প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বাংলাদেশ কেমন করছে? মুদ্রার অপর পিঠে কী রয়েছে অনেক কিছু ভালো! বাংলাদেশের মিডিয়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিন্দাই করছে?

মাহমুদ মেনন খান: কিছু পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করা যাক। দেশে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসায় হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা প্রস্তুত ১৫,৪৬৮টি। রোগী ভর্তি ৪,২৬১। সারাদেশে আইসিইউ প্রস্তুত ৫১১। রোগী ভর্তি ২৮২। অক্সিজেন সিলিন্ডার ১২,২৩৩। হাই ফ্লো ন্যাজল ক্যানোলা ২৭৭টি, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর ১১০। এই পরিসংখ্যান ২৩ জুলাই ২০২০ তারিখের।

জুনের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতে সংবাদমাধ্যমের হেডলাইনগুলো হচ্ছে একটু দেখে আসি- সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ’র জন্য হাহাকার। ঘুরে ঘুরেও মিলছে না আইসিইউ, মিলছে না শয্যা, আইসিইউ অক্সিজেন, দেশে আইসিইউ কতটি? কিভাবে চলে? প্রশ্ন হাইকোর্টের, ইত্যাকার আরও অনেক। টেলিভিশন টকশো’রও মূল উপজীব্য ছিলো এই আইসিইউ সঙ্কট।

এবার আমরা দুটি সময়ের কোভিড-১৯ সংক্রমণের তুলনামূলক চিত্রটি দেখি। জুনের প্রথম সপ্তাহের তৃতীয় দিনটিতে। করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা করা হয় ১২ হাজার ৫১০ জনের। এর মধ্যে কোভিড-১৯ শনাক্ত হয় ২৬৯৫ জনের। এই দিন মৃত্যুবরণ করেন ৩৭ জন। আর ওই দিনে রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন ৪৭০ জন।

এবার ২৩ জুলাই তারিখের পরিসংখ্যানে নজর দেই। ২৪ ঘণ্টার সবশেষ সাইকেলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে ভাইরাসটির অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ৮৫৬ জনের শরীরে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১২ হাজার ২৯৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ৬ জন কোভিড-১৯ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।

দেড় মাস সময়ের ব্যবধানে আমরা কোভিড-১৯ এর বিস্তার ও মৃত্যুর পরিসংখ্যানে একইরকম পরিস্থিতি দেখছি। এর মধ্যে অবশ্য এক দিনে মৃত্যু সর্বোচ্চ ৬০ জনে উঠেছে। তবে ধীরে ধীরে তা নেমে আবার ৩০ থেকে ৪০ এর ঘরেই বেশি থাকছে। কোনও কোনও দিন তা ৩০ এর নিচেও নামছে আবার কোনো দিন ৫০ শেও উঠছে। পরীক্ষা করার নমুনা সংখ্যার তুলনামূলক বিচারে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, অবনতিও হয়নি। রোগী সুস্থ হয়ে ওঠার পরিসংখ্যান বলছে এই সংখ্যা প্রায় ৫ গুণ বেড়েছে। এটা নিঃসন্দেহে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে চিকিৎসা নিশ্চিত করার কারণেই হয়েছে। তবে যেটা সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন তা হচ্ছে চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা। জুনের গোড়ায় যেখানে আইসিইউ’র জন্য হাহাকার, এখন সেখানে সারাদেশে ৫১১টি আইসিইউ প্রস্তুত যার মধ্যে খালি রয়েছে ২২৯টি। অর্থাৎ কোনও কারণে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর যদি আইসিইউ প্রয়োজন হয়, তার জন্য কোনো হাহাকার হবে না। আর একটি বিষয় গোটা বিশ্বেই যতজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে তাদের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশ এখন ক্রিটিক্যাল অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়া আমরা যদি সাধারণ হাসপাতাল শয্যার দিকে তাকাই তাতেও এই মুহূর্তে দেশে যতজন কোভিড আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন তার চেয়ে প্রায় তিনগুন বেশ হাসপাতাল শয্যা কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড করে খালি রয়েছে।

ঠিক দেড় মাসের ব্যবধানে করোনা রোগীর চিকিৎসার সক্ষমতা এভাবেই বাড়ানো হয়েছে। অক্সিজেন সিলিন্ডার এখন ১২,২৩৩টি রয়েছে। অথচ রোগী ভর্তি রয়েছে ৪,২৬১ জন। এই অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়েও সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে দিনের পর দিন। একটি শিরোনাম- করোনাকালে অক্সিজেন সিলিন্ডার যেনো সোনার হরিণ। অথচ এখন প্রয়োজনের চেয়ে তিনগুণ অক্সিজেন সিলিন্ডার জমা রাখা রয়েছে। এছাড়া অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর ১১০টি যার খুব কমই এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। এর বাইরে হাই ফ্লো ন্যাজল ক্যানোলা রয়েছে ২৭৭টি। আইসিইউতে ভর্তি রোগীর সকলকেই এই ক্যানোলা দেওয়া সম্ভব। যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, সকল রোগীর এটি প্রয়োজন হয় না।

তাহলে, করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এই ডেমোগ্রাফিগুলো অন্তত তিনটি পথে বাংলাদেশের সাফল্য তুলে ধরে, এক. ভাইরাসটির বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা, দুই ভাইরাসটিতে মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণে রেখে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা, আর তিন. এর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থায়, চিকিৎসা সামগ্রিতে সক্ষমতা বাড়ানো।

বিষয়গুলো মিডিয়ায় সেভাবে আসছে না। বেড়েছে আইসিইউ’র সক্ষমতা এই কথাটি লিখে গুগল সার্চ দিয়ে প্রথম পাতায় পাওয়া চারটি শিরোনাম-আইসিইউর জন্য হাহাকার, জুন ৬, ইনকিলাব, আইসিইউর জন্য আহাজারি, জুন ৯, মানবজমিন, করোনাভাইরাস: আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়েনি কোন চিকিৎসা সুবিধা- বিবিসি বাংলা, জুন ১৩। করোনা চিকিৎসায় সক্ষমতা বাড়ছে চট্টগ্রামে, হাসপাতালে গতকাল খালি ছিল ৩২১ বেড ও ১৭ আইসিইউ, দৈনিক আজাদী, চট্টগ্রাম।

একমাত্র দৈনিক আজাদী খবরটা এভাবে আনলো। বাকি মিডিয়াগুলোতে সেরকম কোনও খবর নেই। বরং পুরোনা হাহাকার, আহাজারিই এখনো শোভা পাচ্ছে।

এখন আমরা একটু বিদেশি উদাহরণের দিকে তাকাই। আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে- জার্মানি যখন কোভিড-১৯ এর বিস্তার মোকাবেলা করে অনেকটা সফল, তখন একটা ঘোষণা দিয়েছিলো তাদের দেশে যতজন রোগী তার চেয়ে শয্যা সংখ্যা কিংবা আইসিইউ’র সংখ্যা তিনগুণ বেশি। বিশ্ব মিডিয়ায় খবরের শিরোনাম হয়- ওভারসাপ্লাই অব হসপিটাল বেডস হেলপস জার্মানি টু ফাইট ভাইরাস। একই ধরনের শিরোনাম কি এখন বাংলাদেশের জন্য হতে পারে না। হয়তো পারে।

একটি উদাহরণ দিচ্ছি এই জার্মানিকে নিয়ে আমাদের দেশের মিডিয়াগুলোর খবর থেকেই। ১ জুলাইয়ে একটি প্রধানসারির মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরের শিরোনাম- ‘জার্মানির করোনা ব্যবস্থাপনা থেকে আমরা কী শিখতে পারি’। সেই খবরের মেজর ডিটেইলসে গিয়ে লেখা হচ্ছে- জার্মানিতে আজ অবদি ১ লাখ ৯৫ হাজার মানুষের করোনা শনাক্ত হলেও মৃত্যুর সংখ্যা ৮ হাজার ৯০০। এই হার তুলনামূলকভাবে অনেক ইউরোপীয় রাষ্ট্রের চেয়ে কম (৪ শতাংশ)। এর কারণ, সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন। করোনার উপসর্গ দেখা দিলেই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

পরিসংখ্যানটি লক্ষ্য করুন- ১ লাখ ৯৫ হাজার আক্রান্তের মধ্যে ৮ হাজার ৯০০ জনের মৃত্যু মানে হচ্ছে আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ৪.৫ শতাংশ রোগীরই মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশের সবশেষ পরিসংখ্যান বলছে- মোট মৃত্যু ২৮০১ জন। আর আক্রান্ত হয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ১১০ জন। তারমানে মারা গেছে আক্রান্ত মানুষের ১.২ শতাংশ। তার পরেও আমাদের মিডিয়াগুলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিন্দাই করে চলেছে।

হ্যাঁ নিন্দা করার মতো রয়েছে অনেক কিছুই। শাহেদ করিম, সাবরিনা রয়েছে, রিজেন্ট, জিকেজি রয়েছে। এসবের নোংরামি ভয়াবহ। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরের দুর্নীতি চরমে। সেগুলোকে হাইলাইট করতেই হবে। কিন্তু তাই বলে- সাফল্যগুলো একেবারেই সামনে আসবে না, সেটা হতে পারে না। আমাদের বোধ হয়, বিষয়গুলো নিয়ে আরেকটু ভাবা উচিত।

কোভিড-১৯ আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগগুলো, সবকিছুতে তার সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং উন্নয়নে, উন্নতকরণে সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিলো, তাতেই এসব অর্জন। সে প্রশংসা কিন্ত বিশ্বের কাছ থেকে তিনি ঠিকই পাচ্ছেন। ফোর্বস ম্যাগাজিন এ নিয়ে রিপোর্ট করছে, যা হয়তো অনূদিত হয়ে আসছে আমাদের কোনো কোনো মিডিয়ায়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম শেখ হাসিনার ভূমিকাকে ‘অ্যডমায়রবল’ বলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের প্রশংসা করছে, বিশ্বের নেতারা পাঠাচ্ছেন প্রশংসার বাণি। সবশেষ বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণ মৃত্যুহার নিয়ে দিশেহারা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান শেখ হাসিনাকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন কিভাবে তিনি মোকাবেলা করছেন এই মহামারী।

তার মানেই হচ্ছে- স্বাস্থ্যখাতের ভঙ্গুরতা এই কোভিড-১৯ আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, সেটা যেমন সত্য। নেতৃত্বের দৃঢ়তায় সে ভঙ্গুর দশার মাঝেও দেশের অর্জন কিংবা সক্ষমতা কম নয় সেটাও সত্য। মুদ্রার এ পীঠটি আমরা যেমন দেখছি, অপর পীঠটিও বোধহয় এক-আধবার উল্টে দেখা উচিত।

লেখক : শিক্ষক ও সিনিয়র সাংবাদিক

সর্বাধিক পঠিত