প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

যুগান্তর : মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্য মূল্য ঊর্ধ্বমুখী, মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য হ্রাস, চীন ও ভারতসহ বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস থেকে মূলত এ শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।

এ নিয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তবে বিশ্ববাজারে নতুন বছরে জ্বালানি তেল ও কৃষিপণ্যের দাম বাড়বে না এমন পূর্বাভাসকে নিয়ামক ধরে নিচ্ছে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের পণ্য আমদানির সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে চীন ও ভারত। এ দুই দেশের মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। চলতি অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার নির্ধারণ করা হয় সাড়ে পাঁচ শতাংশ। শেষ পর্যন্ত এ লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে মূল্যস্ফীতি ধরে রাখা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক এমকে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজ ও চালসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এটি মূল্যস্ফীতিকে আরও প্রভাবিত করবে।

তিনি আরও বলেন, চীন ও ভারত হচ্ছে আমাদের আমদানিকৃত পণ্যের বড় বাজার। ওই দুটি বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে এখানে প্রভাব পড়বে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র হচ্ছে মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতির বহির্ভূত ক্ষেত্রগুলো অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে।

এই মুহূর্তে পণ্য বিতরণ ব্যবস্থা ও আমদানি স্বাভাবিক রাখতে হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাধা দূর করতে হবে। বাজারকে ঠিকমতো কাজ করতে দিতে হবে। প্রয়োজনে বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ।

সূত্র মতে, সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত অর্থনৈতিক কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের উপস্থিতিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি নিয়ে আলোচনা হয়। এতে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে বলা হয়, এই মুহূর্তে এশিয়াসহ বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর মূল্যস্ফীতির প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর মধ্যে চীনের মূল্যস্ফীতি ২০২০ সালে ২ দশমিক ৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। যা চলতি বছর হচ্ছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

এছাড়া ভারতের মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করা হয় ৪ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৯ সালে ভারতের মূল্যস্ফীতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। একইভাবে এশিয়ার মূল্যস্ফীতি নির্ধারণ করা হয় ৩ শতাংশ, চলতি বছরে এই হার হচ্ছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ইউরোপ অঞ্চলের মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়।

পাশাপাশি উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতেও মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী গতি বিরাজ করবে। সেখানে আরও বলা হয়, নতুন বছরে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব দেশে এসে পড়বে।

জানা গেছে, বর্তমান বাংলাদেশ বছরের মোট আমদানির চাহিদার ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ পণ্য আসে চীন থেকে। আর খাদ্যপণ্যের একটি বড় অংশ আমদানি করা হচ্ছে ভারত থেকে। মোট চাহিদার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ আমদানি করা হয় ভারত থেকে। টাকার অঙ্কে বছরে প্রায় সোয়া এক লাখ কোটি টাকার পণ্য আসছে চীন এবং প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার পণ্য আসছে ভারত থেকে।

এজন্য ভারত ও চীনের পণ্যের দাম বাড়লে বাড়তি মূল্য দিয়ে বাংলাদেশকেও আমদানি করতে হবে। এতে দেশের স্থানীয় বাজারে এ দুটি দেশের পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। যা মূল্যস্ফীতির হার আরও এক দফা বাড়িয়ে দেবে।

সূত্র মতে, অর্থনৈতিক কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল বৈঠকে বিশ্ববাজারের পণ্যের পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়বে। চলতি বছরে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ কমলেও আগামী বছরে এ পণ্যের মূল্য দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়বে। এছাড়া মূল্যবান খনিজসম্পদের মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

নতুন বছরে আড়াই শতাংশ পর্যন্ত এর দাম বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি স্বর্ণের দামও ১ দশমিক ৯ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী বিরাজ করবে। এ বছরও স্বর্ণের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থা ছিল। ওই বৈঠকে ধারণা করা হয় বিশ্ববাজারে নতুন বছরে জ্বালানি তেলে মূল্য ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং কৃষিপণ্য ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান কমে যাওয়ায় খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী বিরাজ করছে বলে কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল বৈঠকে তুলে ধরা হয়। কারণ প্রতি বছর আমদানি খাতে ৫ হাজার ৭৫৫ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এখানে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে পণ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এটাও মূল্যস্ফীতির একটি কারণ। প্রসঙ্গত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী গত সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি হয়েছে।

পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি হয় ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আগের বছরে এই সময়ে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ২০২০ সালে উন্নত, উন্নয়নশীল ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হবে। আর দেশের ভেতর খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে চাপের মুখে রয়েছে মূল্যস্ফীতি।

এদিকে সম্প্রতি পেঁয়াজ ও চালের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবির হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে সরু চালের মূল্য ৮.৯১ শতাংশ, মাঝারি চাল ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ ও মোটা চালের দাম ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজের মূল্য বেড়েছে ৫৩৬ শতাংশ। অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়েছে।

এসব পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি চলতি অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে কিছুটা স্বস্তির খবর হচ্ছে আউশ ধানের উৎপাদন বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ, আমন শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ও বোরো ধান বেড়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। এই উৎপাদন বৃদ্ধির প্রবণতা থেকে চলতি অর্থবছরে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ কোটি ৮৭ লাখ মেট্রিক টন।

এর মধ্যে আউশের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ২৯ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন, আমনের ১ কোটি ৫৩ লাখ টন ও বোরোর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ কোটি ৪ লাখ টন। পর্যাপ্ত উৎপাদন হওয়ায় চালের বাজার স্থিতিশীল থাকবে। এটি মূল্যস্ফীতির নিয়ামক হিসাবে কাজ করবে বলে আশা করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত