প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএমএ আমাকে বের করে দিয়েছে

ডেস্ক রিপোর্ট : জাফরুল্লাহ চৌধুরী এক অন্তরঙ্গ আলোচনা করেছিলেন। সেখানে উঠে এসেছে কোভিড পরিস্থিতি ও মোকাবিলা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অ্যান্টিবডি টেস্ট কিট, নিজের স্বপ্নসহ নানা বিষয়।

প্রশ্ন: এখন আপনার স্বাস্থ্যগত অবস্থা কী? নিউমোনিয়ার কথা শুনেছিলাম।

উত্তর : নিউমোনিয়া আছে। যৌক্তিক চিকিৎসা খুব ব্যয়বহুল না। দুর্নীতিটা ব্যয়বহুল, আত্মবিশ্বাসের অভাবটা ব্যয়বহুল। সুতরাং এটা জনসাধারণকে বোঝাতে হবে। মিডিয়ার একটা বিরাট দায়িত্ব আছে, আমার মতো ব্যক্তির দায়িত্ব আছে, জনসাধারণের দায়িত্ব আছে, সরকারের দায়িত্ব আছে।

প্রশ্ন: শুনেছি অক্সিজেন কতটা নেবেন অনেক ক্ষেত্রে আপনি নিজেই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

উত্তর : না। এরা (চিকিৎসক-নার্স) অকারণেই ভয় পাচ্ছে। এই মেশিন তো আমাকে সব বলে দিচ্ছে। আমার (অক্সিজেন) দরকার আছে কি নাই।

প্রশ্ন: আপনি কত দিন অক্সিজেন নিয়েছেন?

উত্তর : বিভিন্ন সময়ে নিতে হয়েছে। কত টাকার অক্সিজেন নিয়েছি, তার হিসাব বের করছি।

প্রশ্ন: আপনার ধারণা কত টাকার অক্সিজেন নিয়েছেন?

উত্তর : সব মিলিয়ে ৫০০ টাকা হবে।

প্রশ্ন: অক্সিজেনের দাম জানার বিষয়টা আপনার মাথায় কেন এল?

উত্তর : কারণ ‘কস্ট ইফেক্টিভ হেলথ কেয়ার’(সুলভ স্বাস্থ্যসেবা), অ্যাফোর্ডেবল হেলথ কেয়ার নিয়ে দীর্ঘদিন আমি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সংগ্রাম করছি। আমি মার্চ মাসে বলেছি, এই দেশের সমস্যা হবে অক্সিজেন সরবরাহে। তাই অক্সিজেনের অপব্যয় করতে পারি না।

প্রশ্ন: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বলা হচ্ছে অনেক মানুষ অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে বাসায় জমা করছে। মানুষের মধ্যে একটা উদ্বেগ রয়েছে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

উত্তর : মানুষ একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখতে পারে। তবে তার যথাযথ ব্যবহারটা বুঝতে হবে। যথাযথ বুঝতে হলে একটা মেশিন কিনতে হবে, আরও সস্তায় পাঁচ হাজার টাকায়ও আছে। মেশিন বলে দেবে শরীরের রক্তের সঙ্গে অক্সিজেনের যথাযথ সংমিশ্রণ আছে কি নাই। এই অক্সিজেনই আমার শ্বাস চালায়, ফুসফুস চালু রাখে—এই জ্ঞান তো তাকে দিতে হবে। তাই কথায় কথায় অক্সিজেন নিয়ে লাভ নেই। এই বিষয়গুলো আমাদের এখানে পড়ানো হয় না, আমার মেডিকেল কলেজে পড়ানো হয় না কখন অক্সিজেন দিতে হবে। কোনো ব্যক্তির স্যাচুরেশন যদি ৯২ শতাংশের কম না হয় তা হলে তার দরকার নেই, ধৈর্য ধরতে হবে।

প্রশ্ন: এ সময়ের মধ্যে কখনো তো আপনি জ্ঞান হারাননি? পুরো সময়টা সজ্ঞানে ছিলেন?

উত্তর : একসময় বোধ হয় হারিয়েছিলাম, অল্প সময়ের জন্য।

প্রশ্ন: এখন আপনার নিউমোনিয়া ছাড়া আর কি কোনো সমস্যা আছে?

উত্তর : কথা বলতে পারি না। গলাতে জীবাণু সংক্রমণের কারণে। আমি হলাম বদরাগী মানুষ, সহজে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে, রেগে যাই, রেগে গেলে গলা আরও খারাপ হয়।

প্রশ্ন: আপনার এই চিকিৎসায় বিদেশ থেকে কোনো সরঞ্জাম আনতে হয়েছে?

উত্তর : না। নিশ্চয়ই না।

প্রশ্ন: তাহলে মানুষের একটি প্রশ্ন আসবে সারা দুনিয়ায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এত ব্যয়বহুল কেন? এটা কি কম ব্যয়ে…

উত্তর : এটার অপব্যবহার। আইসিইউর দরকার আছে। আমরা এই হাসপাতালে (গণস্বাস্থ্য নগর) একটা করোনা ওয়ার্ড করতে যাচ্ছি, জেনারেল বেড উইথ আইসিইউ ফ্যাসিলিটিজ। আলাদা আইসিইউ নিতে হবে না।

প্রশ্ন: একজন কোভিড রোগী কত টাকার মধ্যে এই বেড পেতে পারেন?

উত্তর : সেটা হিসাব করিনি। তবে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দৈনিক খরচ হবে।

প্রশ্ন: তাহলে তো আমরা বেসরকারি হাসপাতালে যেমন বিল আসে শুনি তার চেয়ে কম হবে?

উত্তর : অবশ্যই।

প্রশ্ন: গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের বয়স কত?

উত্তর : অনেক হয়ে গেছে, প্রায় ৩০ বছর।

প্রশ্ন: ৩০ বছর কি এই হাসপাতাল একই নীতির ভিত্তিতে চলছে?

উত্তর : এত দিন চলেছিলাম কেবল প্রাথমিক পরিচর্যা নিয়ে। তারপরে করেছি দ্বিতীয় ধাপ। …এখন করছি চতুর্থ ধাপ (টারশিয়ারি কেয়ার)। মানে আইসিইউ ফেসালিটিস…। তবে আইসিইউ আইসিইউ করা হলো প্রতারণা। মূল কাজ হলো প্রাথমিক পরিচর্যা করা। আমাকে যেভাবে দেখেছে, প্রত্যেক রোগীকে সেভাবে দেখা। প্রত্যেক রোগীকে তার আত্মীয় মনে করা। তাকে (চিকিৎসক-নার্স) সেই ট্রেনিং দেওয়া। এখানেই আমাদের ব্যর্থতা।

প্রশ্ন: এবার যেহেতু সিঙ্গাপুরের মতো দেশে যাওয়া যাচ্ছে না, আমরা দেখছি উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা নামীদামি বেসরকারি হাসপাতাল বেছে নিচ্ছেন না, সিএমএইচকে বেছে নিচ্ছেন—এর কারণ কী?

উত্তর : একটা হলো, তারা (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) তুলনামূলক বেটার ডিসিপ্লিন্ড, বেটার ইকুইপ্ট। আমার মতে, এখানকার সবচেয়ে ভালো হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বিএসএমএমইউ প্রায় লকডাউন, এত বড় হাসপাতাল চলছে না। এর জবাবদিহি কে করবে? ক্ষতিপূরণ কে দেবে? জাতি তো দাবি করতে পারে এত বড় হাসপাতাল যে পড়ে আছে…। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের জবাবদিহি নেই।

প্রশ্ন: জেনেভা প্রোটোকল অনুসারে, যা ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন গ্রহণ করেছে যে কখন একজন চিকিৎসক রোগীকে না করতে পারেন। যখন তাঁর ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয় তখন একজন চিকিৎসক ‘না’ বলতে পারেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টা কতটা প্রযোজ্য?

উত্তর : আমিই একমাত্র বাংলাদেশি যে ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য। আমার কোনো পয়সা দিতে হয় না। তারা আমাকে সম্মানিত আজীবন সদস৵ও করেছে।

প্রশ্ন: এটা আপনার কিসের স্বীকৃতি?

উত্তর : সাহস, সত্য কথা বলার অধিকার, ন্যায় কথা সাহস করে বলতে পারি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) আমাকে বের করে দিয়েছে। কিন্তু ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন আজীবন সম্মানিত সদস্য করেছে, বিনা ফিতে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন কেন আপনার ব্যাপারে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?

উত্তর : আমি স্বাস্থ্যনীতি করার চেষ্টা করেছিলাম। ওষুধনীতি করার চেষ্টা করেছি। চিকিৎসকদের তাঁদের কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়েছি।

প্রশ্ন: সে তো অনেক আগের কথা। এরপর আর সিদ্ধান্ত বদল (রিভার্স) হয়নি?

উত্তর : না। আমাকে আর ওরা (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন) নেয়নি।

প্রশ্ন: আপনি কি আশা করেন তারা এটা রিভার্স করুক?

উত্তর : (মাথা ঝাঁকিয়ে না–সূচক ভঙ্গি)। (স্মিথ হাসি) করলে করতে পারে। করলে খুশিই হব। অখুশি হব না।

প্রশ্ন: গণস্বাস্থ্যের কিট সম্পর্কে আপনারা ইতিমধ্যে বিএসএমএমইউর কমিটির রিপোর্ট পেয়েছেন। এ রিপোর্ট সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?

উত্তর : আমরা খুশি, তারা আমাদের কাজটা করেছে। যদিও আরও ভালো হতে পারত। তবু তাদের চেষ্টাটার জন্য কৃতজ্ঞ। আমি তাদের সঙ্গে গবেষণা অব্যাহত রাখতে চাই। তাদের গবেষণায় যুক্ত রাখতে চাই। আমি উৎসাহী, চাই যে তারা থাকুক, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করুক। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব তিনটা। প্রথমত, গবেষণা করা। দ্বিতীয়ত, সেবা দেওয়া। তৃতীয়ত, জনগণের ন্যায্য চিকিৎসা দেওয়া। তারা একটা অংশ করেছে, অ্যান্টিবডিটা করেছে। তাদের এখন অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করতে হবে। আমাদের ঔষধ প্রশাসন এই সার্টিফিকেট দিলে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষত মুসলিম দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সুলভে বিজ্ঞান চর্চা করব। কারণ, অধিকাংশ মুসলিম দেশ দরিদ্র, অনুন্নত, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় পিছিয়ে। তাদের জন্য এটা বেশ সুলভ করে দেব। আমাদের দেশবাসীও পাবে, আমাদের গবেষণাও চলমান থাকবে। ঠিক যেভাবে পাকিস্তানের আবদুস সালাম বিজ্ঞান একাডেমি করেছিলেন। আমাদেরও একটা স্বপ্ন আছে বাংলাদেশে আমরা একটা বিজ্ঞান একাডেমি করব। এখানে পৃথিবীর যেখানে যেখানে বাঙালিরা আছেন তাঁদের সাহায্য নেব। অনেকেই উৎসাহ প্রকাশ করেছেন, দেশের ভেতরেও আছেন, তাঁদের নিয়ে আমরা বিজ্ঞানে নিয়োজিত থাকবে।

প্রশ্ন: অ্যান্টিবডি টেস্ট কিটের পলিসি ডিসিশন নেওয়ার একটা বিষয় আছে সরকারের এবং সেটা শুধু গণস্বাস্থ্যের জন্যই নয়, যারা যারা আমদানি করতে চায় সবার জন্য। বিশ্বের কিছু কিছু দেশ ইতিমধ্যে এটা প্রস্তুত করেছে। একই সঙ্গে যদি এটা আমদানি করার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী থাকবে?

উত্তর : পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপনায় তো তারা সে সুযোগ পেতেই পারে।

প্রশ্ন: কেউ কেউ মনে করেন যে যেহেতু বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো একটা কিট উদ্ভাবন করেছে, সে কারণে তাকে এটা বিশেষ প্রোটেকশন দেওয়ার জায়গা আছে কি না বা আমাদের স্বাস্থ্য খাতে এমন নজির আছে কি না? কোনোভাবে রাষ্ট্র বিশেষ সুযোগ দিয়েছে এমন নজির আছে কি না?

উত্তর : নিয়ম আছে যে ওষুধ আমাদের দেশে উৎপাদিত হয় সেটা আমদানি হবে না। এটা আমাদের জাতীয় ওষুধনীতির অন্যতম শর্ত। আমরা বিশেষ কিছু চাইছি না। ময়দানে দেখা হবে।

প্রশ্ন: গবেষকেরা একটা কথা বলেন, যদি বিদেশের ওষুধ (অ্যান্টিবডি কিট) আমদানি করতে হয় তাহলে সেটাও এ দেশের মানুষের ওপর কতটা কার্যকর, তা আগে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?

উত্তর : অবশ্যই। দুটো নীতি হতে পারে না। আমার ওপর (গণস্বাস্থ্যের কিট) যে নিয়মাবলি প্রযোজ্য হয়েছে, আমদানি করা প্রতিটি কিটকে তার আওতায় আনতে হবে। পরীক্ষা করতে হবে, প্রতিবেদন দিয়ে, তারপর আমদানির অনুমতি দিতে হবে। পাশাপাশি মূল্যের ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে।

প্রশ্ন: গণস্বাস্থ্যের কিট ৩০০ টাকায় দেওয়ার কথা বলছিলেন। আপনি কি ৩০০ টাকায়ই আছেন?

উত্তর : হ্যাঁ। তা-ই হবে।

প্রশ্ন: আপনি নিবন্ধন পাওয়ার কত দিনের মধ্যে এটা মানুষের সুবিধার জন্য নিশ্চিত করতে পারবেন?

উত্তর : দুই মাস। যেদিন থেকে অনুমতি পাওয়া যাবে সেদিন থেকে দুই মাস।

প্রশ্ন: প্রতিদিন কত উৎপাদন করতে পারবেন?

উত্তর : আমার লক্ষ্য এক লাখ। প্রাথমিকভাবে ১০ হাজারের বেশি পারা যাবে না।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন জোনিং (সংক্রমণ বিবেচনায় লাল, হলুদ, সবুজ এলাকা) এর সঙ্গে মিল রেখে আপনার এই কিট ব্যবস্থাপনা করা যাবে? কাদের মাধ্যমে এটা বাস্তবায়ন করতে চান?

উত্তর : আমাদের ভিত্তি হওয়া উচিত ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র। সেখানে ছোট ল্যাবরেটরি আছে। এক মাসের মধ্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে এ স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে লাগানো সম্ভব। স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ হতে হবে। দীর্ঘ হলে মানুষ চিকিৎসা সুফল পেতে বঞ্চিত হবে। এটা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। এখনো কিছু ত্বরিত কাজ আছে। এই কাজটা আমাদের ইমিডিয়েট করতে হবে।

প্রশ্ন: অ্যান্টিজেন কিটের ফলাফল কত দিনে আশা করছেন। অ্যান্টিবডির ক্ষেত্রে এক মাস সময় লেগেছে।

উত্তর : আমার ধারণা, এটারও ১৫ দিন থেকে এক মাস সময় লাগবে। হলে, দুই মাসের মধ্যে এ দুটো একত্রেই আনতে পারব।

প্রশ্ন: দীর্ঘদিন ধরে আমাদের জিডিপিতে ১ শতাংশের কম স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয়ে আসছে, যা এ অঞ্চল এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায়ও সব থেকে কম। এবার (বাজেটে) যেটা প্রস্তাব করা হয়েছে সেটা হয়তো ১ শতাংশ হবে।

উত্তর : আমার মতে, বরাদ্দ কত সেটার চেয়ে বড় কথা বরাদ্দটা যথাযথ ব্যয় হবে কি না। কেবল বরাদ্দ বাড়ালে স্বাস্থ্য খাত উন্নত হবে না। এটার যথাযথ ব্যবহার হতে হবে। যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যন্ত্রপাতি কিনতে যতটা উৎসাহী সঠিক সেবা দিতে ততটা আগ্রহী না।

প্রশ্ন: কী করণীয়, কীভাবে বদলানো যায়?

উত্তর : সবচেয়ে বড় কথা হলো হাসপাতালে চিকিৎসক রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আজকে আমি ভালো হতাম না যদি এরা (গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স) না থাকত, আমার চিকিৎসক যদি সার্বক্ষণিক আমাকে দেখাশোনা না করত।

প্রশ্ন: আপনি বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা–পরবর্তীকালেই গণস্বাস্থ্যের নামকরণ করেছেন, জমি দিয়েছেন। আজকে তাঁরই নামের একটি প্রতিষ্ঠান (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) গণস্বাস্থ্যের কিট পরীক্ষা করেছে। এ অবস্থায় আপনি কি বলবেন যে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার নানা সময় স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কথা হয়েছে, তিনি যখন লন্ডনে চিকিৎসাধীন ছিলেন তখন আপনি তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। তো সার্বিকভাবে বঙ্গবন্ধু কী চেয়েছিলেন আর আজকের বাংলাদেশে যা ঘটছে তার মধ্যে কী ব্যবধান? যদি আপনি দু-তিনটি বিষয় নির্দিষ্ট করে বলতেন।

উত্তর : উনি (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) এই দেশেই চিকিৎসা চেয়েছেন। উনি কখনো বাইরে যেতে চাননি। কিন্তু আজকে যেমন আমাকে বলেছিল বাইরে যাও, ওনাকেও বলেছে বাইরে চলেন। ১৯৭২ সালে ওনার পিত্তথলির অস্ত্রোপচার ঢাকায় হলে, তখনই আমাদের এখানে আইসিইউ হতো। কিন্তু তারা তা করেনি। তারা তাঁকে বাইরেই নিয়ে গেছে।

প্রশ্ন: তাহলে চিকিৎসকেরাই তাঁকে (বঙ্গবন্ধু) সেই পরামর্শ দিয়েছিলেন?

উত্তর : অবশ্যই। কিন্তু বঙ্গবন্ধু চাননি। একটা মজার ব্যাপার, আমি তো আওয়ামী লীগ করিনি। আমি ওনার বিরোধী দলের লোক। ওনার সঙ্গে ঝগড়া সম্পর্ক আমার। আবার স্নেহ–ভালোবাসার সম্পর্ক। তর্কবিতর্কের সম্পর্ক।

প্রশ্ন: তার ধারাবাহিকতা কি আজও আমরা দেখছি?

উত্তর : ততটা না।

প্রশ্ন: এর আগে আপনি বলেছিলেন, আপনার ক্যানসার হাসপাতাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করুন, এটা আপনার স্বপ্ন। এ সম্পর্কে বলুন।

উত্তর : দেখুন বঙ্গবন্ধু ডেকে নিয়ে গল্প করতে পারতেন, ঝগড়া করতে পারতেন, ধমক দিতে পারতেন। আমি প্রতিবাদ করতে পারতাম। উনি (বঙ্গবন্ধু) জায়গা দিয়ে আবার দখল করিয়ে দিয়েছেন। শেখ হাসিনাও আমাকে জায়গা দিয়েছেন, কিন্তু দখল পাইনি।

প্রশ্ন: সামগ্রিকভাবে বাজেট ভাবনা নিয়ে আপনার যদি কোনো কিছু বলার থাকে। কী কী করণীয়?

উত্তর : এক নম্বর হলো, আমাদের ভিত্তি হলো গ্রাম। যেখানে বৃহৎ জনগোষ্ঠী থাকে। আমার ভিত্তি হলো ইউনিয়ন হেলথ কেয়ার, যেখানে ২৪ ঘণ্টা বাতি জ্বালানোর লোক থাকে, যাতে জনগণ চিকিৎসাটা পায়। সেখানে চিকিৎসক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশ ইউরোপের মতো হবে আগামী ২০ বছরের মধ্যে। সেখানে চিকিৎসক গমগম করবে, নার্স গমগম করবে। রোগীরা সেবা পাবে, হাসিখুশি থাকবে। ভালোবেসে আমরা চিকিৎসা দেব। মূল কথা হলো চিকিৎসক থাকতে হবে। চিকিৎসকের মনে আশা-আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি করতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি রোগশয্যায় থেকেই একটা নিবন্ধ লিখেছেন, যেটা আমার হাতে আছে। আপনি হয়তো এটা চূড়ান্ত করেননি। বা চূড়ান্ত করেছেন (পাশ থেকে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর উত্তর, করেছি)। সেখানে আপনি বলেছেন, ৬৪ জেলায় স্টেট কমিশন ও গভর্নর নিয়োগ এবং ছয় মাসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু করুন। এটা একটু যদি ব্যাখ্যা করেন।

উত্তর : কেন্দ্রিকতা পাকিস্তানকে ধ্বংস করেছে। এই কেন্দ্রিকতা ঢাকার শ্বাসরুদ্ধ করেছে, যানজট সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সমস্যা করেছে। সবকিছুতে সুশাসনের পরিবর্তে সংকট চলছে। আমলারা রাজনীতিবিদদের সরিয়ে দিয়ে (ক্ষমতা) দখল করেছেন। আমলাদের বড় গুণ হলো ভোটারবিহীন নির্বাচন। তাঁদের উর্বর মস্তিষ্কের পরিকল্পনা। তাই তাঁদের কেবল বেতন বাড়ে, সিনিয়র সচিব হন, ভাতা বৃদ্ধি হয়।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন, ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু যে গভর্নর ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন সেটার লক্ষ্য ছিল বিকেন্দ্রীকরণ?

উত্তর : অবশ্যই। অনেকে জানে না; ওটার অন্যতম পরামর্শদাতা ছিলাম আমি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় বুঝিয়েছিলাম বাইরের দেশের সঙ্গে তফাত কী।

প্রশ্ন: তার মানে কি আপনি বাকশাল ব্যবস্থাকেও সমর্থন করেছিলেন?

উত্তর : না, না। ওটা বিরোধীতা করেছি। দুটো আলাদা বিষয়।

প্রশ্ন: আপনি আরও লিখেছেন ঢাকা শহরের ১০০টি ওয়ার্ডেই জেনারেল প্র্যাকটিশনার্স ও রেফারেল পদ্ধতির প্রচলন। একটু বলবেন যে এটা কী?

উত্তর : আজকে আমাদের অধিকাংশ রোগশোক সাধারণ পরামর্শ দরকারি। এটার জন্য হাসপাতালে যাওয়ার দরকার নেই। যেতে হবে একজন জেনারেল প্র্যাকটিশনার্সের কাছে। আমার নাম নিবন্ধিত থাকবে, যিনি আমাকে চিনবেন, কথা বলবেন, ওনার চেম্বার খুলে দেবেন। এটা হবে প্রথম পদক্ষেপ, এটাই হবে আধুনিক চিকিৎসা।

প্রশ্ন: আপনি বলছেন, করোনা প্রতিরোধের জন্য তৃণমূলে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিরাপত্তাবেষ্টনী, চিকিৎসক ও অন্যদের বাসস্থান—ডরমিটরি এবং ২০ শয্যার হাসপাতালের যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ব্যয়—এ জন্য আপনি ২৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন। এটা কখন সরকার করবে? কত দিন সময়ের মধ্যে এই ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব? করোনাকাল নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ দুই-তিন বছরের কথা বলেছেন। আবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এটা খণ্ডন করেছেন। করোনার এই লড়াইটা কত দিন চলবে বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর : আমার মনে হয় আবুল কালাম আজাদই সঠিক কথা বলেছেন। তাঁর অনুমান ঠিক। এ জন্যই দীর্ঘ প্রস্তুতি নিতে হবে।

প্রশ্ন: আপনি জানেন যে দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের চিকিৎসকেরাই করোনায় বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসক প্রাণ হারিয়েছেন। এ অবস্থাটা আসলে কী নির্দেশ করে?

উত্তর : একটা হলো যে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুরবস্থা, চিকিৎসকদের অজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমরা এটা অতিক্রম করব। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমাদের এই সমস্যার সমাধান হবে। আমি দেখছি, করোনা পৃথিবীতে অন্য অ্যাঙ্গেল থেকে আসছে—এটা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে একটা আওয়াজ। সমাজে ন্যায্য ব্যবস্থার দাবি।

প্রশ্ন: যখন আপনার কিডনি অকেজো হয় তখন কিডনি প্রতিস্থাপনের যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, সেটা আপনি কেন নেননি?

উত্তর : বাইরে করাব না। বিদেশে যাব না।

প্রশ্ন: আপনার কিডনিতে প্রথম সমস্যা শুরু হয় কখন?

উত্তর : বছর ছয়েক আগে।

প্রশ্ন: আপনাকে তো বিদেশি বন্ধুরাও বলেছিলেন (কিডনি প্রতিস্থাপন করতে)?

উত্তর : হ্যাঁ। আমাকে হার্ভার্ড বলেছিল, বিনা পয়সায় কিডনি প্রতিস্থাপন করে দেবে। আমি বলেছি, তুমি বাকিদের করবা? খালি আমার তো করবা। আমি বলেছি, আমি আমার দেশে চিকিৎসা করাতে চাই, চিকিৎসা উন্নত করতে চাই। সবাই যেন সুযোগটা পায়। আমরা একটি কিডনি প্রতিস্থাপন কেন্দ্র করতে যাচ্ছি। করোনা না হলে এত দিনে প্রায় শুরু হতো। কারণ, এটা এই বছরের শেষে স্যার ফজলে হাসান আবেদ প্লান্ট সেন্টারে উদ্বোধন হবে।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি একবার বলেছিলেন, আইন কাভার করে না। কিন্তু আইনে তো সংশোধন এসেছে, একেবারে ব্লাড রিলেডেট লাগবে না, নিকটাত্মীয়রাও দান (কিডনি) করতে পারেন। আপনার বয়স বেশি হয়ে গেছে, এখন আপনার জন্য প্রতিস্থাপন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে—ব্যাপারটা কি তাই?

উত্তর : এই সময়ে আর চিন্তা করিনি। কারণ, ডায়ালাইসিসে আমার কাজ চলে যায়।

প্রশ্ন: আপনার কি মনে হয় যে আপনার মানসিক জোর আছে, আপনি কিডনি প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?

উত্তর : অবশ্যই পারি।

প্রশ্ন: আপনার প্রতিষ্ঠানে যদি প্রতিস্থাপন ব্যবস্থা হয়, এখন তো আইন সংশোধন হয়েছে…

উত্তর : পুরোটা এখনো কার্যকর হয়নি। হাইকোর্টে রায় হয়েছে কিন্তু সরকার কার্যকর করেনি। হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন, যে কেউ দান করতে পারবেন। কিন্তু আইনে এটা এখনো কার্যকর হয়নি। আমি হাইকোর্টের রায় সমর্থন করছি। আমি ওটার বাদী ছিলাম।

প্রশ্ন: রাষ্ট্র কি আপিল বিভাগে গিয়েছে?

উত্তর : না। যায়নি।

প্রশ্ন: আপনার স্বপ্নের তালিকায় এখন কী কী আছে? আপনি একটি ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে চান, এই হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করতে চান…

উত্তর : একটা কার্ডিয়াক সেন্টারও করব। সেটার জন্য টাকা জোগাড় করছি। ৫০ কোটি টাকা দরকার। টাকাটা আমাকে ওঠাতে হবে।

প্রশ্ন: ডায়ালাইসিস সেন্টার কি ভালোভাবে কাজ করছে?

উত্তর : খুব ভালো করছে। এ জন্য আমরা আরও দুটো সেন্টার করছি। চট্টগ্রাম ও খুলনায়।

প্রশ্ন:আপনি বলেছেন অ্যান্টিবডি-অ্যান্টিজেন উৎপাদনের জন্য এই হাসপাতালের দাম ২০০ কোটি টাকা ধরে ব্যাংকে বন্ধক রেখে উৎপাদনের টাকা জোগাড় করবেন…টাকার সংস্থান কীভাবে হবে?

উত্তর : সব ম্যানেজ হয়ে যাবে। তবে সরকার, আমাদের এখানকার ব্যাংক ইত্যাদি বড় শ্লথগতিতে চলে। তারা সামনে এগোতে ভয় পায়।

প্রশ্ন: কোনো ব্যাংক কি টাকা দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে?

উত্তর : হ্যাঁ।

প্রশ্ন: তার মানে আপনি দুটো কিট-ই যথাসময়ে উৎপাদন করতে পারবেন। টাকার সংকট হবে না?

উত্তর : টাকার সংকট আছে। আমি এডিবি ও ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলাম। তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। অন্যদের সঙ্গেও আলোচনার জন্য প্রস্তুত আছি।

প্রশ্ন: সরকারের কাছ থেকে কিছু আশা করছেন?

উত্তর :  না। সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় আশা হলো যেটা আমি জিয়াউর রহমানকে বলেছিলাম—বাধা না দেওয়াটা হলো সরকারের সবচেয়ে বড় সাহায্য। একই জিনিস চাই শেখ হাসিনার কাছে।

সূত্র : প্রথম আলো

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত