প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোভিডে কেন এতো প্রবাসী বাংলাদেশীর মৃত্যু?

ড. মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান: বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের একটা বড় সংখ্যা হচ্ছে শ্রমিক কিংবা অবৈধ শ্রমিক। শুধু তাই না যারা বৈধ হয়ে চাকুরী কিংবা বিজনেজ করে তারাও যে সাবাই উচ্চ মানের জীবন যাপন করে তাও ঠিক না। অনেক সময় ইচ্ছা থাকেলেও পারে না কারণ যারা বিজনেজ করে তাদের ঐ দেশের বিভিন্ন লেভেলের বাংলাদেশীদের সাথে মেলা মেশা করতে হয়। তাই সামাজিক দূরত্ব দুরের কথা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখাও কষ্টকর হয়ে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সবাই মনে করে যারাই বিদেশে থাকে তারা অনেক উচ্চ মানে জীবন যাপন করে। আসলে কথাটা ভুল। বিশেষ করে যারা শ্রমিক কিংবা অবৈধ শ্রমিক তাদের থাকা খাওয়া কোনটাই স্বাস্থ্য সম্মত হয়না, কিংবা করতে পারে না। কারণ জীবন এবং জীবীকার তাগিদে তাদের থাকতে হয় গাদাগাদি করে, খেতে হয় সস্তা খাবার, চলতে হয় কঠিন পরিশ্রম করে। আসলে বিদেশে যারা থাকে তাদের প্রায় সকলেরই একটা বড় উদ্দেশ্য থাকে আর সেটা হচ্ছে, সর্বোচ্চ আয় করা এবং সর্বোনিম্ন খরচ করা। কয়েকটা উদাহরণ দিব যা কিনা আমার প্রবাস জীবনে নিজের চোখে দেখা।

জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশীর সংখ্যা অন্য যে কোন এশিয়ার দেশের তুলনায় অনেক কম। সরকারী হিসাব মতে বর্তমানে জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশীর সংখ্যা মোট ১৫,৪৭৬জন। এদের মধ্যে চাকুরীজীবী, ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষানবিশ এবং তাদের পরিবারের সদস্য সকলেই অন্তর্ভুক্ত। জাপানে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের একটা বড় সংখ্যা হচ্ছে ছাত্র, বর্তমানে জাপানে ছাত্র ভিসায় বসবাসরত বাংলাদেশীর সংখ্যা মোট ৩,৯৪৮জন। এই ছাত্র ভিসায় থাকা অনেকে আবার থাকেন তাদের পরিবারের সদস্য নিয়ে। ছাত্র এবং তাদের পরিবারের অনেকেই কাজ করে কোন খাবার হোটেলে কিংবা কোন কারখানায় এবং থাকে কম দামি বাসায়। বিশেষ করে যারা জাপানিজ ভাষা শিক্ষা স্কুলে কিংবা ডিপ্লোমা কোর্সে পরে তারা বেশির ভাগই অবিবাহিত এবং থাকেন একসাথে কয়েকজন রুম শেয়ার করে। তাই তাদের এই কঠিন বাস্তবতার মাঝে করোনা নামক হায়েনা যদি হানা দেয় তখন নিয়তীর দোষ দেয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। যদিও আল্লাহর রহমতে জাপানে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের খুব কমই করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং কোন মৃত্যু ঘটনাও ঘটেনাই। যতটুকু জানি যে কয়েক জন আক্রান্ত হয়েছে তাদের বেশির ভাগই বসবাস করে ঘনবসতি এলাকায়।

এবার আসি আমাদের যে ভাই ও বোনেরা কাজের কিংবা বসবাসের উদ্দেশ্যে বিদেশে যায় তাদের কথায়। জাপানে অবশ্য এই ধরণের লোকের সংখ্যা খুবই কম। গত মে মাসের প্রথম দিকে একদিন দেখলাম সিঙ্গাপুরে একদিনে যত লোক করোনায় আক্রান্ত হয়েছে তার অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশী। খুবই চিন্তার বিষয়, ফোন করলাম আমার এলাকার কয়েক জনকে। তারা বলল আমরা একরুমে প্রায় ২০ জন করে থাকি, সবাই এখন বাসায় কারো কোন কাজ নাই। এই বিল্ডিং আমাদের মত আরও অনেক রুম আছে যেখানে আমাদের মত ছেলেরা থাকে এবং পাশে রুমের একজনের করোনা হয়েছে। তাই এখানে হিসাব খুবই সহজ, একজনের হলে ঐ রুমের সকলের করোনা পজেটিভ হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

এখানে আবার একটা বিষয় আছে বাংলাদেশ থেকে যে সকল শ্রমিক বিদেশে যায় তাদের বেশির ভাগই থাকেন কোম্পানির বাসায়। তাদের থাকার বাসা, কোম্পানিতে যাওয়া আসার খরচ সাধারনত ঐ কোম্পানি দিয়ে থাকে। এরা সাধারনত ৮ থেকে ১২ ঘণ্টার শিফটে কাজ করে। তাই এক রুমে থাকেলেও ছুটির দিন ছাড়া একে অপরের দেখা খুবই কম হয় । তাই এই ধরণের কোম্পানি তাদেরকে এক রুমে গাদাগাদি করে রাখে তাতে কোন সমস্যা হয় না। সাধারণ সময়ে ওদের থাকা নিয়ে কোন সমস্যা হয় না কিন্তু এই সুযোগে করোনা নামক ভাইরাস ওখানেই হানা দিয়েছে বেশি করে। আর আহত ও নিহত হচ্ছে শত শত বাংলাদেশী।

এখন বলবেন নিউইয়র্কে কেন হয়েছে? এটা তো উন্নত দেশ অনেক সাজানো গোছানো শহর এখানে কেন হবে? আপনারা হয়তো জানেন তার পরও বলি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বস্তি কিন্তু ঢাকাতে শুধু তাই না ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে, নাম তার করাইল বস্তি। গুলশান লেকের এপারে মন্ত্রীর বাসা ওপারে করাইল বস্তিতে সকিনার (ছদ্ম নাম) বাসা, দুজনেই গুলশান থাকে। পার্থক্য শুধু জীবন যাপনের ধরণ কিংবা মান। একজন মাসে ৩০ হাজার টাকা বাসার কুকুরের পেছনে খরচ করে আর একজন মাসে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ৫ জনের সংসারের সকল খরচ মিটিয়ে যাচ্ছে। ঠিক একই ঘটনা আমেরিকার নিউইয়র্কেও। আপনারা জানেন ঐ দেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের বাড়ীও নিউইয়র্কে।

এবার বলুন মানুষ কখন, কোথায় এবং কেন বেশি ঘনবসতি এলাকায় বসবাস করে? বাংলাদেশে যেমন ঢাকায়। কারণ এখানে কাজের সুযোগ বেশি। ঠিক তেমনি আমাদের মত নিম্ন আয়ের দেশের মানুষ বিদেশে বড় শহর গুলোতে বেশি ভিড় করে। কারণ খুবই সহজ, ঐ সকল বড় এবং ঘনবসতি শহরে কাজের সুযোগ বেশি তাই। অবশ্যই বাসা ভাড়াও বেশি, কিন্তু বাসা শেয়ার করার সুযোগও আছে। টোকিও, নিউইয়র্ক, প্যারিস, লন্ডনে হয়েছে ঠিক একই ঘটনা। অনেক বাংলাদেশী থাকে এবং এই বাংলাদেশীদের একটা বড় সংখ্যা কাজ করে বিভিন্ন খাবার হোটেলে, হালাল খাবারের দোকানে, বারে, কিংবা নাইট ক্লাবে যেখানে নানা শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে মেলামেশা করতে হয়। কে কিভাবে থাকে, কিভাবে চলে জানার সময় কারো নাই, সবাই থাকে দৌড়ের উপর। এদেরও থাকার বাসাটাও অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে শেয়ার হাউজে। যেখানে এক রুমে কয়েকজন ভাগাভাগী করে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই শ্রেণী পেশার মানুষ গুলোর জন্য বাসা হচ্ছে শুধু মাত্র ঘুমানোর স্থান।

ইউরোপের অবস্থা আরও খারাপ। কয়েকদিন আগে লিবিয়াতে যে ২৩ জন বাংলাদেশী মারা গেল যা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে গত কয়েক দিন। এই ভাবে পারি জমানো অবৈধ বাংলাদেশীরাই এখন ইউরোপের দেশগুলোতে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে। লিবিয়াতে মরে যাওয়া ওদের ভাগ্য খারাপ তাই তাদের ঠিকানা ইউরোপ না হয়ে, ঠিকানা হয়েছে পরপারে। এখানে আমারা দালালদের অনেকেই গালাগালি করে থাকি। তাহলে একটা সত্য ঘটনা শুনুন তার পর বলুন দালাল খারাপ না কি আপনি আমি খারাপ? আমার এক পরিচিত সে ইউরোপ যাবার জন্য দালাল ধরেছে মামলা ১৪ লক্ষ টাকার। ৫০% অগ্রিম বাকী ৫০% ইউরোপে পৌঁছানোর পরে। খেলা শুরু। দালাল তাকে প্রথমে আফ্রিকার দেশে, তারপর সেখান থেকে বিভিন্ন দেশের নদী, সাগর, বন জঙ্গলে পায়ে হেঁটে, গাড়িতে, নৌকায় ঘুরিয়েছে। এক সময় প্রায় ১৫ দিন শুধু বনে জঙ্গলে কোন প্রকার খাবার ছাড়া জঙ্গলে যা পেয়েছে তাই খেয়ে, পায়ে হেঁটে পার করেছে মাইলের পর মাইল। তাদের সাথে থাকা কয়েক জন মারাও গিয়েছে এবং কয়েক জন স্বপ্নের দেশ ইউরোপে পৌঁছে গেছে। কপালের দোষে সে মিসরের পুলিশের হাতে ধরা পরে। এভাবে তিনি সবমিলিয়ে তিন মাস সময় পার করে অবশেষে জীবন নিয়ে দেশে ফিরে এসেছে।

বলেন তো এবার ঐ লোকটির কি করা উচিৎ? কানে ধরে বিদেশ নামে ভুত মাথা থেকে নামিয়ে ফেলবে? না, তা সে করেনি। আবার ঐ দালালের কাছে গেল। কি টাকা ফেরত চাবে? না, তার কথা হল টাকা যেহেতু দিয়েছি বিদেশ আমি যাবই। আবার দালালকে দিয়ে ইউরোপে পাঠানোর সব ঠিক করা হল। আবার যাত্রা শুরু এবার ভারত হয়ে কিভাবে কিভাবে যেন তার স্বপ্নের দেশ ইউরোপ পৌঁছে গেছে। এখন সে প্যারিসে অবৈধ হিসেবে আছে কয়েক বছর পরে হয়তো শুনতে পাব সে ইউরোপের পাসপোর্ট পেয়ে গেছে এবং ভাল আছে। অবশ্যই আশা করি আমার দেশের ছেলে ভাল যেখানেই থাকুক ভাল থাকুক। একই ভাবে অনেকেই আজ লন্ডন, প্যারিস, জার্মানিতে পরিবারসহ স্থায়ী হয়ে গেছে।
এবার ভাবেন এই ভয়াবহ সময় পার করে যারা ইউরোপে পারি জমিয়েছে তারা কোন পরিবেশে বসবাস করতে পারে। এরা এক রুমে অনেকে মিলে গাদাগাদি না শুধু, মারামারি করে হলেও থাকে। ঐ দেশে অনেক কঠিন কাজ করে, দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করে বাসায় ফিরে কখন কিভাবে যে ঘুমিয়ে পরে তারা নিজেরাও জানে না। কাজ শেষে তাদের দেখার সময় থাকে না কোনটা স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, আর কোনটা পুষ্টিকর খাবার। এরাই যখন ইউরোপের দেশে গুলোতে বৈধতা পায় তখন তাদের দিন একটু ফিরে এবং কিঞ্চিৎ হলেও মানবেতর জীবন যাপন থেকে উদ্ধার পায়। তখন এরাই বাংলাদেশে এয়ারপোর্টে গিয়ে বলে I am Italian Passport ধারী। এই পাসপোর্টে জন্য অনেক মূল্যবান সময়, টাকা, শ্রম সবই তাঁকে দিতে হয়েছে। শুধু তাই না, তাদের পরিচিত জন এই সুযোগের জন্য প্রতিনিয়ত তাদের কাছে ধন্যা দেয়। কারণ ওদের কাছে ইতালির পাসপোর্ট হচ্ছে সেই লেভেলের মূল্যবান এবং স্বপ্নের জিনিস যা অর্জন করতে তাকে জীবনের অনেক বেগ পেতে হয়েছে।

আমরা যারা বিদেশে থাকি, সাইকেল চালিয়ে মাইলের পর মাইল পার করে দেই কিন্তু বাংলাদেশে গেলে প্রাইভেট গাড়ী ছাড়া চলতে পারি না। আমারা প্রবাসিরা নিজের অবস্থা পরিবারের কিংবা আশে পাশে লোকদের বুঝতে দেইনা বা বুঝাইনা। যেই কারণে আজ প্রবাসী এতো বেশি লাঞ্ছিত হচ্ছে। তবে এই বিষয়টা বেশি ঘটে তাদের জন্য যারা ইউরোপ, আমেরিকার মত উন্নত থাকে, কিন্তু অনউন্নত কাজ করে এবং নিজের ফুটানি বাংলাদেশে গিয়ে প্রকাশ করে। যারা মধ্যপ্রাচে থাকে তারাই হচ্ছে রেমিটেন্স যোদ্ধা। তারা বিদেশেও শোষিত, দেশেও বঞ্চিত। পরিবারের জন্য কাজ করে জীবন পার করে দেয়।

বিদেশে থাকা ভাই ও বোনেরা কেউ মনে কষ্ট পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেবেন। মনে রাখবেন জীবনের আগে জিবিকা নয়, নিজে আগে বাঁচতে হয়। আপনি বাঁচলে পরিবার বাঁচবে, পরিবার বাঁচলে সমাজ বাঁচবে, আর সমাজ বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আপনি বেঁচে থাকার জন্য খাবার খাচ্ছেন, খাবারের জন্য বেঁচে আছেন এরকম নয়। দেশে এবং বিদেশে সবাই ভাল থাকেন এবং সুস্থ থাকেন এই কামনায় আল্লাহ হাফেজ।

ড. মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান, টোকিও জাপান।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত