প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. সেলিম জাহান: যে শিশুর শৈশব নেই

ড. সেলিম জাহান: চমৎকার সাজানো খাবার টেবিল- খাদ্য সম্ভারে, পুস্পে এবং সজ্জায়। বন্ধু কন্যাটি খুব যত্ন করে সব আয়োজন করেছে। কিন্তু চেয়ার টেনে বসতে বসতে কেমন যেন একটা উদ্বিগ্নতা টের পাই বন্ধুকন্যাটি এবং তার বরের মুখে, আমাদের আশেপাশে এবং বলা চলে, ঘরের বাতাসে। সে উদ্বিগ্নতা এতো পুরু আর ঘন যে মনে হয় ছুরি দিয়ে কাটা যাবে। ঘটনাটা বছর খানেক আগের। আমার পাতে খাবার তুলে দিতে দিতে বন্ধুকন্যাটি তার স্বামীর দিকে মুখ তুলে বললো, ‘নাবিলকে ডাকো, খাবার নিয়ে যাক’। ‘কেন, ও বসবে না আমাদের সঙ্গে?’, অবাক হয়ে প্রশ্ন করি আমি। ‘না, চাচা, কালকে ওর পরীক্ষা আছে একটা। আমাদের সঙ্গে খেতে বসলে খামোখা সময় নষ্ট হবে। খাবার নিয়ে ওর ঘরে বসে খেতে খেতে পড়তে পারবে’। আমি অবাক যাই।

একটু পরে মায়াময় চেহারার ১১/১২ বছরেরে একটি কিশোর এসে দাঁড়ায় খাবার টেবিলের পাশে। তার বাবা তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ওর নাম নাবিলÑ মা-বাবার একমাত্র সন্তান। আমার দিকে তাকিয়ে সে হাসে। কিন্তু সে হাসিতে উৎফুল্লতার চাইতেও বিষণ্নতাই বেশি, সে হাসি আনন্দের চাইতে করুণই বেশি। সেই ধূসর বিষণ্নতার দিকে তাকিয়ে ‘কোন ক্লাসে পড়ো’, ‘কোন স্কুলে যাও’- এসব ছেঁদো প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করলো না।
কিন্তু নাবিলই আমাকে বাঁচিয়ে দিলো। ভারী উজ্জ্বল চোখে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি নাকি ৮৪টি দেশে গেছো – বাবা বলছিলো’। আমি কিছু বলার আগেই ওর হাতে খাবার থালা তুলে দিয়ে ওর মা বললেন, ‘আরেক দিন শুনো সেসব কথা ভাইয়ার কাছে। এখন পড়তে যাও’। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটির মুখের আলো দপ করে নিভে গেলো, ফিরে এলো সেই আগের বিষণ্নতা। সে ঘরের দিকে ধীর পা বাড়াতেই পেছন থেকে তার বাবা বললেন, ‘খেতে খেতে আগের পড়াগুলো ঝালিয়ে নিও’। তারপর অনেকটাই যেন ব্যাখ্যার মতো করে বললেন, ‘সাপ্তাহিক পরীক্ষা হলেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটায় একটু খারাপ হলেই গড় কমে যাবে’।

বুঝলাম, নাবিলের শিক্ষাটা একটা গড়ে রূপান্তরিত হয়েছে। কিছু শিখুক আর না শিখুক, ওই গড়ের পতন ঠেকাতে হবেই। আমার চিন্তা ভঙ্গ হল বন্ধুকন্যাটির কথায়, ‘আচ্ছা, আপনি তো শুনেছি কখনো দ্বিতীয় হননি। দিনে কতো ঘণ্টা পড়তেন আপনিÑ ১২ ঘণ্টা?’ ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যাই আমি। মেয়েটি বোধহয় আমার ভাবান্তর টের পায়। একটু সদয় হয় সে আমার প্রতি, ‘তবে কি ৮ ঘণ্টা?’ আমি আমতা আমতা করি – কেমন করে এ বন্ধুকন্যাটিকে আমি বলব যে জীবনে কোনোদিন কোনো অবস্থাতেই দৈনিক ৪ ঘণ্টার বেশি পড়িনি।

আমি বেঁচে যাই তার স্বামীর প্রশ্নে। তিনি স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন যে নাবিলের পিয়ানো শিক্ষক এসেছিলেন কিনা। ইতিবাচক উত্তর দিয়ে আমার বন্ধুকন্যাটি পাল্টা প্রশ্ন করেন স্বামীকে, ‘তুমি নাবিলকে লেখার ক্লাসে নিয়ে গিয়েছিলে বিকেল বেলা?’ আবারও ইতিবাচক উত্তর এলো। ততোক্ষণে আমি বুঝে গেছি যে নাবিলের দৈনন্দিন সময় ছক আমারটির চেয়েও জটিল ও দীর্ঘ। আরও বুঝতে পারি যে যে তার ঠাসা সময় ছকে সব কিছুর জন্য সময় আছে, কিন্তু নাবিলের কৈশোরের জন্য সময় নেই।

ততোক্ষণে আমি আমার বন্ধুকন্যাটির পরের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি – ‘আচ্ছা চাচা, আপনি এতো সুন্দর লেখেন। কিন্তু লিখতে শিখলেন কেমন করে?’ ‘খেলতে, খেলতে’, প্রায় তাৎক্ষণিক জবাব আমার। টের পাই স্বামী-স্ত্রী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে- ঠিক নিশ্চিত নন, আমি উপহাস করছি কিনা। ‘না, না’, আশ্বস্ত করি তাদের, ‘মানে ‘লেখা’ আর ‘খেলা’ র মধ্যে পার্থক্যটা হচ্ছে ‘খ’ আর ‘ল’ এর জায়গা বদল। নয় কি? ওই শব্দ নিয়ে খেলতে খেলতেই লেখা হয়ে গেলো।’ আমার উত্তরে তাদের দুজনেরই চোখে স্বস্তির ছায়া দেখতে পাই।

ততোক্ষণে আমি চেয়ার ঠেলে উঁঠে দাঁড়িয়েছি। আমার বন্ধুকন্যা তার স্বামীটি হা হা করে উঠলো, ‘সে কি চাচা। খাওয়া শেষ? কিছুই তো খেলেন না’। কিন্তু ভদ্রতার বালাই বড় বালাই। বলা গেলো না তাদের যে এতো সুখাদ্যও গলা দিয়ে নামছিলো না আমার। বরং বললাম, ‘না, না। অনেক খেয়েছি। খুব ভালো রান্না হয়েছে’। প্রক্ষালন কক্ষের কলের জল ছেড়ে দিয়ে হাত ধুতে ধুতে হঠাৎ দেয়াল জোড়া আয়নার দিকে চোখ গেলো আমার। গরম জলের বাষ্পে ঝাপসা হয়ে যাওয়া ওই আয়নায় বহুদূর থেকে একটা ছবি ফুটে উঠলো। ঝমঝম করে বৃষ্টির মধ্যে এক দঙ্গল ছেলে ভিজতে ভিজতে হৈ হৈ করতে স্কুল থেকে ফিরছে। একে অন্যের গায়ে জল ছিটোচ্ছে, রাস্তায় জলভরা খানাখন্দ দেখে দেখে তার মধ্যেই জুতোসহ পা ডোবাচ্ছে, গায়ের জামা খুলে মাথায় জড়িয়েছে। কী তাদের হাসি, কী তাদের মজা।

ছেলেগুলো দূরে চলে যাচ্ছে- কমে আসছে তাদের কোলাহল, মৃদু হয়ে আসছে তাদের হাসির শব্দ। আমি নিশ্চিত জানি যে ওর মধ্যে একটি ছেলে ফিরে তাকাবে আমার দিকে। আমি অপেক্ষা করি- গুনী এক, দুই, তিন। ওই তো কোনার দিকের ছেলেটি ঘুরে তাকালো, হাসলো আমার দিকে চেয়ে, হাতও কি নাড়লো? তারপর আবার ঘুরে গেলো। আমিও স্মিতহাস্যে ঘুরলাম এবং প্রক্ষালনকক্ষের দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। আমার মুখের মৃদু হাসিটি তখনও ঠোঁটের ডগায় লেগে আছে। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত