প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ: ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়, শুভঙ্করের ফাঁকি

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ: ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা’ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের একটি নগ্ন উদাহরণ। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বিরাজনীতিকীরণের জন্য তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা এবং দলের অন্যান্য সদস্যদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালায়। শুধু তা-ই নয়, সেই বর্বর গ্রেনেড হামলার পরে তৎকালীন বিএনপি সরকার মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত উধাও করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। একইসঙ্গে গ্রেনেড হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যা রাজনৈতিক নাটকও সাজায়।

হামলা হওয়ার প্রায় ১৪ বছর পর আমরা তার বিচার পেয়েছি। মামলার জীবিত ৪৯ আসামির মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, মাওলানা তাজউদ্দিন, হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন মহামান্য আদালত। এছাড়াও মামলায় সরাসরি সংশ্লিষ্টতার দায়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

মামলাতে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য মোট ১৪টি বিষয় বিবেচনায় নিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে ৭ নম্বর বিবেচ্য বিষয় ছিলো- ‘গুলশান থানার লালাসরাই মৌজার ১৩ নম্বর রোডের ব্লক-ডি, বাড়ি নম্বর-৫৩, বনানী মডেল টাউনের জনৈক আশেক আহমেদ, বাবা-আবদুল খালেক; তার বাসাটি ‘হাওয়া ভবন’ নামে পরিচিত। ওই ‘হাওয়া ভবন’ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কিনা? ওই ঘটনাস্থলে পলাতক আসামি তারেক রহমান অপরাধ সংঘটনের জন্য ষড়যন্ত্রমূলক সভা করে কিনা ও জঙ্গি নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন সময় মিটিং করে কিনা?’

নিঃসন্দেহে আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে হাওয়া ভবনে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। আর সে কারণেই আসামি তারেক রহমানকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন আদালত। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তাহলে অন্য ষড়যন্ত্রকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও তারেক রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো না কেন? আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে হিসেব মেলানো ভার! আদালতের ১০ থেকে ১৩ নম্বর বিবেচ্য বিষয় ছিলোÑ ১০. অভিন্ন অভিপ্রায়ে ও পূর্বপরিকল্পনার আলোকে পরস্পর যোগসাজশে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঘটনায় জড়িত আসামিদের গ্রেনেড আক্রমণ চালানোর সুবিধার জন্য ও অপরাধীদের রক্ষার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা। ১১. অভিন্ন অভিপ্রায় ও পূর্বপরিকল্পনার আলোকে প্রশাসনিক সহায়তা দিয়ে মামলার ঘটনায় ব্যবহৃত অবিস্ফোরিত সংরক্ষণযোগ্য তাজা গ্রেনেড আলামত হিসেবে জব্দ করার পরও তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করে এবং আদালতের অনুমতি না নিয়ে অপরাধীদের বাঁচানোর উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী কর্তৃক ধ্বংস করার ও আলামত নষ্ট করায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা। ১২. অভিন্ন অভিপ্রায়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত সভা ও পূর্বপরিকল্পনার আলোকে পরস্পর যোগসাজশে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মূল আসামিদের সহায়তা করার লক্ষ্যে আসামিদের নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে ও পরবর্তী সময়ে আসামিদের অপরাধের দায় থেকে বাঁচানোর সুযোগ করে দেওয়ার অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা। ১৩. প্রকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের রক্ষা করার জন্য প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে অন্য লোকের ওপর দায় বা দোষ চাপিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার লক্ষ্যে মিথ্যা ও বানোয়াট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করার অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কিনা।

ওপরের সবগুলো বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সচেষ্ট ষড়যন্ত্রের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেই তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে আদালত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা এটাও জেনেছি, তদন্তে ও আসামিদের জবানবন্দিতে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে শুধু তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর-ই নন, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা খালেদা জিয়াও ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি নিজেও হামলার আলামত নষ্ট করার আদেশ দিয়েছিলেন এবং ডিজিএফআইকে এ হামলা সম্পর্কে তদন্ত করতে নিষেধ করেছিলেন। তাহলে আমার প্রশ্ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সচেষ্ট ষড়যন্ত্রের কারণে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও ওই সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেগম জিয়াকে ছাড় দেওয়া হলো কেন? অঙ্ক তো দেখি এখানেও মেলানো যাচ্ছে না!

লেখক : আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক

 

সর্বাধিক পঠিত