প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. অনুপম সেন: শেখ হাসিনা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে গণতন্ত্র একটি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়াবে

ড. অনুপম সেন: বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১৯৮৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১৯ বা তারও বেশিবার হত্যাচেষ্টা হয়েছিলো। তিনি বারবার খুনিদের টার্গেট হয়েছেন। কেন এমনটা হচ্ছে? কারণ শেখ হাসিনা হচ্ছেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক। গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক বলেই শেখ হাসিনা বারবার খুনিদের টার্গেট হচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু তো বাংলাদেশেরই প্রতীক। তার পর কন্যা শেখ হাসিনাও প্রতীক হয়ে উঠেছেন নানাভাবে। জনগণ তাকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি, গণতন্ত্রের পক্ষ শক্তি হিসেবে নিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই আমাদের নিয়ে বিভিন্ন বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখছি পাকিস্তানিদের কাছ থেকে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের কাছ থেকে, সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে। সাম্রাজ্যবাদীদেরও বিভিন্ন রকম রূপ থাকে। তারা সেই প্রতিক্রিয়া লালন-পালন করে থাকে। হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলার মধ্য দিয়েই সাম্রাজ্যবাদীদের ভিন্নরূপেরই প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।

ভারতে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার পেছনে জওহরলাল নেহরুর অবদান অনেক। নেহরু ভারতের গণতন্ত্রকে নানাভাবে রক্ষা করেছেন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লালন করেছেন। শেখ হাসিনাও তাই করছেন। আমাদের বিচার ব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন। শেখ হাসিনা একুশ আগস্টের বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলা মামলাটিকে স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুহত্যা মামলাকেও স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ে গেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনকেও এখন স্বাধীন ও শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে। সংসদের স্থায়ী কমিটি, সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন শেখ হাসিনাই। এভাবেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি ভিত্তি তৈরি করছেন। তিনি আরও অন্তত দুই টার্ম বা দশ বছরের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকতে পারলে গণতন্ত্র একটি দৃঢ়ভিত্তির উপর দাঁড়াবে। পনেরো আগস্টের ঘটনাকে আমরা ধরে নিয়েছিলাম কিছু অপশক্তি, অশুভশক্তির কাজ। তারাই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। কিন্তু ২০০৪ সালের একুশে আগস্টে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টাকে মনে হলো, রাষ্ট্রশক্তিই এই হত্যাচেষ্টা করেছে। বিরোধীদলকে ধ্বংস করার জন্যই রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করলো। একুশে আগস্টের ঘটনাকে যেভাবে রাষ্ট্রশক্তি বিপথে পরিচালনার চেষ্টা করেছিলো, জজ মিয়া নাটক সাজানো হয়েছিলো, তার ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বড় পরিবর্তন এলো। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গোপনে ব্যবহার ও প্রয়োগ করে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে ধ্বংস করে দেয়ার প্রচেষ্টা লক্ষণীয় ছিলো।

১৯৭১ সালের রক্তাক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ, লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেলাম। একটা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলো। গণতন্ত্র পেলাম আমরা। প্রকৃত অর্থে পাকিস্তানে কখনো গণতন্ত্র ছিলো না। সবসময়ই সংবিধানে ত্রুটি ছিলো। আওয়ামী লীগ যেহেতু একটা বড় প্ল্যাটফরম, সেখানে জামায়াত, প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধগোষ্ঠী অনেক সময় সতর্কতা সত্ত্বেও তার মধ্যে ঢুকে পড়ে। বাংলাদেশে যা হয়, যারাই সরকারে আসে, সেই দলে ঢোকার চেষ্টা করে অপশক্তিগুলো। অনেক সময় তারা ঢুকেও যায়। আমাদের কিছু রাজনৈতিক নেতাও ক্ষুদ্র স্বার্থে এসব প্রশ্রয় দেন। প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে এরা ধীরে ধীরে দলে কোনো না কোনোভাবে ঢুকে বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়, দলকে বিব্রত করার চেষ্টা করে। বঙ্গবন্ধুর সময়ও এ রকম কিছুটা হয়েছিলো। খন্দকার মোশতাক আহমেদ তার বড় উদাহরণ। তাদের সম্পর্কে আওয়ামী লীগকে সবসময় সজাগ, সতর্ক থাকতে হবে। আওয়ামী লীগের যারা পক্ষশক্তি তাদের সবসময়ই আওয়ামী লীগকে কীটমুক্ত, পরিষ্কার রাখতে হবে। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোকেও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, পরিশুদ্ধ করতে হবে। শেখ হাসিনা সাধারণ মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সবাইকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে দেশের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি, আগুন সন্ত্রাস মোকাবেলা করে আজ দেশকে শেখ হাসিনার সরকার কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে বিস্মিত গোটা দুনিয়া। আমরা পদ্মাসেতুর মতো বড় অবকাঠামো নিজের অর্থায়নে করছি। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন বাস্তবায়ন, ঢাকাসহ সারাদেশের যেখানে যেখানে ফ্লাইওভার দরকার তা হচ্ছে। উন্নয়ন, অগ্রগতি বাংলাদেশের বেগবান হচ্ছে অবিশ^াস্যভাবে। এটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই। যদিও মাঝখানে করোনার কারণে উন্নয়ন কার্যক্রম কিছুটা কম গতিতে চলছিলো, এখনো আবারও দ্রুত গতি কাজ চলছে।

আমরা পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ আমল মিলিয়ে প্রায় ৪৫ বছর যে খাদ্য ঘাটতি দেখছিলো এদেশের মানুষ, এখন আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যদিও এই সময়ে জমির পরিমাণ কমেছে, কিন্তু খাদ্য উৎপাদন চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ৬০ শতাংশ লোক আমাদের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছিলো, এখন সেটা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২২ শতাংশে। এটা হয়তো এখন ২০ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। এটা সম্ভব হয়েছে শুধু আওয়ামী লীগের সরকারের সময়োচিত সঠিক সিদ্ধান্তের ফলেই। চারদলীয় জোট কিছুই করেনি এদেশের উন্নয়নের জন্য। কারণ তাদের সময়ে কৃষিতে কোনো অগ্রাধিকার ছিলো না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে সাধারণ মানুষের সুবিধা হয় এমন নীতি গ্রহণ করে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া একদম পছন্দ করে না। ভর্তুকির ঘোর বিরোধী তারা। তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ তথা চৌদ্দদলীয় সরকার কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে গেছে। তার ফলে দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ম্ভর। এ কারণেই ভ্রƒকুটি করতে পারে না বিদেশি কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো এখন নেই বললেই চলে।

আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মতো দেশ পরিচালনা করছে। আমরা এখন নিজের পায়ে হাঁটতে শিখেছে। বাংলাদেশ এখন পরনির্ভরশীল নয়, স্বনির্ভর। দেশকে পরনির্ভরশীলতার হাত থেকে বের করে আনা, দেশকে স্বয়ম্ভর করাই হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। বাংলাদেশ এখন পরনির্ভরশীল নয়। আমরা আর এখন পরাধীন নই, প্রকৃত অর্থেই আমরা এখন স্বাধীন। একাত্তরে আমাদের বিরুদ্ধে যে অন্যায়-অবিচার করা হয়েছিলো তা থেকে আমরা বের হয়ে আসছি। পাকিস্তানি বাহিনীর এদেশীয় দোসর রাজাকার আলবদর-আলশামসদের বিচার হচ্ছে। বিচার পাচ্ছে স্বজনহারা মানুষ। এটা বিরাট বিষয়। রাজাকারদের এদেশে বিচার হবে কখনো কি কেউ ভেবেছিলো? ভাবেনি। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়েছে এদেশে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার ছিলো বলেই।

সরকারের তিনটি অঙ্গ সংস্থাÑ সংসদ, নির্বাহী বিভাগ এবং আইন বিভাগ। এই তিনটি বিভাগ যেভাবে চলা উচিত সেভাবেই চলছে। আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছি, সংসদের কার্যকারিতাও নিশ্চিত করেছি। আগে সংসদ চলতো রাবার স্ট্যাম্পের মতো, এখন সংসদ সংসদের মতোই চলে। সংসদীয় নির্বাহী কমিটিগুলোও কাজ করে স্বাধীনভাবে। আগে কমিটিগুলো ঠিকমতো কাজ করতো না, এখন সব ঠিকঠাক মতো করে চলে। এটা এই সরকারেরই অর্জন। এই সরকারই নির্বাহী কমিটিগুলো গঠন করেছিলো, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকতা পেতে ব্যাপক সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

পরিচিতি : শিক্ষাবিদ ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। অনুলিখন: মিনহাজুল আবেদীন

সর্বাধিক পঠিত