প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শীর্ষ খেলাপি এমএ আজিজ এবার হলিউডে ছবি বানাবেন!

ডেস্ক রিপোর্ট : জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আব্দুল আজিজ (এমএ আজিজ)। গোয়েন্দা থ্রিলার ‘মাসুদ রানা’ নিয়ে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বাজেটের সিনেমা বানানোর ঘোষণা দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন গত বছর। এবার একটি-দুটি নয়, হলিউডের সঙ্গে তিনটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন ব্যাংকিং খাতের এই ‘কুখ্যাত বন্ড’। নিজেই জানিয়েছেন শিল্পী ও কলাকুশলীদের বিশাল বহর নিয়ে আমেরিকায় উড়াল দেয়ার কথা। যদিও কয়েক হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ উদ্ধারে তার কোনো খোঁজই পাচ্ছেন না জনতা ব্যাংক কর্মকর্তারা।

দুই সহোদর এমএ কাদের ও এমএ আজিজের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। ক্রিসেন্ট গ্রুপের পাঁচটি কোম্পানির নামে এ অর্থ লুণ্ঠন করা হয়েছিল।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদে দেশের সব ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। প্রকাশিত এসব খেলাপি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ তিনটিই আবদুল আজিজ ও তার পরিবারের সদস্যদের। সে তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে আবদুল আজিজের প্রতিষ্ঠান রিমেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা ১ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এছাড়া ক্রিসেন্ট লেদার প্রডাক্টের কাছে পাওনা ১ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। একই গ্রুপের রূপালী কম্পোজিটের কাছে ১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা পাবে জনতা ব্যাংক। এছাড়া লেক্সকো লিমিটেডের কাছে ৫১৪ কোটি ও ক্রিসেন্ট ট্যানারিজের কাছে ২৩১ কোটি টাকা পাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি। সব মিলিয়ে আবদুল আজিজের পরিবারের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা ছিল ৪ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। এ ঋণের পরিমাণ গত ছয় মাসে আরো বড় হয়েছে। ভুয়া রফতানিসহ নানা প্রতারণার মাধ্যমে ব্যাংক থেকে এ অর্থ নিয়েছেন তারা।

জনতা ব্যাংকের এক টাকাও ফেরত না দিয়ে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে ৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘মাসুদ রানা’ চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দেন আবদুল আজিজ। এ ঘোষণায় তোলপাড় শুরু হয় দেশের সিনেমাপাড়ায়। এরপর বিষয়টি নিয়ে তেমন আলোচনা না হলেও ৩ আগস্ট ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে নতুন পোস্ট দিয়ে ফের আলোচনায় ফিরেছেন তিনি। ফেসবুকে আবদুল আজিজ লিখেছেন, ‘হলিউডের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায় তিনটি সিনেমা নির্মাণ করছি। নির্মাণ শেষে হলিউডের ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মাধ্যমে সিনেমাগুলো বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাবে। আমেরিকা যাচ্ছি, তবে আমি একা নই, বাংলাদেশ থেকে আরো অনেক শিল্পী ও কলাকুশলীকে নিয়ে যাচ্ছি। যেমন এমআর-৯ বা মাসুদ রানা সিনেমার জন্য এবিএম সুমনসহ আরো অনেকে। সিনেমাটি ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিশাল পরিসরে নির্মিত হতে যাচ্ছে। আশা করি, সিনেমাটি ভালো হবে এবং বিশ্বব্যাপী ব্যবসাসফল হবে।’

আবদুল আজিজ আরো লেখেন, ‘মাসুদ রানা যদি সফল হয়, বাংলাদেশের এবিএম সুমনসহ আরো অনেকেই হলিউডে প্রতিষ্ঠিত হবে। একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে তারা সিনেমাপ্রতি মিলিয়ন ডলার (৯ কোটি টাকা প্রায়) পারিশ্রমিক পাবে। এমআর-৯ সিনেমার টাইটেল গান ইংরেজিতেই হয়েছে। একজন বাংলাদেশী মিউজিক কম্পোজারের মাধ্যমেই টাইটেল গান সম্পন্ন হয়েছে। এ গান দিয়েই তিনি হলিউডে পা রাখতে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আমি একা নই, আরো অনেক শিল্পী ও কলাকুশলীকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ ও হলিউডের সঙ্গে একটি ব্রিজ তৈরি করছি, যাতে পরবর্তী প্রজন্মের চলচ্চিত্র ভাবনার পথ সুগম হয়।’

অবশ্য আমেরিকা যাত্রা বা চলচ্চিত্র নির্মাণের বিষয়ে কিছুই জানেন না আজিজ ঘোষিত ‘এমআর-৯’-এর নায়ক এবিএম সুমন। গতকাল তিনি বলেন, আমেরিকায় যাওয়া থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র সম্পর্কিত সবকিছুই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া দেখছে। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমি অভিনয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছি।

যেকোনো চলচ্চিত্র নির্মাণের আগে শিল্পীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়। মাসুদ রানার ক্ষেত্রে এমনটি হয়েছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে এবিএম সুমন বলেন, এখনো কোনো চুক্তি হয়নি। জাজ মাল্টিমিডিয়া থেকে যেসব শিল্পীর বিষয়ে ঘোষণা এসেছে তারা মাসুদ রানায় অভিনয় করবেন বলে জেনেছি।

আবদুল আজিজের বলিউডের সিনেমার শুটিং কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে জ্ঞাত নন জাজ মাল্টিমিডিয়ার সিইও আলিমুল্লাহ খোকনও। তিনি জানান, হলিউডের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিলভার লাইন, জাজ মাল্টিমিডিয়াসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ অর্থায়নে মাসুদ রানা নির্মিত হবে। এ চলচ্চিত্রের বাংলাদেশ ও ভারত অংশের দায়িত্ব জাজ মাল্টিমিডিয়া পালন করবে। এতে জাজের বিনিয়োগের অংশ সামান্যই। করোনার প্রভাবে সবকিছুতেই স্থবিরতা ছিল। কবে নাগাদ ছবির শুটিং শুরু হবে, সে বিষয়ে আমি তেমন কিছু জানি না। এ বিষয়টি আবদুল আজিজ নিজেই তদারক করছেন।

আবদুল আজিজের ঘোষণা অনুযায়ী, এমআর-৯ নির্মিত হবে আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগও অনেক বড় হওয়ার কথা। আইন অনুযায়ী, দেশের বাইরে কোনো বিনিয়োগ করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। এক্ষেত্রে জাজ মাল্টিমিডিয়া অনুমোদন নিয়েছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে আলিমুল্লাহ খোকন বলেন, বাংলাদেশে শুটিং হলে শিল্পীদের সম্মানী দেশী মুদ্রাতেই পরিশোধ করা হবে। এজন্য অনুমোদনের দরকার হবে না বলে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান তিনি।

এ বিষয়ে চেষ্টা করেও আবদুল আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার মুঠোফোন নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপে কল গেলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে আবদুল আজিজ বর্তমানে দেশেই আছেন বলে আলিমুল্লাহ খোকন নিশ্চিত করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই বছরে আবদুল আজিজ ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্ত। খুঁটি গেড়েছিলেন কানাডার বেগম পাড়ায়। আবার যখন খুশি তখন দেশেও এসেছেন। যদিও শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) কোনো প্রতিষ্ঠানই আবদুল আজিজকে খুঁজে পায়নি। আবার দীর্ঘ এ সময়ে তাকে খুঁজে পাননি জনতা ব্যাংক কর্মকর্তারাও।

জনতা ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী মো. আবদুছ ছালাম আজাদ জানান, আবদুল আজিজের কোনো সন্ধান তাদের কাছে নেই। ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের টাকা পরিশোধের আগ্রহ দেখিয়ে কখনই ব্যাংকারদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেননি। আবার ব্যাংকাররা যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে খুঁজে পাননি। ব্যাংকের পক্ষ থেকে এমএ কাদের, আবদুল আজিজসহ ওই পরিবারের ঋণগ্রহীতা সব সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। দুদকের মামলায় এমএ কাদের কারাগারে গিয়েছিলেন। ঈদুল ফিতরের আগে তিনি শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। যদিও জামিনের শর্ত অনুযায়ী, এমএ কাদের ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করছেন না।

আবদুছ ছালাম আজাদ আরো বলেন, ক্রিসেন্ট গ্রুপের ব্যাংকে ৪৩ কোটি টাকার বেশি জমা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত মাত্র ৫০ লাখ টাকা জমা দিয়েছে। মুক্তির পর এমএ কাদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে শুনেছি। এর পর থেকে ব্যাংকের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণগুলো পুনঃতফসিলের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু ডাউন পেমেন্ট পরিশোধ না করায় তা সম্ভব হয়নি।

২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি ৯১৯ কোটি টাকা পাচারের মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন এমএ কাদের। এক বছরের বেশি কারাভোগ করার পর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি জামিন পান তিনি। জামিন আবেদনে বলা হয়েছিল ৪৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা তারা জমা দিয়েছেন। মুক্ত হয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের শর্ত অনুযায়ী ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করবেন। যদিও কারামুক্ত হওয়ার পর সে শর্ত ভুলে গিয়েছেন এমএ কাদের। এখন পর্যন্ত পরিবারটির কাছ থেকে মাত্র ৫০ লাখ টাকা ফেরত পেয়েছে জনতা ব্যাংক।

আবদুল আজিজসহ তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ৯১৯ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে মামলাটি করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। আর ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরেকটি মামলা করেছে দুদক। জনতা ব্যাংক মামলা করেছে ৩ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা ফেরত না দেয়ার। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি থেকে বিশাল অংকের এ অর্থ বের করে নেয়ার ক্ষেত্রে আবদুল আজিজ সহযোগী করেছেন মা, ভাই, ভাবি, স্ত্রী, ভাতিজিকে। বৃহৎ এ ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় দায়েরকৃত প্রতিটি মামলায় তাদের আসামিও করা হয়েছে। যদিও গ্রেফতার হয়েছিলেন কেবল এমএ কাদের। অধরা থেকে যান এমএ আজিজ।

ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে দীর্ঘদিন নিজেকে আড়াল করে রাখা সেই আজিজই ফের দৃশ্যপটে হাজির হয়েছেন হলিউডে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে। সেই সঙ্গে আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া। ২০১১ সালে হঠাৎ করেই গজিয়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির ব্যানারে নির্মিত হতে থাকে বড় বাজেটের সিনেমা। রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে অবাধে অর্থ বের করার সময়েই জমজমাট ছিল জাজ মাল্টিমিডিয়া। ২০১৮ সালে ক্রিসেন্ট কেলেঙ্কারির ঘটনা ধরা পড়লে থমকে যায় প্রতিষ্ঠানটির চলচ্চিত্র নির্মাণও। বর্তমানে আর্থিক দীনতায় কর্মীদের বেতন-ভাতাও পরিশোধ করতে পারছে না জাজ মাল্টিমিডিয়া।

জাজ মাল্টিমিডিয়ার চুক্তিবদ্ধ নায়িকা ছিলেন কয়েকজন। এ নায়িকারা প্রতিষ্ঠানটি থেকে মাসিক অর্থ পেতেন। কিন্তু অনেক আগেই সে অর্থ দেয়া বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি জাজে কর্মরত কর্মচারীরাও ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না। চুক্তিবদ্ধ নায়িকারা অন্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করছেন। আবার কেউ কেউ বেকার বসে আছেন কাজের অভাবে। কাজ না থাকায় বিয়ে করে সংসারী হচ্ছেন কেউ কেউ। আর কর্মচারীরাও কাজ খুঁজে নিয়েছেন অন্য প্রতিষ্ঠানে। এ অবস্থায় হলিউডের সঙ্গে সিনেমা বানানোর ঘোষণা শুধুই শব্দবোমা কিনা, সে প্রশ্নও উঠেছে।

‘মাসুদ রানা’ কাজী আনোয়ার হোসেনের সৃষ্টি একটি তুমুল জনপ্রিয় চরিত্র। ১৯৬৬ সালে ‘ধ্বংস পাহাড়’ দিয়ে শুরু ‘মাসুদ রানা’র গল্প। দুর্দান্ত, দুঃসাহসী গুপ্তচর ‘মাসুদ রানা’ দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ান গোপন মিশন নিয়ে। ছোটবেলা থেকেই হয়তো এ গল্পের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন আবদুল আজিজ।

তার ঘোষণা অনুযায়ী, এমআর-৯ বা ‘মাসুদ রানা’ পরিচালনা করবেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত হলিউডের পরিচালক আসিফ আকবর। এ ছবিতে থাকবেন হলিউডের অভিনেতা মিকি রুর্কি, গ্যাব্রিয়েলা রাইট, ড্যানিয়েল বেনহার্ট, মাইকেল পেরে এবং রেসলিং তারকা দ্য গ্রেট খালি। ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ছবির ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি (ডিওপি) হিসেবে থাকবেন ‘জেমস বন্ড’ সিরিজসহ হলিউডের আরো অনেক জনপ্রিয় ছবির ডিওপি পিটার ফিল্ড। তবে সম্প্রতি জাজ মাল্টিমিডিয়া ঘোষণা দিয়েছে ‘মাসুদ রানা’ চরিত্রে অভিনয় করবেন নবাগত অভিনেতা এবিএম সুমন।বণিক বার্তা

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত