প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১]সাগর-রুনী হত্যার তদন্ত রিপোর্ট মিডিয়ায় কীভাবে গেল: হাইকোর্ট

যুগান্তর : [২] সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনী হত্যা মামলা বাতিল চেয়ে সন্দেহভাজন আসামি মো. তানভীর রহমানের আবেদন কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এই আবেদন শুনানিতে আদালতের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ বুধবার এ আদেশ দেন।

[৩]আদেশের আগে তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা (তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন) এবং এ হত্যাকাণ্ডে তানভীর রহমানের সম্পৃক্ততা নিয়ে র‌্যাবের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার। আদালতকে তিনি বলেন, ‘এ মামলার তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা ও সন্দেহভাজন মো. তানভীর রহমানের সম্পৃক্ততা নিয়ে জানতে গত বছরের ১৪ নভেম্বর আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। সে অনুযায়ী প্রতিবেদনটি এসেছে, যা উপস্থাপন করা হল।’

[৪]এ সময় বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘এ রিপোর্ট মিডিয়ায় কীভাবে গেল? হয় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় বা তদন্ত সংস্থার কাছ থেকে এ রিপোর্ট ছুটেছে। কোর্টে উপস্থাপনের আগেই এভাবে মিডিয়ায় রিপোর্ট প্রকাশ পেলে জনমনে এক ধরনের পারসেপশন তৈরি হয়।’

[৫]তখন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার বলেন, ‘বিষয়টি কনটেমচ্যুয়াস (আদালত অবমাননাকর)। আমি সাংবাদিক ছিলাম, আমি কাউকে কোনো রিপোর্ট দেইনি। যে কারণে আমার সাংবাদিক বন্ধুদের অনেকেই আমাকে দেখতে পারেন না।’

[৬]এ পর্যায়ে বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘সাংবাদিকদের কাজই হল খবরের পেছনে ছোটা। তারা খবর সংগ্রহ করতে ছুটবেনই। আমরা তো সাংবাদিকদের কোনো দোষ দেখছি না। কিন্তু তাদের দোষ দেয় কে? হয় তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কেউ দিয়েছে, নয় অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে। এই দুই দিকের একদিক থেকেই এগুলো মিডিয়ায় আগে চলে যায়। এগুলো ঠিক না।’ এ সময় অমিত তালুকদার বলেন, ‘এভাবে রিপোর্ট প্রকাশ আদালত অবমাননার শামিল।’

বিচারক এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘সাংবাদিকরা রিপোর্ট পেলেই ছাপাবে এটাই স্বাভাবিক। যদি আপনি ওই রিপোর্টের সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনের মিল না থাকে তখন তাদের দোষারোপ করতে পারেন বা তাদের ধরতে পারেন। রিপোর্ট আদালতে দাখিলের আগেই যে সাংবাদিকদের হাতে গেছে, দোষ তো কাউকে না কাউকে স্বীকার করতেই হবে। কোনো রিপোর্ট আসার আগেই যদি তা মিডিয়াতে চলে যায় সেটা দুঃখজনক।’

[৭]এ পর্যায়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এই মামলায় শুনানি এবং আদেশ দেয়ার এখতিয়ার এই আদালতের আছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। গত ১৪ নভেম্বর আদেশের সময় এই আদালতের এখতিয়ার ছিল ফৌজদারি মামলার। এরপর এখতিয়ার বদল হয়েছে আদালতের। এখন এই আদালতের এখতিয়ার রিট মামলার। এই যুক্তিতে আদালতের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলে রাষ্ট্রপক্ষ।

তখন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক এম ইনায়েতুর রহিম অপরপক্ষের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজের কাছে আদালতের এখতিয়ারের বিষয়ে জানতে চান। তখন ফাওজিয়া করিম ফিরোজ কার্যতালিকায় থাকা বেঞ্চটি দেখিয়ে বলেন, ‘মামলাটির শুনানি ও আদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে এ আদালতের এখতিয়ার আছে।’

এরপর বেঞ্চের দুই বিচারক নিজেদের মধ্যে কিছু সময় পরামর্শ করে মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়ার আদেশ দিতে গেলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে বলেন, ‘মামলাটি আপনারা শুনতে পারেন।’ কিন্তু আদালত তার কথায় কর্ণপাত না করে আদেশ দেন।

[৮]আদেশের পর আসামির আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ সাংবাদিকদের বলেন, এখতিয়ার থাকার পরও রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তিতে আদালত মামলাটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন। আমরা প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করব এই আদালতেই মামলাটির শুনানির জন্য।

[৯]মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনী ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে তাদের ভাড়া বাসায় খুন হন। থানা পুলিশ ও ডিবির হাত ঘুরে ঘটনার দুই মাস পর র‌্যাব তদন্তের দায়িত্ব পায়। এরপর দফায় দফায় সময় নিয়েও প্রতিবেদন দিতে পারেনি। এর মধ্যে আসামি তানভীর উচ্চ আদালতে মামলা বাতিলে আবেদন করলে তার শুনানিতে র‌্যাবের তদন্ত নিয়ে গত বছর ১১ নভেম্বর হতাশা প্রকাশ করেন বিচারকরা।

পরে ১৪ নভেম্বর আদেশে হাইকোর্ট তানভীরকে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়া পর্যন্ত নিম্ন আদালতে হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়ে আদেশ দেন। পাশাপাশি মামলাটির তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা ও তানভীরের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রতিবেদন চেয়ে আদেশের জন্য রাখেন।

[১০]বুধবার উচ্চ আদালতে সাগর-রুনী হত্যা মামলার তদন্তের যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করে র‌্যাব, তাতে এই সাংবাদিক দম্পতির বাড়িতে অপরিচিত যে দুজনের ডিএনএ নমুনা পাওয়ার কথা জানিয়েছিল ২০১৭ সালে, ওই দুজনকে এখনও শনাক্ত করতে না পারার কথাই বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ডিএনএ পরীক্ষার প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী সাগরকে বাঁধার জন্য ব্যবহৃত চাদর এবং রুনীর টি-শার্ট হতে প্রাপ্ত নমুনা পরীক্ষণে প্রতীয়মান হয় উক্ত হত্যাকাণ্ডে কমপক্ষে দুইজন অপরিচিত পুরুষ জড়িত ছিল।’

[১১]আর হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন মো. তানভীর রহমানের মোবাইলের কল হিস্ট্রি তুলে ধরে তার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘হত্যাকাণ্ডের দিন অর্থাৎ ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ৮টায় সে (তানভীর রহমান) স্কুলের পিকনিকে অংশগ্রহণের নিমিত্তে পূবাইল চলে যান এবং রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টায় বাসায় ফিরে টেলিভিশনে রুনীর হত্যার ঘটনা জানতে পারেন। মোবাইল কললিস্ট অনুযায়ী হত্যার দিনে আনুমানিক সকাল ৭টা ২১ মিনিটে রুনীর ফোন থেকে তানভীরের ফোনে কল যায়, যার স্থায়িত্ব ছিল ৮ সেকেন্ড। প্রতিদিন তানভীর ও রুনীর মধ্যে একাধিকবার যোগাযোগ হলেও হত্যার দিন তানভীর রুনীকে একবারও ফোন করেনি। এমনকি রাতে হত্যার খবর জানার পরও তানভীর রুনি বা সাগরের বিষয়ে কোনো খোঁজখবর নেননি বা তাদের জানাজাসহ কোনো ধরনের ধর্মীয় কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করেনি। স্বাভাবিকভাবে আসামি তানভীর রহমানের ঘটনার পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী আচরণ খুবই সন্দেহজনক। তিনি এই ঘটনায় জড়িত নন, এ কথা এ পর্যায়ে বলা যুক্তিযুক্ত হবে না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত