প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এ বি এম কামরুল হাসান : দয়া করে এন৯৫ এর নিচে সার্জিকাল মাস্ক পরবেন না

সপ্তাহ দুয়েক আগের কথা। কোভিডকালে গৃহবন্দী আমার এক আত্মীয় পরিবার নিয়ে গেছিলো ঢাকার অদূরে ঘুরতে। মুখে এন৯৫ মাস্ক, তার নিচে সার্জিকাল মাস্ক। জিজ্ঞেস করতেই বললো, ‘এক মাস্কে ভরসা পাই না। তাছাড়া অনেক ভিভিআইপি তো পরে’। আমি নির্বাক। সত্যিই তো। আমিও দেখেছি পত্রিকায়, অনেক ভিভিআইপি-কে দুটো মাস্ক পরতে। কখনো এন৯৫ এর নিচে সার্জিকাল মাস্ক, কখনো ওপরে। সবাই ভিভিআইপি-দের অনুসরণ করতে চায়। বললাম, প্রধানমন্ত্রীকে অনুসরণ করেন। তিনি কখনো দুটি মাস্ক পরেন না। একটিই পরেন। তাও শুধু সার্জিকাল মাস্ক। যিনি হাসপাতালে পজিটিভ রোগীর চিকিৎসার সাথে জড়িত নন, তিনি শুধু সার্জিকাল মাস্ক পরবেন। এটাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন। তিনি সেটাই করেন।

দরকার না থাকলেও আপনি এন৯৫ পরতে পারেন। তবে তো সেটা যথাযথভাবে পরতে হবে। এন৯৫ এর কাজ হলো আপনার মুখমন্ডলকে চারদিক থেকে সীল করে রাখা। আপনি স্বাস নিবেন মাস্কের ভেতর দিয়ে। প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বলছে, মুখে পশম থাকলে এটি পুরাপুরি সীল হবে না। সেখানে আপনি নিচে একটা সার্জিকাল মাস্ক রেখে কেমনে সীল প্রত্যাশা করেন ? যদি সত্যিই সীল না হয়, তাহলে আপনার এন৯৫ মাস্কটি একটি সার্জিকাল মাস্কের মতো কাজ করবে। মানে আপনি দুটি সার্জিকাল মাস্ক পরছেন। তাতে লাভ কি ? যারা পরছেন তাদের যুক্তি হলো, এন৯৫ মাস্কটি যাতে নষ্ট না হয়, তাই এই প্রতিরোধ। সেটি করতে যেয়ে আপনি এন৯৫-কে তার কাজটি করতে দিচ্ছেন না।

এবার দেখে নেয়া যাক, এন৯৫ এর ওপরে সার্জিকাল মাস্ক পরলে লাভ-ক্ষতি কি ? ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেক। ২০০৮ সালে প্রকাশিত একটি পাবলিক হেলথ জার্নালের নিবন্ধ মতে, এন৯৫ ও সার্জিকাল মাস্ক একসাথে ব্যবহারে আপনার স্বাস প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হবে। তাত্ত্বিকভাবে, আপনার রক্তে অক্সিজেনের পরিমান কিছুটা কমবে, কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমান কিছুটা বাড়বে। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়বে। সর্বোপরি, মানসিক ক্ষতি তো আছেই। তবে বলতে পারেন, এটি মন্দের ভালো। এন৯৫ অন্তত তার কাজটি করতে পারবে, আপনার ক্ষতি যাই হোক ।

এন৯৫ এর নিচে বা ওপরে সার্জিকাল মাস্ক পরে অনেক স্বাস্থ্যকর্মী দীর্ঘমেয়াদে বা পুনরায় সেটি ব্যবহার করতে চান। অনেকের যুক্তি হলো, সার্জিকাল মাস্কটিকে মাইক্রোপোর দিয়ে আটকিয়ে নেই, যাতে কোনো লিক না থাকে। লিক টেস্ট করার ব্যবস্থা দেশের কোনো হাসপাতালে নেই। পুনরায় ব্যবহারকারীদের জন্য তথ্য হচ্ছে, মেডিসিনের একটি বিখ্যাত জার্নাল ‘এনালস অফ ইন্টারনাল মেডিসিন’ এর এবছরের ১৮ জুনে প্রকাশিত নিবন্ধে উল্লেখ আছে যে,স্বাস্থ্যকর্মীদের এন৯৫ পুনর্ব্যবহারে এর কার্যকারিতার কোনো প্রমান এখনো মেলেনি। তার ওপর স্বাস্থ্য ঝুঁকি তো আছেই।

ভিভিআইপি-দের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ, এন৯৫ এর নিচে কখনো সার্জিকাল মাস্ক পরবেন না। তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না। আপনারা পরলে সবাই সেটা অনুসরণ করতে চায়। আপনারা আমাদের পথ প্রদর্শক, দিক নির্দেশক। আপনারা জনগণকে বিভ্রান্ত করবেন না। সরকার বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে তিনটি অনুরোধ। এক, অবিলম্বে এন৯৫ ও সার্জিকাল মাস্ক একইসাথে ‘ব্যবহার করা’ বা ‘না করার’ একটি বিজ্ঞানসম্মত গাইড লাইন প্রকাশ ও প্রচার করুন। বিভ্রান্তি দূর করুন। দুই, স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক মাস্ক সরবরাহ করুন, যাতে তাদেরকে পুনরায় ব্যবহার করতে যেয়ে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে না পড়তে হয়। তিন, যে সব হাসপাতালে কোভিড রোগীর চিকিৎসা চলছে সেখানে মাস্কের লিক টেস্টের ব্যবস্থা রাখুন। এটির জন্যে প্রয়োজন একটি প্লাস্টিকের হুড, আরেকটি ঝাঝালো বা মিষ্টি গন্ধযুক্ত স্প্রে। খুব সামান্যই খরচ হবে এতে। আশার কথা, কানাডা প্রবাসী চিকিৎসক ডাঃ অসিত বর্ধন তাঁর সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ‘বিডিইএমআর’ এর তত্ত্বাবধানে বিএসএমএমইউ -তে খুব শীঘ্রই মাস্কের লিক টেস্ট পরীক্ষামূলভাবে শুরু করতে যাচ্ছেন। লিক টেস্টের এ মডেলটি স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় অনুসরণ করতে পারে। লেখকঃ প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট।

সর্বাধিক পঠিত