প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১]ঝিনাইদহ এলজিইডি অফিসের ড্রাইভার জগলু হত্যা, টাকা হাতাতে কথিত প্রেমিককে হত্যার হুকুম দেন স্ত্রী

সুজন কৈরী : [২] ঝিনাইদহ এলজিইডি অফিসের চালক হাসানুজ্জামান ওরফে জগলু হত্যার রহস্য উন্মোচন এবং এবং ঘটনায় জড়িত সকল আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- নিহতের স্ত্রী তাহমিনা পারভীন তমা, তার কথিত প্রেমিক মুরসালিন ওরফে মিশু (২৪), আলআমিন ও ড্রাইভার হোসেন আলী। তারা ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

[৩] পিবিআইর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এসআইএন্ডও) রীমা সুলতানা জানান, গত বছরের ২৮ আগস্ট যশোরের কোতয়ালীর সাতমাইল এলাকা থেকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে জগলর পুরুষের মৃতদেহ পাওয়া যায়। পরে ফেসবুকের মাধ্যমে তার পরিচয় সনাক্ত করা হয়। তিনি যশোর এলজিইডি অফিসের ড্রাইভার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ বিষয়ে নিহতের বড় ভাই বাদী হয়ে যশোরের কোতয়ালী মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

[৪] মামলার তদন্ত তদরকি কর্মকর্তা ও যশোর পিবিআইর ইউনিটের ইনচার্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, লাশ উদ্ধারের পর নিহতের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও চাকুরি সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তদন্ত শুরু করেন। একপর্যায়ে নিহতের স্ত্রী তাহমিনার সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক অবনতির বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয় এবং তাহমিনাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে জানান তাহমিনা এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেইসঙ্গে ঘটনায় জড়িত অপর আসামিদের বিষয়েও জানান। ওই তথ্যে ড্রাইভার হোসেন আলীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনিও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জব্দ করা হয় হাসানের চালানো এবং হত্যায় ব্যবহৃত প্রাইভেটকার। তাহমিনা ও হোসেনের দেয়া তথ্যে গ্রেপ্তার করা হয় বুধবার নারায়ণঞ্জ ও মিরপুরে পৃথক অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় মুরসালিন এবং আলামিনকে। তারা দুজন ঘটনার পর পরই নিজেদের বাঁচাতে গোপনে ভারতে গিয়েছিলেন।

[৫] জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, মুরসালিন ও আলামিন বৃহস্পতিবার আদালতে ঘটনা জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। তারা জানান, জগলুর স্ত্রী তাহমিনা ঢাকায় থাকতেন এবং নিজের ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ব্যবসার সূত্রে তমার সঙ্গে মুরসালিনের অনৈতিক সম্পর্ক তৈরী হয় এবং মুরসালিনের পূর্ব পরিচিত আলামিন। সেইসূত্রে তার সঙ্গেও নিহতের স্ত্রীর পরিচয় হয় এবং তারা একই বাসায় থকতেন। সম্পর্কের একপর্যায়ে স্বামীকে হত্যা করতে মুরসালিনকে অনুরোধ করেন। বিনিময়ে উত্তরায় রাজউকের দোকান বরাদ্দের জন্য মুরসালিনকে টাকা পরিশোধের নিশ্চয়তা দেন। মিশু রাজি হয় এবং হত্যাকান্ডের পরিকল্পনায় আলামিনকে সম্পৃক্ত করে। ঘটনার আগের দিন তারা হত্যাকান্ডের জন্য উবার ভাড়া করেন (নির্ধারিত ও পূর্ব পরিচিত ড্রাইভার হোসেন আলী) এবং হত্যাকান্ডের জন্য দড়ি, চাকু ও চেতনানাশক ওষুধ কেনেন। ঘটনার আগের রাতে তারা পুরানো ঢাকায় মিশুর বাসায় অবস্থান করেন এবং ঘটনার দিন ভোরে যশোরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। দুপুরে সেখানে পৌছানোর পর হোটেল জাবেরের খাবার খান এবং স্থানীয় পরিচিত নজরুল ইসলামের বাড়িতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ড্রাইভার হোসেন আলীর বাড়ি খুলনা ডুমুরিয়া এলাকায় যান। এর আগে ড্রাইভারের বাড়িতে যাওয়ার সময় জগলু ফোন দিলে স্ত্রী তাহমিনা জানান, তিনি থ্রী-পিচ ও কসমেটিকস মালামাল নিতে যশোরে এসেছে। তখন আগেই বলা কথা স্মরণ করিয়ে জগলু তার কাছে ৫০ টাকা চাইলে তাহমিনা ২০ হাজার টাকা দিতে রাজি হন। জগলু ঝিনাইদহ শামীমা ক্লিনিকের সামনে এসে তার স্ত্রীকে টাকা দিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।

[৬] ঘটনার দিন তারা ড্রাইভারসহ চারজন সন্ধ্যার পরে ঝিনাইদহের উদ্দেশ্যে গাড়ি নিয়ে রওনা করেন। রাত ১০ টার দিকে ঝিনাইদহ শামীমা ক্লিনিকের সামনে থেকে জগলুকে গাড়িতে উঠিয়ে নেয়। জগলু গাড়ির পিছনের সিটের মাঝে, তাহমিনা তার বামে এবং আলামিন ডানে বসেন। মুরসালিন গাড়ির সামনের সিটে বসেন। ঝিনাইদহ শহর পার হয়ে যশোরের দিকে যাওয়ার সময় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তাহমিনা ও আলামিন দুইদিক থেকে ভিকটিমের দুইহাত ও দুই পা চেপে ধরে রাখে। ওই সময় মুরসালিন সামনের সিট থেকে পিছনের দিকে এসে নিহতের মুখ চেপে ধরেন এবং চেতনানাশক ওষুধ মিশ্রিত তুলা ভিজিয়ে নাকে চেপে ধরেন। এতে জগলু অচেতন হয়ে যান। তখন তিনজন মিলে রশি দিয়ে জগলুর গলা পেঁচিয়ে শ^াসরোধে হত্যা করেন। গলায় রশি পেঁচিয়ে টানাটানির সময় নিহত ব্যাক্তির মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে গাড়িতে এবং তার স্ত্রীর কাপড়ে লেগে যায়। ড্রাইভার গাড়ি যশোরে দিকে চালাতে থাকেন। প্রায় ৪০ মিনিট পথ যাওয়ার পর আবার গাড়ি ঘুরিয়ে ঝিনাইদহের দিকে রওনা করেন। তারা ফাঁকা জায়গা খুজতে থাকেন। একপর্যায়ে সাতমাইল এলাকায় রাস্তার বাম দিকে গাড়ি থামায়ে তিনজন মিলে নিহতের মৃতদেহ গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে রাস্তার বামপাশের্^র ঢালে ফেলে দেয় এবং মৃত্যু নিশ্চিত করতে নিহতরে স্ত্রীর ব্যাগে রাখা ছুরি দিয়ে মুরসালিন জগলুকে জবাই করেন। এরপর ঢাকা ফেরার পথে মাওয়া ফেরী পারাপারের সময় হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত চাকু ও রক্তমাখা কাপড় নদীতে ফেলে দেন এবং তারা মুন্সিগঞ্জে মুরসালিনের খালার বাসায় উঠেন। সেখানে ড্রাইভার, আলামিন ও মুরসালিন গাড়ি ধুয়ে ফেলে এবং তাহমিনা পারভীন তার পরনে পোশাক ওই বাসায় খুলে অন্য কাপড় পরে সকলে ঢাকা চলে আসেন। পরে তমার আত্মীয় স্বজন স্বামীর মৃত্যুর বিষয়ে জানালে তাহমিনা কুষ্টিয়া গিয়ে স্বামীর দাফনে শরীক হন।
[৭] জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, চাকরিকালীন নিজের আয়ের সব টাকা স্ত্রীর কাছে রাখতেন জগলু। সেই টাকা হাতাতেই মূলত হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

সর্বাধিক পঠিত