প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] শাহজাহানাবাদের রওনক-রোশনাই

 ডেস্ক নিউজ: [২] ১৮৫৭ সাল। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম দেখা দেয় সিপাহি বিদ্রোহের চেহারায়। যার ধারাবাহিকতায় অবসান ঘটে কোম্পানি শাসনের। শুরু হয় ব্রিটিশরাজ। নিভে যায় মোগলদের শাসনপ্রদীপ। শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের স্নেহধন্য কবি জহির দেহলভির ওই সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থকে ইংরেজিতে ‘দাস্তান-ই-গদর: দ্য টেল অব দ্য মিউটিনি’ নামে প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন র্যানডম হাউজ ইন্ডিয়া। সিপাহি বিদ্রোহের এ অমূল্য দলিলটিকে বাংলায় প্রকাশের স্বত্ব পেয়েছে বণিক বার্তা। শানজিদ অর্ণবের রূপান্তরে ধারাবাহিক আয়োজন—

[৩] সম্রাটের প্রাসাদ দরগার কাছেই এবং পশ্চিম দিকে রয়েছে অভিজাতদের বাড়ি, দোকানপাট, স্থানীয়দের ঘরবাড়ি ও সরাইখানা। ঝরনা পর্যন্ত পথের দুই পাশে অট্টালিকা, বাড়িঘর ও দোকান। দক্ষিণ দিকে আবাসিক এলাকার পশ্চিমে মনোমুগ্ধকর একটি জলাধার আছে। এ জলাধারের মাঝে কংক্রিটের তৈরি একটি গম্বুজে ঢাকা প্লাটফর্ম রয়েছে। এ প্লাটফর্ম সবদিক থেকে উন্মুক্ত। জলাধারটি হাউজ-ই-শামসি নামে খ্যাত এবং এটি তৈরি করেছিলেন বাদশাহ শামসুদ্দিন আলতামাশ।

[৪] একটি বিখ্যাত কিংবদন্তি অনুসারে, বাদশাহ শামসুদ্দিন আলতামাশ একবার মহানবী (সা.)কে স্বপ্নে দেখেছিলেন। আলতামাশ স্বপ্নে নবীজিকে একটা ঘোড়ার পিঠে ঠিক জলাধারের জায়গাটিতে দেখেছিলেন।

[৫] নবী (সা.) বলেন, ‘শামসুদ্দিন এখানে একটা জলাধার খনন করো।’

[৬] এরপর বাদশাহ শামসুদ্দিন আলতামাশের ঘুম ভেঙে যায় এবং তিনি জলাধারের স্থানে গিয়ে দেখেন, সেখানে ঘোড়ার খুরের ছাপ। তিনি তত্ক্ষণাৎ সেখানে প্লাটফর্মটি নির্মাণ করার আদেশ দেন এবং সেটি ঘিরে জলাধার খনন করা হয়।

[৭] পর্বত থেকে বৃষ্টির পানি নেমে এসে দীঘিটাকে সবসময় পূর্ণ রাখে। পূর্ব দিকে একটা বাঁধ আছে। এর পাড়ে অট্টালিকা, বাড়ি ও দোকান আছে। দোকানগুলোর কাছে একটা গর্ত আর দীঘির দক্ষিণ দিকে আছে বিখ্যাত আমরিও কা আন্ধেরি বাগ বা আমের বাগান।

[৮] বাজারের শেষ মাথায় আরেকটি গর্ত। এর গভীরতা দশ গজ। এখানেই ঝরনাটি তৈরি করা হয়েছে।  ঝরনাটি রাস্তার নিচে এবং দীঘির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। ঝরনায় যেখানে পানি পড়ে, সেখানে একটি দেয়াল নির্মিত হয়েছে। এর উভয় দিকে আছে লাল বেলে পাথরের সিঁড়িসহ দালান। এ দালানের সামনে একজন মানুষের উচ্চতার চেয়ে বেশি গভীর জলাধার ছিল।

[৯] ঝরনার চত্বরে একটা প্রশস্ত প্লাটফর্ম আছে এবং জলাধারটি থেকে একটা পানির নালা বেরিয়ে এসেছে। নালা থেকে কতগুলো ঝরনা বয়ে গিয়ে প্লাটফর্ম থেকে ঝরে পড়ছে। প্লাটফর্মের সামনে আছে একটা ঢালু পাথর, যেটা একসময় পাহাড়ের অংশ ছিল। এর পেছনে আছে একটি সিঁড়ি। মানুষ এ পাহাড়ে উঠে ঢাল বেয়ে পিছলে নেমে মজা করে। পাহাড়টিকে ডাকা হয় ফিসালনা পাত্থর বা পিছলানো পাথর। পাথরটা এত পিচ্ছিল যে, সবাই এতে পিছল খায়।

[১০] ঝরনার দালানের দুই পাশে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে খিলানসহ দুটি হলঘর রয়েছে। এসব দালানের পাশে ছায়া দেয়া আমগাছ আছে। দীঘির পানির প্রবাহে ঝরনার জলাধার উপচে যায়। এখান থেকে পানি ঢালুপথে জলপ্রপাতের মতো প্রবাহিত হয়ে খালে পড়ে এবং এ দৃশ্য বড় মনোমুগ্ধকর।

[১১] সায়র-ই-গুলশান ফারোশানের সময় যে মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তা দেখার মতো। হাজারো মানুষ দালানের ওপর থেকে দীঘিতে লাফিয়ে পড়ে সাঁতার কাটে। তারা বারবার একইভাবে ঝাঁপ দিতে থাকে। এই লাফ দেয়ার ব্যাপারটা সবসময় চলে, মানুষের স্রোত থামে না। অনেক ব্যায়ামবীর আছেন, যারা পাঁচজন মানুষকে জড়িয়ে ধরে লাফ দেন! হাজার হাজার মানুষ পিচ্ছিল পাথর থেকে পিছলে নামে।

[১২] ঝরনার দালানগুলোর কাছে ফুল বিক্রেতারা ভিড় জমান। তারা ফুল থেকে তৈরি পাখা বিক্রি করেন। এখানে ছিল প্রচণ্ড শোরগোল, কানে তালা লাগার মতো অবস্থা। হাঁটার জন্য একটু জায়গা পাওয়াও কঠিন ছিল।

[১৩ ] সাওয়ান (শ্রাবণ) মাসে বা মৌসুমি বায়ুর কালে মেলা বসত। তখন ভক্তদের তরফ থেকে দরগায় পাঙ্খা (পাখা) দেয়া হতো। মেলা চলত চারদিন ধরে। শহরের (শাহজাহানাবাদ) প্রায় সব মানুষ হিন্দু, মুসলমান, ধনী, গরিব, অভিজাত, সাধারণ—সবাই শহর ছেড়ে মেলায় আসত। শুধু দু-একটা দোকান খোলা থাকত। মিষ্টি, রুটি, কাবাবের কারিগররা দরগার আশপাশে অস্থায়ী দোকান তৈরি করতেন।

[১৪] মিষ্টির দোকানে বিরাট ভিড় জমত। ষোলো গজ জায়গাজুড়ে বর্গাকার এ দোকানে বড় বড় কড়াইয়ে ঘি চড়ানো হতো। এসব কড়াইয়ে মিষ্টি ও মসলাদার জলখাবার তৈরি হতো। বাজারে যাওয়ার রাস্তায় হকাররা তাদের পণ্য বিক্রি করতেন।

[১৫] এ সময় বাড়ি ভাড়া হাজার গুণ বেড়ে যেত। বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প ও তাঁবু তৈরি হতো। শহরের মানুষের বিনোদনের জন্য রাত-দিন এখানে নাচ, গান ও অন্যান্য উৎসব অনুষ্ঠিত হতো। আন্ধেরি বাগে দোলনা স্থাপন করা হতো। নারী-পুরুষ সবাই সে দোলনায় চড়ে আনন্দ নিত। মালহার সংগীতের সুর বাতাসে ভেসে আসত (মালহার হলো বৃষ্টিসংক্রান্ত রাগ)। পাহাড় আর বন তখন সবুজ, আকাশে জমে থাকত মেঘ। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামে, এ অভিজ্ঞতা কখনো ভোলার নয়।

[১৬] পাঙ্খা শোভাযাত্রা শুরু হতো বেলা দুইটায়, ঝরনা থেকে। পাঙ্খা হাতে সাধারণ মানুষ ও কারিগররা এ শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দিত। আর শেষের দিকে থাকতেন পাঙ্খা বিক্রেতারা। অবিশ্বাস্য ভিড় হতো এ শোভাযাত্রায়। একবার কেউ পড়ে গেলে তাকে বেশকিছু দূর পদদলিত হয়ে যেতে হতো। রোশান চৌকি নামে একটা বাদ্যযন্ত্র ছিল, নাফিরিওয়ালারা মিষ্টিকণ্ঠে মালহার গায়, সবাই সে সুরে আবেশিত হয়ে পড়ে। এ সংগীত নিজেকে ভুলিয়ে দেয়। মানুষ তখন উল্লাসধ্বনি প্রকাশ করে এবং হাত নাড়ায়।

[১৭] রাস্তার পাশের বাড়ি ও অট্টালিকাগুলো থেকে হাজার হাজার রুপি বৃষ্টির মতো ছিটানো হতো।  নাফিরিওয়ালারা এ সময় যে রোজগার করতেন, তা দিয়েই তাদের সারা বছর চলে যেত। তারা প্রত্যেক বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে গাইতেন। তখন রাত নয়টা, পাঙ্খা ততক্ষণে দরগায় পৌঁছে গেছে। নাফিরিওয়ালা তখন থেকে সম্রাটের প্রাসাদের তলায় ভেরি বাজাতেন। জানালা থেকে স্বর্ণমুদ্রা, টাকার থলি আর টাকা বৃষ্টির মতো নেমে আসত। এরপর তারা পাঙ্খা নিয়ে দরগায় নিবেদন করত।

[১৮] পরের দিনও সেখানে মানুষের ভিড় থাকত। তখন তারা মেলার নানা বিনোদন উপভোগ করত।  কেউ ঝরনায় যেত আর কেউ বেচাকেনায় ব্যস্ত থাকত।

[১৯] দরগার ফটকে একটা নতুন বাজার চালু হয়। সেখানে সব ধরনের সোনা-রুপার অলঙ্কার পাওয়া যেত। হকাররাও অনেক ছোট ছোট দোকান দিতেন এবং লাখ লাখ টাকার জিনিসপত্র বেচাকেনা হতো।  তখনকার কয়েক দিনে শাহজাহানাবাদের বাজারে একজন মানুষেরও দেখা পাওয়া যেত না। যে নারীরা পর্দার ভেতরে থাকতেন, তারা এ সময় বাজার এলাকা ঘুরে দেখতেন ও জামা মসজিদে যেতেন।

[২০] শনিবার মানুষজন খাজা সাহেবের (হজরত নিজামুদ্দিনের দরগাহ) কাছ থেকে বিদায় নিত এবং যার যার বাড়ি ফিরত। সাত কোশ পথ ফিরতি পথিকদের দিয়ে পূর্ণ হয়ে যেত।  এ সময় রাস্তার পাশে খেলনা বিক্রেতারা তাদের পসরা সাজিয়ে বসতেন। ফিরতি ভক্তরা বাড়িতে থাকা পরিবারের সদস্যদের জন্য কিছু না কিছু উপহার কিনে নিতেন এসব দোকান থেকে। বর্ষার পুরো চার মাস হজরত বাদশাহ এ এলাকায় অবস্থান করতেন। সম্পাদনা: জেরিন আহমেদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত