প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানুষকে সবসময় তার সাম্প্রতিক কর্মকা- দিয়ে বিচার করতে হয়, ২০ বা ৩০ বছর আগের কর্মকা- দিয়ে নয়

কামরুল হাসান মামুন : দেশের বাইরে আজ পর্যন্ত কেউ আমার এসএসসি আর এইচএসসির রেজাল্ট জানতে চায়নি। এমনকি আমি যখন আব্দুস সালাম ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সে ডিপ্লোমা স্কলারশিপের জন্য দরখাস্ত করি তারাও আমার এসএসসি আর এইচএসসির রেজাল্ট জানতে চায়নি। আর পরবর্তী পিএইচডি কিংবা পোস্ট-ডকের জন্য স্কলারশিপ কিংবা ফেলোশিপের জন্য দরখাস্ত করার সময়তো স্বাভাবিক কারণেই না। আর আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হওয়ার জন্য শুধু না এরপরও প্রতিটি প্রমোশনের জন্য দরখাস্ত করার সময় বাধ্যতামূলকভাবে এসএসসি আর এইচএসসির রেজাল্ট ও সার্টিফিকেট দিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে শিক্ষক শুধু নয় অধ্যাপক পদে নিয়োগে এসব চাওয়ার চেয়ে ৎরফরপঁষড়ঁং বা হাস্যস্পদ কিছু আর হয় না। আসলে যারা আমাদের এসব নীতিমালা বানান তারা এক বিশেষ প্রজাতির শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় প্রভাষক হিসেবে যোগ দেয়ার পর পরই শিক্ষকরা দুটো স্ট্রিমে বিভক্ত হয়ে যান। এক স্ট্রিমের শিক্ষকরা একাডেমিক কাউন্সিল সিন্ডিকেট, শিক্ষক সমিতির নির্বাচনকেন্দ্রিক শিক্ষক। ধীরে ধীরে তারা শিক্ষক হয়ে উঠার চেয়ে উঠেন মোর প্রশাসক। আসলে তাদের অনেকেরই মধ্যে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন লালন করেননি। হয়তো বিসিএস দিয়ে প্রশাসকই হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের নিয়োগ বোর্ডের কারণে তারা শিক্ষক হয়ে যান। হলে কি হবে? অল্প দিনের মধ্যেই যখন দেখেন আরে এখানে তো দুটো হওয়ারই সুযোগ আছে। তাদের সুপ্ত সেই বাসনা আবার চাড়া দিয়ে উঠে। এরাই হয়ে উঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তা। এরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢ়ধৎষরধসবহঃ খ্যাত সিন্ডিকেটের সদস্য হন ভিসি হন ইত্যাদি। ধীরে ধীরে শিক্ষকতা কি সেটাই ভুলে যান। তারই প্রমাণ ইউজিসি প্রণীত এবং মন্ত্রণালয়ে গৃহীত অভিন্ন নীতিমালা।

তারা যদি প্রশাসকের চেয়ে মোর শিক্ষক হতেন তাহলে বুঝতেন শিক্ষক নিয়োগ ও প্রমোশন নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো ভূমিকা থাকতে পারে না। তার চেয়ে বড় সত্য হলো ‘অভিন্ন’ শব্দটিই থাকতো না। আমি দেখেছি আমার বিভাগে সেরা ছাত্রদের সিজিপিএ কখনোই এক নয়। এই বছর ৩.৭ হলে পরের বছর ৩.৯! এমনও হয়েছে ক্লাসের সেরা ছাত্র ৩.৫ই পায়নি। এটি হয়েছিলো জিপিএ সিস্টেম চালু হওয়ার পর প্রথম কয়েক বছর। তাদের অনেকেই এখন দেশের বাইরে পিএইচডি শেষ করেছে অথচ তারা দরখাস্ত করতে পারে না। তাদের অনেকেই পোস্ট-ডক করে অনেক ভালো গবেষকও হয়েছে হয়তো, কিন্তু তাদের আপন দেশে ফিরে আসতে পারবে না। কারণ দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দরখাস্ত করারই সুযোগ পাবে না। শুধু কি তাই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের সিজিপিএর বৈষম্য আছে এবং এটা স্বাভাবিক। আমাদের বিশ্বের কোনো একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের একটি বিজ্ঞাপন দেখান তো যেখানে বিএস এমএসের সিজিপিএ চেয়েছে? যাদের সিজিপিএ খারাপ তারা দরখাস্তই করেন না, কারণ তারা জানেন প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়েই তারা বাদ পড়ে যাবেন। আমাদের এখানে অধ্যাপক পদের জন্যও শুধু এসএসসি আর এইচএসসি না বিএস এমএসের সিজিপিএও চাওয়া হয়। কেন? কেন এই হাস্যকর নীতি? তারা তো এগুলো দেখিয়েই প্রভাষক হয়েছে, প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক হয়েছে, সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক হয়েছে। অধ্যাপকের জন্য কেবল সহযোগী অধ্যাপক থাকাকালে শিক্ষক কি কি করেছে সেগুলোই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হতে পারে। অথচ মাথার মধ্যে ডট ডট না থাকলে এ রকম হাস্যস্পদ নিয়ম করতে পারে না। পারে কারণ তারা আসলে শিক্ষক নয়। যারা নিয়ম করে তাদের দৃষ্টি তখন ভিসি কিংবা ইউজিসি মেম্বার চেয়ারম্যান পদের দিকে।

অথচ বিদেশে ৪০-৪৫ বছরের কোনো শিক্ষককে যদি ভিসি প্রো-ভিসি কিংবা অন্য কোনো প্রশাসনের পদ দেয়া হয় তারা বিনয়ের সঙ্গে অপারগতা প্রকাশ করেন, কারণ তারা জানেন এই বয়সটাই হলো গবেষণা করা ও গবেষণা করানোর সময়। জীবনের মধুর সময়ে প্রশাসনে যাওয়া মানে নিজের ক্যারিয়ারকে ডুম করা। আজকে শিক্ষক নিয়োগ ও প্রমোশনের অভিন্ন নীতিমালা নিয়ে দেশবরণ্য বর্ষীয়ান শিক্ষকদের কোনো কথা বলতে দেখি না। জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে তাদের এহেন নীরব ভূমিকা আমাদের চরমভাবে ব্যথিত করে। এই নীতিমালা কিংবা পুরনো নীতিমালা দুটোই আমার কাছে চরম ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা এমন হাস্যকর হতে পারে না। হাস্যকর নীতির আরেকটি উদাহরণ দিই যেটা নতুন (কালো নীতিমালা) ও পুরনো দুটোর মধ্যেই আছে। সেটি হলো আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বলি এসএসসি ও এইচএসসিতে মোট জিপিএ-৮ পেলেই হয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা-৯! আমি দেখেছি কিছু ছাত্র জিপিএ-৯-এর কম পেয়েও চান্স পায়। তাদের জন্য তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিনেই কি মেসেজটি দিই? দেখো বাবা তুমি এবার ক্লাসের সেরা ছাত্র হয়ে পৃথিবীসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করে সেখানকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারো, কিন্তু তুমি বাংলাদেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দরখাস্তই করতে পারবা না। নিজের ভালো চাইলে দেশ ছেড়ে পালাও। যা হোক নতুন পুরনো নীতিমালার কি ভালো বা মন্দ সেটা কথা নয়। আমার কথা হলো এসব ঘুনে ধরা নিয়ম সব বদলাতে হবে এবং সেটি করবে কেবল স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেখানে বরণ্য শিক্ষক ব্যতীত অন্য কেউ থাকবে না। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি অভিন্ন গাইডলাইন থাকতে পারে। সেটাও কেবল শিক্ষকরাই প্রণয়ন করবে। আমাদের দেশে এসএসসি আর এইচএসসিতে যদি একবার ভালো ছাত্রের সিল কপালে লেগে যায় সেটা আর জিন্দেগিতেও যায় না। একজন শিক্ষক এসএসসি এইচএসসিতে ভালো করে বিএস, এমএসেও ভালো করতে পারেন এবং পরবর্তী সময়ে সুপার ফ্লপ হতে পারেন। একজন মানুষ দিন দিন ভালো থেকে পড়াশোনায় বা গবেষণায় খারাপ যেমন হতে পারেন আবার দিন দিন ভালোও হতে পারেন। মানুষকে সবসময় তার ইমেডিয়েট পাস্ট কর্মকা- দিয়ে বিচার করতে হয়। ২০ বা ৩০ বছর আগের কর্মকা- দিয়ে নয়। এটাকে পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় বলে মার্কভিযান প্রসেস। কারণ ওই সময়ের মধ্যে বুড়িগঙ্গা দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে ওটা নর্দমায় পরিণত হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত