প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফরিদ আহমেদ: বানর সমাজের আচরণ মানব সমাজেও আছে

ফরিদ আহমেদ: ভাষা আমাদের যোগাযোগের খুব শক্তিশালী একটা মাধ্যম। পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যার ভাষা আছে। ভাষা ব্যবহার করে শব্দের মাধ্যমে, বাক্যের মাধ্যমে আমরা বিমূর্তভাবে একে অন্যকে অসংখ্য পরিমাণে তথ্য দিতে পারি। একজন অন্যজনের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারি, কে কী ভাবছেও সেটাও কথার মাধ্যমেই আমরা জানাতে পারি।

মানুষ এবং প্রাইমেটদের পূর্বপুরুষ দূর অতীতে যেহেতু একই ছিলো, সেখান থেকে পরবর্তীতে বিভক্ত হয়ে নানা প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে, সে কারণে প্রাইমেটোলজিস্টদের খুব কৌতূহলের জায়গা হচ্ছে অন্য কোনো প্রাইমেটদের আমাদের মতো ভাষা আছে কিনা। না, আমাদের মতো উন্নত ভাষা যে তাদের নেই, সেটা আমরা জানি পরিষ্কারভাবে। তাদের জানার চেষ্টাটা হচ্ছে এ’রকম উন্নত না হলেও শব্দ তৈরির মাধ্যমে কোনো ধরনের সুস্পষ্ট যোগাযোগ তারা একে অন্যের সাথে করে কিনা।

এই ধরনের প্রচেষ্টার সবচেয়ে বিখ্যাত গবেষণাটা করা হয়েছিলো কেনিয়াতে। গবেষণা না বলে গবেষণা সিরিজ বলা উচিত। এখানে ভারভেট মাংকি নামে একটা ছোট জাতের বানর প্রজাতি রয়েছে। এদের উপরেই চালানো হয়েছিলো গবেষণাটা। সর্বশেষ গবেষণাটা করেছিলেন ডরোথি চেনি এবং রবার্ট সেফার্থ নামের দু’জন গবেষক।

তাদের গবেষণায় দেখা যায় বিপদ আসন্ন হলে ভারভেটরা তিনটা ভিন্ন ধরনের বিপদ সংকেত প্রেরণ করে। এর একটা হচ্ছে শিকারি পাখিদের দ্বারা আক্রান্তের সম্ভাবনা তৈরি হলে। দ্বিতীয়টা হচ্ছে চিতাবাঘ কাছাকাছি এলে, আর তৃতীয়টা দেয়া হয় সাপ, বিশেষ করে অজগর সাপ উদয় হলে। এই তিন জাতের কাছ থেকেই ভারভেটরা সবচেয়ে বেশি বিপদের সম্মুখীন হয় এই অঞ্চলে। ফলে, তিন ধরনের শিকারিদের জন্য তিনটে আলাদা বিপদ সংকেত তৈরি করেছে তারা অন্যদেরকে আগেভাগে সতর্ক করে দেবার জন্য।

ডরোথি এবং রবার্ট যে কাজটা করেন, সেটা হচ্ছে এই বিপদ সংকেতগুলোকে রেকর্ড করেন, সেগুলোকে আলাদা করেন। তারপর এই বিপদ সংকেতগুলো নিয়ে গিয়ে যখন আসলে কোনো বিপদ নেই, কোনো শিকারি আশেপাশে নেই, সেই সময়ে বাজানো শুরু করেন। শিকারি পাখির জন্য যে বিপদসংকেত ভারভেট বানর দেয়, সেটা শোনার পরে দেখা গেলো বানরেরা ছুটোছুটি করে ঝোপের আড়ালে চলে যাচ্ছে যেখানে ঈগলের পক্ষে তাদেরকে ধরা সম্ভব নয়। চিতাবাঘের জন্য দেওয়া বিপদ সংকেত শোনার পরে তারা গাছ বেয়ে একেবারে উপরের দিকের পাতলা ডালে চলে যাচ্ছে যেখানে চিতাবাঘ তার ওজনের জন্য যেতে পারবে না। আর সাপের বিপদসংকেত শোনার পরেই তারা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আশেপাশে তাকাচ্ছে। মূল লক্ষ্য সাপকে লোকেট করা, যাতে করে কোনদিকে পালাবে সেটা বুঝতে সুবিধা হয়।

এই গবেষণা থেকে পরিষ্কার যে অন্তত বিপদের ক্ষেত্রে সতর্কতা বার্তা হিসাবে তারা তিনটে ভিন্ন ধরনের শব্দ করছে যেটা দিয়ে বানরেরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছে কোন ধরনের বিপদ আসন্ন। সেই অনুযায়ী তারা ব্যবস্থাও নিচ্ছে তড়িৎ গতিতে।

ডরোথি এবং রবার্ট ভারভেটদের গর্জন নিয়েও কিছুটা গবেষণা করেছিলেন। এই বানরেরা একে অন্যের সম্মুখীন হলে ঘোঁৎ ঘোঁৎ ধরনের মৃদু গর্জন করে। সাধারণ কানে এর পার্থক্য বোঝা সম্ভব নয়। মনে হবে সবাই একই ধরনের শব্দ করছে। কিন্তু, গবেষণায় দেখা গেছে এই গর্জনের মধ্য সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। বানর সমাজে কার মর্যাদা কেমন, সেটা এই গর্জন দিয়ে বোঝা যায়। যে সুপিরিয়র, সে এক ধরনের গর্জন করে। যেটার মানে হচ্ছে ভালোয় ভালোয় আমার সামনে থেকে সরে যা। দলের সুন্দরী কন্যাদের সাথে প্রেম করার অধিকার আমার, ভালো ভালো খাবারগুলোও আমার প্রাপ্য। এ নিয়ে ঝামেলা করলে খবর আছে তোর। অন্যদিকে, যার অবস্থান নিচে, সে আরেক ধরনের গর্জন করে সেটা জানান দেয়। জানিয়ে দেয় যে বস, আমি ছোট, আমাকে মারবেন না। আপনার যা নেবার নিয়ে যান, অবশিষ্ট কিছু থাকলে আমি নেবো। কিছু না থাকলেও সমস্যা নেই। আপনি খুশি থাকলেই আমি খুশি।

গর্জনের এই মৃদু পার্থক্যের মাধ্যমে অহেতুক লড়াইকে দুই পক্ষই এড়িয়ে যেতে পারে। শক্তিশালী যে তার শক্তি ক্ষয় হলো না বিনা কারণে। আর যে দুর্বল, সে-ও এই নতি স্বীকারের মাধ্যমে হামলার হাত থেকে বেঁচে গেলো। বানর সমাজের এই আচরণ মানব সমাজেও আছে। যে পাণ্ডা গোছের, সে বুক ফুলিয়ে এগোয়, রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করে। আর যে দুর্বল সে কাঁচুমাচু হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে, ঘন ঘন হাত কচলায়, সহমত ভাইসুলভ সুমধুর আচরণ করে। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত