প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] জৌলুস হারানো ফুটবল

বাদল মুস্তাফিজ: [২] ১৯৯৯’র শেষ দিকের কথা। আমার সাংবাদিকতা জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। দেশের প্রথম বেসরকারি টেরেস্ট্রিয়াল ও স্যাটেলাইট চ্যানেল- ‘একুশে টেলিভিশন’। ইন্টারভিউ বোর্ডে ডাকা হলো। যদিও তা ছিলো অনেকটা খোশগল্পের মতোই। দেশের সনামধন্য এক ব্যাক্তিত্ব আমাকে প্রশ্ন করেন- চাকরি হলে জাতীয় খেলা কাবাডির প্রসারে কি করবো? জবাবে বলেছিলাম বর্তমান বাস্তবতায় এটা অসম্ভব! উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে জানতে চাই- বিজ্ঞাপন না পেলে আপনারা কি ঘন্টার পর ঘন্টা কাবাডি স¤প্রচার করবেন? কাবাডিই যেখানে চাহিদা মতো স্পন্সর পাচ্ছে না, সেখানে এর প্রচারে কে বিজ্ঞাপন দিবে! আমার বক্তব্য ছিলো- খেলাটির প্রসারে অর্থ যেমন জরুরি তেমনই স¤প্রচারের বেলায়। সেই সাথে যে কোনো খেলার উন্নয়নে সাংগঠনিক দক্ষতাও চাই।

[৩] কথায় আছে টাকার সামনে নাকি কাঠের পুতুলও হা করে। এদেশের ফুটবলের প্রসারের জন্যও তা প্রযোজ্য। তবে কেবল অর্থাভাবেই না, আমাদের ফুটবল জৌলুস হারিয়েছে আরো অনেক কারণে।

[৪] একটা সময় ছিলো যখন মাঠে-ঘাটে এমনকি ধান খেতেও ফুটবল, কাবাডি বা ভলিবল খেলতো তরুণরা। দেশজুড়ে হতো স্কুল ফুটবল। এক স্কুল অন্য স্কুলের সাথে ফ্রেন্ডলি ম্যাচও খেলতো। ছুটির ঘন্টা বাজলেই ছেলেরা বল নিয়ে মাঠে ছুটতো। এখন আরো বড় করে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আয়োজন হচ্ছে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সেই প্রান চাঞ্চল্য নেই বললেই চলে! এর সবই দখল করেছে ক্রিকেট।

[৫] একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে দেশের খেলা পাগল দর্শক স্যাটেলাইটের যুগে প্রবেশ করে ‘৯০-এর দশকে। তখন থেকেই ফুটবলের ছন্দপতন! পাশ্চাত্য আর লাতিন ফুটবল তাদের নজর কাড়ে। আমাদের সাথে বিশ্ব ফুটবলের পার্থক্যটাও পরিস্কার হয়ে যায়। হতাশা বাড়তে শুরু করে দেশের ফুটবল নিয়ে। এর আগ পর্যন্ত অবশ্য ফুটবলারদের ব্যাক্তিগত নৈপুণ্য আর ক্লাব ফুটবলের দাপটে প্যালারিতে ছিলো উপচে পড়া দর্শক। ছিলো সমর্থকগোষ্ঠীও।

[৬] কিন্তু ১৯৯৭-এ আইসিসি ট্রফি জয়, এরপর ওয়ানডে আর টেস্ট স্ট্যাটাস পায় বাংলাদেশের ক্রিকেট। বিশ্বকাপ খেলবে লাল-সবুজের দল। সে স্বপ্ন ধারণ করে ক্রিকেটের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন দর্শকরা। ফুটবল ছেড়ে ক্রিকেট মাঠে যাওয়া শুরু। ক্রিকেটের নান্দনিকতা, রঙিন পোশাক, প্রচার-প্রচারণায় মুগ্ধ হতে থাকেন তারা।

[৭] ফুটবল জনপ্রিয়তা হারানোর পেছনে দায় আছে আমাদের অনেকের। সংগঠক, ক্লাব, পৃষ্ঠপোষক, প্রচার মাধ্যম, কেউই দায় এড়াতে পারেন না। দেশের বড় দলগুলো ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেট দল গঠনে বেশি মনযোগী হয়েছে। ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার পর থেকে করপোরেট হাউসগুলো পৃষ্ঠপোষকতার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু করে।

[৮] সেই সাথে ক্রিকেট উন্নয়নে ছিলো বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির বিপুল অংকের সহায়তা। যা ফুটবলে কল্পনাও করা যায় না। এদেশের ক্রিকেট বারবার হোঁচট খেয়েছে, অভিজ্ঞতা অর্জনের বহু সিরিজও খেলেছে। কিন্তু পিছপা হয়নি কেউ। বিভিন্ন আসর ব্যবসা সফল করতে স্পন্সর প্রতিষ্ঠান, স¤প্রচার মাধ্যম আর আইসিসির সহযোগিতা অব্যাহত আছে সব সময়। অথচ বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা ফুটবলকে এগিয়ে নিতে তেমন আগ্রহ নেই কারোরই!

[৯] অভিভাবক সংস্থা ফিফা, এমনকি সরকারেরও। সরকারি টেলিভিশন বিটিভিও অনেক টুর্নামেন্ট সরাসরি স¤প্রচার করছেনা! ফিফার সহায়তা খুবই সামান্য। সরকারি বরাদ্দও বছর জুড়ে খেলা মাঠে রাখার মতো না। তৃণমূল থেকে তরুণদের তুলে এনে দীর্ঘ মেয়াদে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্যও নেই কোনো বাজেট!

[১০] এতোকিছুর পরও কোনো কোনো ফুটবলার পাচ্ছেন লোভনীয় পারিশ্রমিক। অথচ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দর্শকদের মতো অনেক তরুণ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ফুটবল থেকে। অভিভাবকরাও সন্তানদের ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহী করে তুলছেন।

[১১] একটা সময় খেলাধুলা ছিলো কেবলই বিনোদন। খেলে আনন্দ পাওয়া ও অন্যদের আনন্দ দেয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলো। ভালোলাগা, ভালোবাসা থেকে ফুটবল খেলেছেন বেশিরভাগই। কিন্তু সময় বদলেছে। ব্যাক্তি নৈপূন্যের ফুটবল এখন টোটাল ফুটবলের যুগে। তাই দেশের ফুটবলের উন্নয়নে সবার আগে চাই অর্থ। সেজন্য পৃষ্ঠপোষকদের যেমন এগিয়ে আসতে হবে, মিডায়ারও রাখতে হবে বড় ভূমিকা। সর্বোপরি কর্মকর্তাদের যোগ্য নেতৃত্ব তো চাই-ই। তাহলেই এদেশের ফুটবল ফিরে পেতে পারে হারানো জৌলুস আর জনপ্রিয়তা। – ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত