প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] বন্ধ ৯০ শতাংশ ট্রাভেল এজেন্সি, সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব

রিয়াজ সবুজ : [২] করোনাভাইরাসের থাবায় টানা তিন মাস বন্ধ থাকার পর সীমিত পরিসরে কয়েকটি এয়ারলাইন্সের আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চলাচল শুরু হলেও এখনও বন্ধ দেশের ৯০ শতাংশের বেশি ট্রাভেল এজেন্সি। আবার আগের তুলনায় ৫ শতাংশও টিকিট বিক্রি করতে পারছে না এজেন্সি গুলো।

[৩] কারণ এয়ারলাইন্সগুলো সরাসরি নিজেরাই টিকিট বিক্রি করছে। আবার এখন যেসব রেমিট্যান্স যোদ্ধা বিদেশে যাচ্ছেন তাদের অধিকাংশের আগেই রির্টান টিকিট কেনা ছিল। নতুন করে টিকিট কিনছে খুব অল্প মানুষ। ফলে, এই খাতে চলছে ভয়ানক অর্থনৈতিক দুর্যোগ। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলছে।

[৪] ট্রাভেল এজেন্সির সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টেস অব বাংলাদেশের (আটাব) এর প্রেসিডেন্ট মো. মুনসুর আহমেদ খান বলেন, ‘ফ্লাইট চালু হলেও টিকিট বিক্রিতে যেতে পারছি না। কারণ বাংলাদেশ বিমান ও কাতার এয়ারলাইন্স সরাসরি টিকিট বিক্রি করছে। অন্য এয়ারলাইন্সগুলো তাদের কাউন্টারে টিকিট বিক্রি করছে। ফলে ট্রাভেল এজেন্সি টিকিট বিক্রির তেমন কোন সুযোগ পাচ্ছে না। আগের তুলনায় আমরা ৫ শতাংশের মতো টিকিট বিক্রি করতে পারছি। সব মিলিয়ে এই খাতে অর্থনৈতিক মহা দুর্যোগ চলছে।’

[৫] জানা গেছে, দেশে দুই ধরনের ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে। যেসব ট্রাভেল এজেন্সির আইটা (আইএটিএ) লাইসেন্স আছে তারাই সরাসরি বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের টিকিট ইস্যু করতে পারেন। বাকিরা আইটার লাইসেন্স আছে এমন এজেন্সি থেকে টিকিট ক্রয় করে যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি করেন। আইটা লাইসেন্স পেতে হলে এজেন্সিগুলোকে তাদের প্রতি মাসের যে পরিমাণে টিকিট বিক্রি হয়, তার সমপরিমাণ টাকা আগেই ব্যাংকে জমা রাখতে হয়।

[৬] আটাবের হিসাব অনুযায়ী- সারাদেশে তিন হাজার ৮৪৩টি ট্রাভেল এজেন্সি রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগে তিন হাজার ২০১টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৮৫টি এবং সিলেট বিভাগে ২৫৭টি রয়েছে।

[৭] আটাব বলছে, গত মার্চ থেকে শুরু করে জুন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পুরোপুরি বন্ধ ছিল। গত ১৬ জুন থেকে সীমিত পরিসরে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালু হয়েছে। কিন্তু আগে বিশ্বের শতাধিক রুটের টিকিট বিক্রি হতো। বর্তমানে শুধু বাহরায়ন, দুবাইসহ কয়েকটি দেশের টিকিট বিক্রি হচ্ছে। করোনার আগে ২৫টির বেশি এয়ারলাইন্স বিভিন্ন দেশে ফ্লাইট পরিচালনা করতো। বর্তমানে বাংলাদেশে বিমানসহ ছয়টি এয়ারলাইন্স সীমিত সংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। ফলে বর্তমানে ৯০ শতাংশ ট্রাভেল এজেন্সি বন্ধ। আগে যেসব ট্রাভেল এজেন্সিগুলো মাসে কয়েক কোটি টাকার টিকিট বিক্রি করতো এখন সেটা লাখে নেমে এসেছে।

[৮] গত ১৩ এপ্রিলে আটাবের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, করোনার প্রভাবে জুন পর্যন্ত ট্রাভেল এজেন্সি ও পর্যটন খাতে সম্মিলিতভাবে প্রাক্কলিত ব্যবসায়িক ক্ষতির পরিমাণ ১২ হাজার কোটি টাকা। এ সময় প্রায় চার লাখ লোকের চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। শুধু ট্রাভেল এজেন্সি খাতে করোনার প্রভাবে প্রাক্কলিত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে আনুমানিক পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

[৯] আটাবের সাধারণ সম্পাদক ও অ্যারিক্স এয়ার সার্ভিসের স্বত্বাধিকারী মো. মাজহারুল এইচ ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের ব্যবসা একদমই নেই। যতটুকু আছে তা একেবারেই যতসামান্য। যেহেতু বিমানের ফ্লাইট সেইভাবে অপারেশেন হচ্ছে না, ফলে আমাদের কোনও রকমের ব্যবসার সুযোগ নেই। অন্য এয়ারলাইন্সে যেরকম ফ্লাইট থাকার কথা ছিল, এখন তো সেই রকম নেই। তারা তাদের সুবিধামত করতেছে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আসলে সর্বপ্রথম আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত এবং সর্বশেষই আমাদেরই রিকভারি হবে। দিন-দিন এই ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।’

[১০] তিনি আরও বলেন, ‘করোনার কারণে গত পাঁচ মাস ব্যবসায় বন্ধ ছিল। আগে যেসব ট্রাভেল এজেন্সি মাসে পাঁচ থেকে সাত কোটি টাকার টিকিট বিক্রি করতো এখন তারা মাসে ৫০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে।

[১১] ফোর এভিয়েশন সার্ভিস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. দিদারুল আলম বলেন, ‘এপ্রিল থেকে অফিস বন্ধ আছে। কিছু কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। আর কিছু বাড়িতে আছে। অফিস ভাড়াও বাকি। আমাদের আইএটিএ লাইসেন্স নেই। যেসব এজেন্সির লাইসেন্স আছে তাদের কাছ থেকে টিকিট কিনে আমরা বিক্রি করতাম। করোনার আগে মাসে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার টিকিট বিক্রি হতো। গত পাঁচ মাস ব্যবসায় একদম বন্ধ। কষ্টে আছি পরিবার নিয়ে।’

[১২] তিনি আরও বলেন, ‘নতুন জনশক্তি রফতানি, মেডিক্যাল ও ভবন ভিসা চালু না হলে মানুষ কিভাবে দেশের বাইরে যাবে? আর মানুষ বাইরে না গেলে আমরা কার কাছে টিকিট বিক্রি করবো।’

[১৩] এজেন্সি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘জনশক্তি রফতানির পাশাপাশি মেডিক্যাল, ট্যুরিস্ট ভিসায় এবং হজ্জ-ওমরা করতে বছরে এয়ারলাইন্সে দেশের বাইরে যান প্রায় এক কোটির মতো মানুষ। দেশের অভ্যন্তরণে মিলিয়ে সেটি কোটির ওপরে। করোনা এখন প্রায় পুরো ব্যবসায় বন্ধ আছে।’

[১৪] আটাবের প্রেসিডেন্ট মো. মুনসুর আহমেদ খান বলেন, এটা বছরের বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা।’

[১৫] জনশক্তি রফতানি সংস্থা বাংলাদেশে অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটি এজেন্সির (বায়রা) সূত্রে জানা গেছে- বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ১৬০টি দেশে জনশক্তি রফতানি করা হয়। তবে, সৌদি আরব, কাতার, মালয়েশিয়া, কুয়েত, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানির বড় বাজার। প্রতিবছর বাংলাদেশে থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১০ থেকে ১৫ লাখ নতুন জনশক্তি রফতানি হতো। করোনার কারণে এখন পর্যন্ত নতুন জনশক্তি রফতানি বন্ধ আছে। করোনায় শুধু সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য ৩০ হাজারের মতো বিভিন্ন পর্যায়ের জনশক্তি রফতানি আটকে গেছে।

[১৬] বায়রার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট শাহদাত হোসাইন বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে ১৬০টি দেশে জনশক্তি রফতানির নাম আছে। এরমধ্যে বেশিকিছু দেশে ৫ থেকে ১০ জন গেছে এমন। মূলত আমাদের দেশ থেকে জনশক্তি রফতানি হয় সৌদি আরব, কাতার, মালয়েশিয়া, ওমান, সিঙ্গাপুরের অর্থাৎ মধ্যেপ্রাচ্যের দেশেগুলোতে বেশি। প্রতি বছর ১০ থেকে ১৫ লাখ নতুন জনশক্তি রফতানি হতো।’

[১৭] আটাবের সূত্রে জানা গেছে, সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য যাত্রীকে ভ্রমণে জন্য দিতে হয় ৫০০ টাকা। আর অন্যান্য দেশের জন্য মিনিমাম দুই হাজার টাকা। এর বাইরে আরও অন্যান্য বিষয়েও যাত্রীকে সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয়। গত বছর আন্তর্জাতিক রুটে ৮৫ লাখ ৯৪ হাজার ৯৩৭ জন যাত্রী গিয়েছে। সেই হাজারও কোটি টাকা গত বছর সরকার রাজস্ব পেয়েছে এই খাত থেকে।

[১৮] আটাবের প্রেসিডেন্ট মো. মুনসুর আহমেদ খান বলেন, ‘ট্রাভেল ট্যাক্স ভারতের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা। অর্থাৎ সার্কভুক্ত দেশগুলোর ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা। আর সার্কের বাইরে মিনিমাম দুই হাজার টাকা। এটা টিকিটের সঙ্গে যোগ হয়ে যায়। টিকিটের একটা হচ্ছে ফেয়ার, এরপর আসে ট্যাক্স। এখানে বিভিন্ন ধরনের ট্যাক্স আছে। একটা ইনস্যুরেন্স আছে। সব মিলিয়ে ৭ হাজার টাকা আসতে পারে। টিকিটের ফেয়ার বাড়লে ট্যাক্সও বেড়ে যাবে। বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত