্যানগার্ড’ হিসেবে সবার সামনে উপস্থাপন করে।

কে কে মহাজন ১৯৪৪ সালের ২ অক্টোবর গুরুদাসপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত