প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিনির্মাণে নারীর নিয়ন্ত্রণ

মোশফেকা আলম ক্যামেলিয়া :  কাঠামোর ঘেরাটোপে কোন মানুষই নিজের ইচ্ছেস্বাধীন চলতে পারে না। পারা যায়ও না। তবে প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সমাজে চলতে গেলে বিশৃঙ্খলাও তো কেবল বাড়বে। পরের নিরাপত্তা না দিয়ে নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবাটা হাস্যকর। এখন শৃঙ্খলা রক্ষার নামে পরিবার, সমাজ আর রাষ্ট্র বলে যে সংগঠনের জন্ম হলো, তাতে বিশৃঙ্খলা এতো বেশি কেন? জগত জোড়া চারপাশে কী চলছে? শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছের প্রাধান্য দেয়ার মাঝেই যে এতো দ্বন্দ্ব, তা ক্ষমতাচর্চাকারীরা কী বোঝেন না? মাত্র ষোলো বছরের সুইডেনের এক মেয়ে, গ্রেটা থানবার্গ, অতশত না বুঝেও বুঝতে পারে সভ্যতার নামে পাগলপাড়া ছুটতে থাকার, মানুষের স্বেচ্ছাচারী ইচ্ছের প্রাধান্য দিতেই প্রকৃতিতে নিঃসীম শূণ্যতা সৃষ্টি হচ্ছে। যার চাপ নিতে হবে গ্রেটা বা তার পরের প্রজন্মকেই। এই যে সভ্যতা বলে আমরা এক শব্দ যে ব্যবহার করি তার ধারক বাহক কারা? আজ আফ্রিকা বর্বরের দেশ আর সারা পৃথিবীতে রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়ার কলকাঠি নাড়া আমেরিকা প্রভু, এ ডিসকোর্সের জন্ম কে দিলো?

ধান ভানতে যদিও শিবের গীত গাইছি। সংস্কৃতি রাজনীতি পরিচালনা ও লাঞ্চিতকরণে ভুমিকা রাখে বৌদ্ধিক ও নিরাপত্তাদানকারী সংগঠন। তা এতোদিনে আর অজানা নাই কারও। নির্মাণের প্রয়োজনে আসে ধ্বংস, পুরনো ধ্যান ধারণার। জ্যাক দেরিদার কাছ থেকে ধার করে বিনির্মাণ শব্দটা ব্যবহার করতে পারি। আমার পর্যবেক্ষণে, বিনির্মাণ গতিশীল। এক বিশ্বাসের নির্মাণ আরেক বিশ্বাস দিয়ে ধীরে ধীরে পথ বদলায়। আদি যুগে প্রজননে পুরুষের ভুমিকা বুঝতে ব্যর্থ মানব সমাজ নারীর প্রতি ছিলো সম্মোহিত, দেবীত্বের আসনে বসিয়ে গোত্র বাড়াবার অবলম্বন হিসেবে প্রজনন ছিল পরম আকাঙ্খার। পবিত্রতার ধ্যান ধারণা সৃষ্টি করে নারী লিঙ্গকে পূজণীয় মনে করতো।

আজও গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ঝাড়ফুঁকে কড়ির ব্যবহার দেখি যা নারীলিঙ্গের প্রতীক, পুরুষতান্ত্রিক আধ্যাত্মিক গুরুরা যা হয়তো জানেনই না। সেই পরম পূজণীয় লিঙ্গের পূজায় নারী লিঙ্গ বাদ দিয়ে পুরুষ লিঙ্গ কবে স্থান পেলো তার অনুমাণ কেবল করতে পারি ফ্যালিক স্থাপত্যগুলোর বয়স নির্ধারণ করে। লিঙ্গের শ্রেষ্ঠতা অস্বীকার করার উপায় নেই প্রজন্ম ধারণে। কিন্তু আদি বা আধুনিক পূজণীয় ভাবধারায় একক লিঙ্গের পবিত্র ভাববার মানসিকতায় আমার আপত্তি আছে? দুই ই প্রাণ সৃষ্টির উৎস, শুধুমাত্র একটি বা একের বিকল্প কী করে আরেকটি হয়? আর একটি কথা আমাদের ক্রমাগত ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে, প্রাণ সৃষ্টির উপাদানে পুরুষ ভূমিকায় থাকলেও নারীর ভূমিকা কেবল সৃষ্টি রহস্যেই নেই, তা ধারণ করা ও প্রাণের আগমন কাল অবধি বিস্তৃত। তাহলে শ্রেষ্ঠতার আসনে বসা উচিৎ কার?

রাজনীতিতে ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ বলে এক টার্ম আছে। এরিষ্টটল, মার্সিলিও, বোদা বা আধুনিক মন্টেষ্কুও রাষ্ট্র পরিচালণার স্বাভাবিকত্ব আনতে এই টার্মের কথা বলেছে। কিন্তু প্রায়োগিক জীবনে দেখা গেল, পূর্ণ ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ কখনও সম্ভব না, নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য দিয়ে সরকারের বিভাগগুলো কাজ করলে রাষ্ট্রে কিছু হলেও সুস্থিরতা ফিরে আসে। সম্পূর্ণ না হলেও। তাহলে পুরো পৃথিবীতে যখন যে কোন কাঠামো টিকিয়ে রাখতে ভারসাম্য লাগে আর সেই সাথে কিছু নিয়ন্ত্রণ ও লাগে সেখানে নারীকে ঠেকিয়ে কেবল পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো সৃষ্টির হাজার হাজার বছরের অপচেষ্টা বলি আর নির্বুদ্ধিতাই বলি, করে বেনিফিটটা কোথায় ? আর এই অবস্থানে ভূমিকা রেখেছে কে, জানিই তো সবাই।

বলতে চাইবেন, নারীরা তখন ঠিক কী নিয়ে ব্যস্ত ছিলো যে, পুরুষের এই আধিপত্য গড়ায় বাঁধা না দিয়ে বসে বসে হাওয়া খাচ্ছিলো। ফ্রেডারিক এঙ্গেলস তার ‘দি অরিজিন অব দা ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রোপার্টি এন্ড দা স্টেট’ বইতে বলেছে, পশুপালন পশুচারণ যুগে নারীর উপর পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হবার মাঝ দিয়ে নারী জাতির ঐতিহাসিক পরাজয় ঘটলো। পরাজয় স্থায়ী হল, ভাবগত অবস্থান তৈরি হওয়ায়। শিকারের মর্যাদা তখন মাতৃত্বের চেয়ে বড় হয়ে গেল। এই বড় করে দেখা আর ছোট করে দেখার ভাবগত অবস্থানটি নারী শুরুতেই ধরতেই পারেনি। হয়তো ছুটতে থাকা পশুর পিছে দৌড়াবার চেয়ে আরেক প্রাণের অস্তিত্ব নিয়ে চলা শরীর গৃহস্থালী কাজে কিছুটা বিরাম পেয়েছিলো, স্বস্তি পেয়েছিলো। কিন্তু তাতে কী তার উপর প্রভুত্ব বিস্তার করা জায়েজ হয়ে যায়?

একের উপর অপরের নিয়ন্ত্রণের এই একগামিতার ভয়ংকর যাঁতাকলে পড়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুরোই নষ্ট হয়ে গেছে আজ। কারণ পুরুষ তার আধিপত্যের খেলায় পশুর উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে আনতে নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে শিখেছে, স্বেচ্ছাচারিতা করতে শিখেছে প্রকৃতির উপর। সেই স্বেচ্ছাচারিতার ভাবধারা এতোই শক্তিশালী যে নারী নিজেও সেই ভাবধারায় ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আর এতে কেবল এক বিশেষ লিঙ্গই না, প্রকৃতিতেও নেমে আসছে ধ্বংস।

পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এমনভাবে নারীর ভেতরে গেড়ে বসেছে যে, স্বাধীনতার অর্থ তাদের কাছে এখনও পুরুষের অভ্যন্তরে থেকেই নিজের মুক্তির অপচেষ্টার মাঝে। দোষ দিয়ে লাভও নাই, বেচে থাকার জল, হাওয়া, মাটির দখলদার রাষ্ট্রিক নীতি পুরুষতান্ত্রিক। ফলে নিজেকে বাঁচাবার লড়াইয়ে নামতে হয় পুরুষকে নিয়েই। সেই পুরুষটি ততক্ষণই লড়াইয়ে পাশে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত লড়াইয়ের দিক নির্দেশনা তার মন মতো থাকে। যখনই নারী নিজ জ্ঞান দিয়ে প্রচলিত ব্যবস্থাপনার বাইরে বেরিয়ে আসতে থাকে, তখন খুব উদার পুরুষ সঙ্গীকেও নিরাপত্তার অজুহাতে বাঁধা দেবার চেষ্টায় দেখা যায়। আর তাতেও সক্ষম না হলে ছেড়ে যায় আরেক দুর্বল নারীর দিকে। যার উপর প্রভুত্ব বিস্তার করা সহজ। আর দুর্বল নারী তো সমাজে এভেইলেবল!
যৌণতা এক স্বাভাবিক জৈবিক আচার। স্বাভাবিক হলেও এই আচারে থাকে নানা বিধি নিষেধ। নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই। কিন্তু নানা সামাজিক বিধি নিষেধ দিয়ে পুরুষের যৌণতাকে সমাজ যতটা নিয়ন্ত্রণ করে নারীকে করে আরও কঠোরভাবে।

সম্প্রতি ইরানে এক আইনে, পালক পিতার অধীনে ১৩ বছর থাকার পরে সেই পালক কন্যাকে বিয়ের অনুমতি দান করা হয়েছে। ভাবা যায়, কী ভয়ংকর স্বেচ্ছাচারিতা? যৌণ জীবনের অধিকার নারী পুরুষ সবারই আছে। বিয়ে নামক সংগঠন যৌণ জীবনকে স্বেচ্ছাচারী হবার হাত থেকে রক্ষা করলেও নানা পথে যৌণতা নিয়ে অস্বাভাবিকতা আছে সমাজে। ধর্ষণের মতোন এক প্রবল অপরাধ টিকে আছে কেবল স্বাভাবিক যৌণ জীবন যাপনের অভাবে। সমাজ পুরুষের শক্তিকে ভয় পায়, তাই তার যৌণ জীবনের ভ্যারাইটি আনতে গড়ে তুলেছে ব্রথেল, যার বিকাশ নারীদের জন্য তেমন এখনও হয়নি। তবে নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার সাথে সাথে তাদের যৌণ জীবনেরও একটি তালিমারা সংকট নিরসনের চেষ্টা করছে। স্বাভাবিক যৌণ জীবনের বাধাগ্রস্ততার সূতিকাগার বিয়ে নামক সংগঠন।

এই প্রতিষ্ঠানটি সমাজে আরেক ক্ষত বজায় রাখছে, যা বিবাহ বহির্ভূত যৌণ সম্পর্ক, সোজা বাংলায় যাকে বলি পরকীয়া। তার প্রয়োজনীয়তা, অপ্রয়োজনীয়তা বা ভালো মন্দ বোধের আগে বাস্তবতা যে, সমাজে তা প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত, কেউ মানুক আর না মানুক। এর মানে, মানুষ তার প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে নেচারের কাছে ফিরছে কালচারের তোয়াক্কা না করে। এখন তা ভালো কী মন্দ তা বুঝবার বা বলবার জ্ঞান আমার হয় নি, কেবল বুঝতে পারছি, ঘটছে সমাজে।

এবার বলি যে, প্রত্যেকে কেবল নেচারকে যদি আমরা মূল্য দিয়ে চলি, নেচারের কাছে আত্মসমর্পণ করি তার ফলাফল আমরা গ্রহণ করতে প্রস্তুত কী? নেচারকে প্রাধান্য দিলে তো যৌণ জীবনে বাবা, মা, ভাই, বোনের সাথেও কোন বাধা থাকার কথা না! পত্র পত্রিকায় যখন বাবা কর্তৃক মেয়ে ধর্ষণ সংবাদটি পড়ি, আমাদের মনোজগত কী অস্থির হয় না ? সামাজিক জীবন প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই নেচারকে বেড়ি বাধার চেষ্টা হয়েছে। জন্ম হয়েছে কালচার। ভাবনার জগত পাল্টাবার সাথে সাথে কালচারেরও পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যিখানে একটি ভারসাম্যহীণ কাঠামো তৈরি হয়ে গেছে। এক গ্রুপের স্বেচ্ছাচারী ধারণা বিকশিত হয়েছে। স্বেচ্ছাচারিতা মানেই বৈষম্য, অস্থিরতা। সেই ধারণার নিয়ন্ত্রণ যতদিন পারস্পরিক ভারসাম্যমূলক না হবে, ততদিন সমাজের অস্থিরতা কমা কী সম্ভব? যুক্তি হিসেবে বলতে চাই, প্রত্যেকের নিজ নিজ ইচ্ছের দাস হওয়া মানেই এক ধরণের বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হওয়া।

স্বেচ্ছাচারিতায় অপরের প্রতি থাকে না দায়বদ্ধতা, ফলে শুরু হয় আধিপত্যের লড়াই। আর লড়াই মানেই অস্থিরতা, স্থিতিশীলতাকে ভেঙেচুড়ে বেচে থাকায় অনিশ্চয়তা আনা! আবার রাষ্ট্রের প্রচলিত কাঠামোয় যে সিস্টেম গড়ে উঠেছে, তারও রয়েছে ভয়ংকর দুর্বলতা। এই দুর্বলতা তৈরি হয়েছেই কেবল নারী পুরুষের ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ নীতির অসামঞ্জস্যতায়। এই অসামঞ্জস্যতা দূর করতে নারীকে আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে নিজের মানসিক অবস্থান। যদিও সেই মানসিকতা পরিবর্তন এতো সহজসাধ্য না। দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা পারিবারিক, সামাজিক অনুশাসন, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির পুরুষতান্ত্রিক চর্চায় নারী তার স্বাধীনতাও চেয়েছে পুরুষতান্ত্রিক আদলে। সেই আদল এই প্রজন্ম ভাঙতে না পারলেও সচেতনতা অন্তত আনা প্রয়োজন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। আপনার মেয়েটিকে পুরুষ বিহীণ ভাবতে শেখান, নিজের শরীর মনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে তাকে গড়ে তুলুন। আর সেদিন আশা করি, দুরের হবে না , যেদিন একজন নারী পুরুষের প্রচলিত ব্যবস্থা ভেঙে নতুন কোন ব্যবস্থার জন্ম দেবে।

লেখক

লেখক: প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত