প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অশনিসংকেত বাজছে গরিবের মনে— মরণ হবে অভাবে! উদ্বেগ একটিই— ‘আমাদের কী হবে!’

চট্টগ্রাম প্রতিদিন প্রতিবেদন : করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে চট্টগ্রামের সব স্কুল-কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। জনসমাগমের স্থানগুলো এখন নিরব। শপিংমলগুলোও বন্ধ। ফলে ব্যস্ত নগরীর চিরপরিচিত কোলাহল আর নেই। মানুষ এখন অনেকটাই ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে। সেনাবাহিনীর মাঠে নামার পর রাস্তায় আনাগোনা কমেছে মানুষের। এর সবচেয়ে খারাপ প্রভাবটুকু গিয়ে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। দিন দিন তারা উপলব্ধি করছে করোনায় নয়, বরং আয়ের অভাবে খেতে না পেয়েই মরতে হবে তাদের পরিবারকে।

সামর্থ্যবানরা কয়েক মাসের বাজার কিনে নিজের বাসাকেই রীতিমতো সুপারশপ বানিয়ে নিয়েছে। এর ফলস্বরূপ পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যার সম্পূর্ণ প্রভাব গিয়ে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর— দিন শেষে যাদের জমা থাকে না কানাকড়িও।

করোনা আতঙ্কে ব্যস্ত নগরী চট্টগ্রামের চিরপরিচিত কোলাহল হঠাৎ যেন থেমে গেছে। ক্রেতার অভাবে ক্ষুদ্র থেকে বড় সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধের পথে। গাড়ির হর্নের শব্দ আর খুব বেশি শোনা যায় না, নেই মানুষের জটলাও। নিম্ন আয়ের মানুষের সাথে কথা না বললে বোঝার উপায় নেই কতটা নিরূপায় উদ্বেগে ভরা দিন যাচ্ছে তাদের। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, করোনা ভাইরাস নিয়ে তাদের কোন চিন্তা নাই। তাদের যতো চিন্তা কেবল যাত্রী বা কাস্টমার কম হওয়া নিয়ে।

শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নগরীর সাগরিকা, পতেঙ্গা, ইপিজেড, বন্দর, রংপুর কলোনি এবং রাহাত্তারপুলসহ নগরীর শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাগুলো ঘুরে হতদরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বের দৃশ্য দেখা গেল। রাত ৮টায় নগরীর ইপিজেড এলাকা ঘুরেও পাওয়া গেল না কোন খাবার হোটেল। টং দোকানও বন্ধ।

সিএনজিচালক আলাউদ্দিন (৫০) থাকেন ইপিজেডের ভাড়াঘরে। পরিবার থাকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া। হোটেলে খেতে হয়। নানা পেশার হাজার শ্রমজীবী ‘ব্যাচেলর’ রয়েছে যারা এ এলাকায়। এদের প্রায় সকলেই হোটেলে খান— কেউ মাসিক চুক্তিতে, কেউ সাপ্তাহিক। খাবার হোটেল বন্ধ থাকায় অনেক খুঁজে একটি দোকান থেকে আধপাকা কলা ও বিস্কুট খেয়ে ক্ষুধা নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেল সিএনজিচালক আলাউদ্দিনকে। তার মতোই সাগরিকার পোশাকশ্রমিক গফুর (৩০), পাহাড়তলীর সামিউল (৩৫), রাহাওারপুলের জনি, পোশাকশ্রমিক নাজমা (২৫)— এদের সবারই একই অবস্থা।

পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উৎপল বড়ুয়া বললেন, শ্রমজীবী ব্যাচেলর যারা আছে, তারা যেন থানায় যোগাযোগ করেন। প্রয়োজনে অস্থায়ী ভিত্তিতে দু-একটি খাবার হোটেল খোলার উদ্যোগ নেবেন। তবে খাবার কিনে তা খেতে হবে বাসায়।

১০ বছর ধরে নগরীর অলিগলিতে তিন চাকার গাড়ি চালাচ্ছেন বরিশালের বাসিন্দা রিক্সাচালক সাইফুল্লাহ। তিনি বললেন, ‘১৫ বছর হলো চট্টগ্রাম থাকি। ১০ বছর ধরে রিক্সা চালাই পেটের দায়ে। কী করোনা আসলো দেশে, মানুষজন ঘর থেকে বের হয় না। আমাদেরকেও ঘর থেকে বের হতে মানা করে। ঘরে বন্দি থাকলে তো আপা আর বউ বাচ্চা নিয়ে বাঁচতে পারব না। তার ওপর রিক্সা নিয়ে বের হয়ে তো যাত্রী পাই না। সারাদিন বসে আছি, কোন মানুষজন নাই।’

রাস্তার ধারে সিএনজিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আলমগীর। তার চোখে মুখে চিন্তার ভাঁজ— যাত্রী নেই! সারাদিনে ভাড়া উঠেছে মাত্র ২০০। তা দিয়ে গাড়ির গ্যাস নেবে, নাকি নিজে খাবে, না পরিবারের জন্য কিছু কিনবে। তার সঙ্গে কথা বললে তিনি কান্নাভেজা কণ্ঠে বলতে থাকলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। করোনার জন্য সবাই ঘরে বন্দি থাকতে পারে। কিন্তু আমরা তো বড় লোক না। আমরা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষ। ঘরে বসে থাকলে এমনেও না খেয়ে মরতে হবে। বাইরে বের হলে করোনার আক্রমণে মরতে হবে। গরিব মানুষের বাঁচার স্বপ্ন দেখতে নাই।’

কোতোয়ালীর টেম্পোচালক ইব্রাহিম বললেন, ‘করোনা আতংকে সবাই ঘরবন্দি। আমরা পেটের দায়ে রাস্তায়। রাস্তায় যাত্রী নাই। গার্মেন্টস বন্ধ হলে আমাদের কী হবে! সরকার তো আমাদের খাবার ঘরে নিয়ে দেবে না।’

সদরঘাটের ফুটপাতে ছোট্ট দোকান দিয়ে বসা আবু মিয়া জানান, ‘করোনার কারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ। রাস্তাঘাটে মানুষের আনাগোনা নাই। সারদিন মিলে ১০০ টাকা বিক্রি করলাম। এই রকম চলতে থাকলে ঘরভাড়া, সংসারের খরচ কী করে চালাব সেই চিন্তায় দিন যাচ্ছে। আমাদের তো এত টাকা নাই ঘরে বসে খাওয়ার। দেশেও যেতে পারছি না। গ্রামেই বা কী করে খাব?’

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত