প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আপনার বিশ্বাস ও কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে জীবনের পূর্ণতা কোথায়, আপনি কোন দলে?

রাশিদ রিয়াজ : এমনিতে আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবনে নিজেদের সুখ শান্তির খোঁজের প্রচেষ্টায় সময় চলে যায়। অতীতের দিকে তাকালে মনে হয় এইত সেদিন চাকরি শুরু করলাম, বিয়ে হল এরপর সন্তান-সন্ততি তারপর তাদের লালন পালন আর মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তোলার পরিশ্রম। এসবের ফাঁকে পুনরুত্থান বা কিয়ামত সময়কার অবস্থা, আল্লাহর কিছু মহা-অনুগ্রহ বা নেয়ামত, বিচার-দিবসে মানুষের দুই বিপরীত বৈশিষ্টে ভাগ হওয়া, একত্ববাদের নানা নিদর্শন, মহান আল্লাহর অশেষ শক্তিমত্তা ও ক্ষমতা, নবী-রাসুলদের দায়িত্ব এবং মানুষকে সুপথ দেখানোর ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকার সীমাবদ্ধতা নিয়ে চিন্তা করার সময় খুব অল্পই পাই আমরা। কিন্তু বহতা নদীর মত জীবনে কখন যে সূর্য ওঠে আর অস্ত যায়, প্রতিদিন পার হয়ে যায়, রাতের পর আরেক দিন আসে টেরই পাই না। খেয়াল করলে দেখবেন পবিত্র কুরআনের সুরা গ্বাশিয়ায় এর চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন আল্লাহতালাহ। আরবি গ্বাশিয়া শব্দের অর্থ আচ্ছন্নকারী বা যা ঢেকে রাখে। কিয়ামতর ক্ষেত্রে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ সেদিনের ভয়ানক নানা ঘটনার মধ্যে মানুষ ও স্থানসহ অন্য সব কিছু ঢাকা পড়বে।

কিয়ামতে কাফেরদের অবস্থা এবং ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের অবস্থার কিছু তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই সুরায়। সেদিন একদল হবে মহাত্রাস ও আতঙ্কে হতচকিত ও লাঞ্ছিত। এসব কথা শুনে আমরা অনেক সময় ভয় পেয়ে যাই অথবা তাচ্ছিল্যে সাথে দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা মেটাতে আরো অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি। কিন্তু চাইলেই তা ভুলে থাকা যায়। যা অনিবার্য ভবিষ্যৎ আমরা তো ইচ্ছে কিংবা অনিচ্ছের মধ্যে দিয়ে সেই দিনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি যেদিন মহা-আতঙ্ক ও মহা-অপমান তাদের সমস্ত অস্তিত্বকে এমনভাবে গ্রাস করবে যে তাদের চেহারাতেও তা স্পষ্ট হবে। একবার ভাবুন আমরা তো তাদের দলে পড়ে যাচ্ছি কি না।

এরা পৃথিবীতে কত ব্যাপক শ্রম ও প্রচেষ্টায় মেতে ছিল। কিন্তু সেদিন তা তাদের কোনো কাজেই আসবে না। ওইসব তৎপরতা কাফেরদের জন্য ক্লান্তি ও গ্লানি ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনবে না। কারণ তাদের বিশ্বাস ও কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না এবং কোনো সৎকর্মও তাদের না থাকায় সেদিন তাদের অবস্থা হবে পণ্ডশ্রমে লিপ্ত ক্লান্ত-শ্রান্ত-বিধ্বস্ত সর্বহারাদের মত। অবশেষে এরা প্রবেশ করবে জাহান্নামে। পৃথিবীর সাধারণ আগুনের চেয়ে কোটি কোটি গুণ বেশি উত্তপ্ত আগুনে তারা দগ্ধ হবে, কিন্তু তবুও তাদের মৃত্যু ঘটবে না। সেখানে তাদের বার বার নতুন চামড়া গজাতে থাকবে যাতে আগুনে পোড়ার কষ্ট সর্বোচ্চ মাত্রায় তারা ভোগ করে। এরপর তৃষ্ণার্ত এই অপরাধীদেরকে পান করার জন্য দেয়া হবে অত্যন্ত ভয়ানক মাত্রার তাপে উত্তপ্ত ফুটন্ত পানি।

সুরা গ্বাশিয়ার পঞ্চম ও ষষ্ঠ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
‘তাদেরকে ফুটন্ত নহর থেকে পান করানো হবে। এটা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং ক্ষুধাও মেটাবে না। কাঁটাপূর্ণ ঝাড় ছাড়া তাদের জন্যে কোন খাদ্য নেই।’-

– জুলুম করে ও অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করে যারা নানা রকম মজাদার খাবার খেয়েছে এবং যাদের কারণে বঞ্চিত ও দরিদ্ররা খেতে পায়নি কোনো সুস্বাদু খাবার- এমন জালিম ও কাফেররা সুরা গ্বাশিয়ায় বর্ণিত এ ধরনের কঠোর শাস্তি পাবারই উপযুক্ত। এদের কারণেই সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। আর বৈষম্য আরো কয়েকগুণ অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, মানুষ অপরাধে বাধ্য হয়েছে।

অথচ কিয়ামতের দিন কাফের ও জালেমদের বিপরীতে অন্য এক দলের চেহারা হবে প্রফুল্ল ও সতেজ। সৎকর্মশীল ও একত্ববাদীরা তাদের সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার ফলকে বেহেশত অর্জনের মধ্যে দেখতে পেয়ে সর্বোচ্চ মাত্রায় খুশি হবে। অন্য কথায় তারা অনেক বেশি পুরস্কার পাওয়ার কারণে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হবে। মহান আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ করে সৎকাজের তুলনায় দশগুণ বা আরও অনেক গুণ বেশি পুরস্কার দিয়ে থাকেন। সেখানে অর্থাৎ বেহেশতে থাকবে না কোনো অসার কথাবার্তা। যে দুনিয়ার জীবনে কষ্টকর ও অর্থহীন কথা কতই না অশান্তি জন্ম দিয়েছে, মানুষের সমাজ-জীবনের একটা বড় অশান্তির উৎসই হল নোংরা ও অর্থহীন কথা! সুরা গ্বাশিয়ায় তাই মুমিন, সৎকর্মশীল ও বেহেশতিদের সুসংবাদ দিয়ে বলা হচ্ছে: তারা থাকবে, সুউচ্চ জান্নাতে। তথায় শুনবে না কোন অসার কথাবার্তা।

সুরা গ্বাশিয়ায় মহান আল্লাহর নিদর্শন ও নেয়ামত হিসেবে আকাশ ও জমিনের অনেক কিছুর কথা বলা হয়েছে। যেমন, আলোর উৎস আকাশ, নানা ধরনের খাবারের উৎস ভূমি, প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতীক সুউচ্চ পাহাড়-পর্বত এবং অত্যন্ত উপকারী চতুস্পদ জন্তু উট যা মানুষের কর্তৃত্বাধীন। এতসব নেয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য মানুষের কি উচিত নয় মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া? যিনি আমাদের এত কিছু দিলেন তাঁকে চেনা ও তার বিধান মেনে চলা কি উচিত নয়? আর এই যে আল্লাহর এতসব সৃষ্টি এসব কি অনর্থক সৃষ্টি করেছেন তিনি? সুরা গ্বাশিয়ায় মহান আল্লাহ বলেন:

তারা কি উটের দিকে লক্ষ্য করে না যে তা কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে?

এবং আকাশের দিকে লক্ষ্য করে না যে তা কিভাবে উঁচু করা হয়েছে?

এবং পাহাড়ের দিকে তাকায় না যে তা কিভাবে স্থাপন করা হয়েছে?

এবং পৃথিবীর দিকে তাকায় না যে তা কিভাবে সমতলভাবে বিছানো হয়েছে?

অতএব, হে নবী! আপনি উপদেশ দিন, আপনি তো কেবল একজন উপদেশদাতা, –

অর্থাৎ এইসব নেয়ামতের আলোকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা ও তাদেরকে আল্লাহমুখী হতে উৎসাহ দেয়া মহানবীর অন্যতম (সা) কর্তব্য।

মানুষকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করা তথা আল্লাহমুখী করা নবী-রাসুলের দায়িত্ব হলেও মানুষ যদি নিজেই মহান আল্লাহর দিকে আগ্রহী হয় তবে তা মানুষকে পূর্ণতার দিকে আগেই এগিয়ে রাখে। তাই মহানবী (সা)-কে এটা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে আপনি মানুষের ওপর কর্তৃত্বশীল নন। অন্য কথায় মহানবী মানুষকে জোর করে ঈমানের পথে আনতে পারেন না। কেউ এভাবে ঈমান আনলেও তার কোনো মূল্য নেই।

এ সুরার শেষাংশে কাফের বা অবিশ্বাসীদের সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে:

নিশ্চয়ই তাদের প্রত্যাবর্তন আমারই কাছে, অতঃপর তাদের হিসাব-নিকাশ আমারই হাতে।

একবার ভাবুন ছোটবেলায় আপনার প্রিয় খেলনার কথাটি। কেউ তাতে হাত দিলে আপনি তাকে ধমকে তার পিলে চমকে দিতে চাইতেন হয়ত। অথচ কখন যে আপনার শৈশব আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে কিংবা আপনার কাছে সেই প্রিয় খেলনাটি হয়ত মূল্যহীন মনে হওয়ায় তা ছোট ভাই-বোন কিংবা অন্য কাউকে দিয়ে দিয়েছেন তাও মনে নেই। জীবন হচ্ছে শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌরত্ব বা হয়ত আরো কিছু সময়ের সমষ্টি মাত্র। এই নিয়ে এত অহংকার আমাদের সাজে কি?

সর্বাধিক পঠিত