প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জবাবদিহিতাহীন বাজেট, লুটপাটের ধারাকে আরো শক্তিশালী করবে, বললেন জোনায়েদ সাকি

ইউসুফ আলী বাচ্চু : গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলছেন, এবারের জাতীয় বাজেট লুটপাটের ধারাকে আরো শক্তিশালী করবে। শনিবার গণসংহতির রাজনৈতিক অফিসে আয়োজিত বাজেট পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের (২০১৯-২০২০ অর্থবছরের) পর্যালোচনায় ‘গতানুগতিক বাজেট দেয়া হয়েছে’ বা ‘উচ্চভিলাষী বাজেট’ অথবা ‘বাজেট বৈষম্য বাড়াবে’ এমন কথা বললে তা ভুল হবে না। কিন্তু এ রকম ঢালাও মন্তব্য বা অভিমতের কারণে মাঝে মাঝে বাজেটের অসঙ্গতিগুলো হালকা হয়ে যায়। বরং চেষ্টা করা উচিৎ বাজেট প্রস্তাবের গতানুগতিকতার ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাবগুলো সামনে নিয়ে আসা, বাজেটের অবাস্তব প্রস্তাবগুলোর পেছনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলো স্পষ্ট করা এবং কিভাবে বাজেট বিদ্যমান লুণ্ঠনমূলক ও বৈষম্যবৃদ্ধিকারী ধারাকেই বেগবান করছে তা দেখিয়ে দেয়ার। আমরা আমাদের বাজেট প্রতিক্রিয়ায় সে চেষ্টাটি করেছি।

আমাদের প্রতিক্রিয়াটির সারসংক্ষেপ এখানে আপনাদের সামনে পাঠ করে শোনাচ্ছি এবং অপেক্ষাকৃত বিস্তারিত অংশটি সংযুক্তি আকারে এর সাথে যুক্ত করছি।

প্রথমত আমরা দেখতে পাচ্ছি জিডিপির প্রবৃদ্ধি, উন্নয়নের গল্পগাথা সত্তে¡ও বাংলাদেশের অর্থনীতি আসলে একটা সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের টাকা দিতে পারছে না। টান পড়ছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে। রিজার্ভের সক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে। চলতি হিসাবের ভারসাম্য ও ব্যালান্স অব পেমেন্টের সূচক নেতিবাচক। এমন অবস্থায় অর্থমন্ত্রী ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেবার পরিকল্পনায় বাজেট পেশ করেছেন। গত বছরও বাজেট পেশ করা হয়েছিল ব্যাংক থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেবার পরিকল্পনায়। কিন্তু ব্যাংক সেই টাকা দিতে পারেনি। ফলে সরকারকে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, অনুমানের প্রায় দ্বিগুণ এর পরিমাণ। এই পথ ব্যয়বহুল এবং এর সুদ গুনতে হয় বহু বছর ধরে। ফলে তা একটা বিপজ্জনক পথে মোড় নিতে পারে। কিন্তু ব্যাংকগুলোর ইতিমধ্যেই যে বেহাল দশা তাতে সরকারকে আবারও সঞ্চয়পত্রের ওপরই নির্ভর করতে হবে অথবা বাংলাদেশে ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে টাকার যোগান দিতে হবে। তা একটা মাত্রার চাইতে বেশি গেলেই মুদ্রার বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতির চাপ ডেকে নিয়ে আসবে। এভাবে সরকার একটা দারুণ বিপজ্জনক পথে পা বাড়াচ্ছে যা শুধু সরকারকেই ঋণে জর্জরিত করবে না, দেশের অর্থনীতিকেও একটা ভঙ্গুর অবস্থায় নিয়ে যাবে। ঋণ করে ঘি খাবার এই প্রবণতার মূল্য চোকাতে হবে শেষ পর্যন্ত জনগণকেই।

সরকার তার আয় বাড়ানোর জন্য জনগণের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের বোঝা চাপিয়ে দেবে, জিনিসপত্রের দামের উর্ধ্বগতি ঘটবে। যার শিকার হয়ে জনগণ ধুঁকবে। ঋণের বোঝাও টানতে হবে জনগণকেই। এবছরের বাজেটেই দেখা যাচ্ছে জনগণ ১০০ টাকা কর দিলে তার ১৮.৩ টাকা চলে যাবে ঋণের সুদ গুনতে। এভাবে জনগণের ওপর সমস্ত চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে কিন্তু যারা লুণ্ঠন করে জনগণের পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছে তাদের জন্য রয়েছে বিশাল ছাড়। ঋণখেলাপিদের ঋণ উদ্ধারে বা তাদের শাস্তি দিতে কোন উদ্যোগ নাই। ব্যাংক খাতে যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হয়েছে তার পরিবর্তনের কোন অঙ্গিকার নাই, ব্যাংক খাতে সুশাসনের কোন ব্যবস্থা নাই। বড় বড় কেলেংকারি, বহুল আলোচিত লুটেরারা বহাল তবিয়তে কর্তৃত্ব করে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতির ভেতরই আবার নতুন করে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, নতুন লুটেরাদের স্থান করে দেবার জন্য। অবৈধভাবে উপার্জিত কোটি কোটি টাকা জমি ও ফ্ল্যাট কিনে বা হাইটেক পার্ক বা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করে তারা তাদের অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থকে বৈধ করে নিতে পারবেন। এ যেন তেলা মাথায় ঢালো তেল আর শুকনা মাথায় ভাঙো বেল বাংলা প্রবাদের সার্থক প্রয়োগ। এই পুরো ঘটনাটাই ঘটতে পারছে একটা জবাবদিহিতাহীন ব্যবস্থার কারণে। একই কথা খাটে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সম্পর্কেও। একদিকে সরকারের প্রকল্পগুলো পুঁজিঘন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সেখানে সীমিত; অন্যদিকে এই প্রকল্পগুলোর অস্বাভাবিক ব্যয় কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সীমিত করছে। এক টাকা খরচ করে যে কর্মসংস্থান করা যেত তা করতে খরচ করা হচ্ছে ৫ টাকা। প্রথম চোটেই কয়েকগুন বেশি খরচ দেখিয়ে প্রকল্প পাশ করার পরও প্রকল্পের খরচ ইচ্ছামত বাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে প্রকল্প চলাকালীন সময়ে। সর্বোচ্চ থেকে নিম্নতম স্তর পর্যন্ত জবাবদিহিতাহীন একটা ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। যার ফলেই পারমাণবিক বালিশের মত গল্প তৈরি হচ্ছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই মূহুর্তে সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ বিষয় হলেও বাজেটে এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও কোন কার্যকর ও স্পষ্ট প্রস্তাবনা নেই। আমাদের দেশে ২৬ লক্ষ কর্মক্ষম মানুষের কোন কাজ নেই (এদের মধ্যে ১০ লক্ষ গ্র্যাজুয়েট বা সমমানের ডিগ্রীধারি তরুণ)। যারা কাজ করছেন, তাদেরও ৮০ শতাংশের বেশি যুক্ত আছেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। সরকার নিজে যেমন যথেষ্ট পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না, একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের অরাজকতা ও অন্যান্য কারণে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগও ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে (অর্থাৎ ব্যক্তি খাতেও কোন উলে­খযোগ্য কর্মসংস্থান তৈরি হবে না)। ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগের বিষয়ে সরকারের অনাগ্রহের একটি প্রমাণ বছরের পর বছর ধরে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় থাকা প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে নুন্যতম অগ্রগতি না হওয়া। কিন্তু কর্মসংস্থানহীন মানুষগুলোকেও বাড়তি করের বোঝা (বিশেষত ভ্যাটের বোঝা) টানতে হবে। আমরা দেখছি এবারের বাজেটেও দুর্নীতিকে পরিপোষণ, দরিদ্র মানুষের ওপর বোঝা চাপিয়ে দেওয়া, ক্ষমতার সুতোঁয় বাঁধা বিভিন্ন অংশকে তুষ্ট করা, সরকারি ব্যয়ের ওপর নিভর্রশীল প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি ধারা অব্যাহত আছে। এই ধারা চলতে থাকা বাংলাদেশের জন্য বিপদজনক। কেননা তাতে এক ধরনের ফাঁপা প্রবৃদ্ধি হচ্ছে এবং প্রকৃত শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের বিকাশ ঘটছে না। অন্যদিকে সরকারি ব্যয়ও এমন খাতে করা হচ্ছে যেখানে দুর্নীতির সুযোগ সবচাইতে বেশি। এটাও ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত আছে। এত আলোচনা-সমালোচনা, কৃষকের ধান কেটে দেবার নানা আয়োজনের পরও কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কোন ব্যবস্থা আমরা দেখিনি। শস্যবীমা প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে তার সুফল প্রকৃত কৃষক, প্রান্তিক কৃষক কিভাবে, কতটুকু পাবে? বরং শস্য বীমা নিয়ে ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে যে সব পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে সেগুলো থেকে নেতিবাচক ফলাফলই পাওয়া গেছে। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা, ধান সংরক্ষণ করার জন্য নতুন গুদাম তৈরির বরাদ্দ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রত্যাশিত ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগের কোনটিই দেখা যায়নি প্রস্তাবিত বাজেটে। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বেড়েছে ১৭.২ ভাগ। এর প্রায় পুরোটাই হয়ত চলে যাবে নতুন করে এমপিওভুক্তির যে সিদ্ধান্ত হয়েছে তাতে। শিক্ষার মানোন্নয়নে তা আসলে কতটুকু ভূমিকা রাখবে? আর এই বরাদ্দ বৃদ্ধির পরও তা জিডিপির ২.০১১ ভাগ মাত্র। স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা আরও করুণ, জিডিপির ০.৭ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ জিডিপির শতকরা হারে এই বরাদ্দ ক্রমশ কমছে। আর এই খাতে জনগণের ব্যয় বেড়েই চলেছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে বৈষম্য বেড়েই চলেছে। কতিপয়ের সুবিধার বিনিময়ে যখন রাষ্ট্রকে ব্যবহার করা হয় ও একটা জবাবদিহিতাহীন কাঠামো তৈরি করা হয় তখন বাজেট সেই ব্যবস্থার প্রতিফলন হবে সেটা অনুমেয়। কাজেই ব্যবস্থার একটা কাঠামোগত বদল ছাড়া, বহুপাক্ষিক জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া কোন জনবান্ধব বাজেট আশা করা যায় না। অথচ বাস্তবতা হলো মধ্যরাতে নির্বাচিত এই সংসদেও বাজেটের বেশিরভাগ গুরত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে তেমন কোন আলোচনা হয় না, বা হবে না। আর গতবারের অভিজ্ঞতা বলে কোন বিষয়ে বিরোধ দেখা দিলে তার মীমাংসার ভার দেওয়া হবে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। অথবা পুরোটাই তাঁর আশীর্বাদ হিসাবে বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করা হবে। কিছু কথার মারপ্যাঁচ ছাড়া এই বাজেটে নতুন কিছু নাই। লিখিত বক্তব্যে আবুল হাসান রুবেল বলেন, এটা আর পূর্ববর্তী আর দশটা বাজেটের মতই গতানুগতিক। কিন্তু সেটাই এর প্রধান সমালোচনা নয়, বরং যে পরিস্থিতিতে এই বাজেট দেয়া হয়েছে সেটা যে গতানুগতিকের সীমা অতিক্রম করে একটা বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে সেটা যে এই বাজেট অনুধাবন করতে পারছে না, সেটাই সবচেয়ে মারাত্মক। সবকিছুরই একটা সীমা আছে, লুন্ঠনেরও। সেই সীমা অতিক্রম করে গেলে খোদ যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে সেই লুন্ঠন করা হচ্ছে সেটাই টালমাটাল হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ এখন সেরকম একটা পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে। এই বাজেট সেই পরিস্থিতি অনুমানে পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ এবং তার মোকাবেলায় কোন ব্যবস্থা গ্রহণেও তার অক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে জোনায়েদ সাকি বলেন, এই বাজেট জবাবদিহিতাহীন। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনীতি পুনর্গঠনে নতুন কোনো উদ্যোগ নেই, নেই ব্যাংক খাত, কৃষিখাতসহ বিভিন্নখাতের বিপর্যয় ঠেকানোর কোনো প্রস্তাব। কৃষকদের সমস্যা সমাধানে কোনো নীতিই গৃহীত হয়নি। জনস্বার্থে নয়, সুবিধাভোগীদের স্বার্থেই বাজেট প্রস্তাবনা করেছে সরকার যা লুটপাটের ধারাকে আরো শক্তিশালী করবে। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকির সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পেশ করেন দলের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ফিরোজ আহমেদ, তাসলিমা আখতার, সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য মনির উদ্দীন পাপ্পু, বাচ্চু ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় সদস্য দীপক রায়, অপরাজিতা চন্দসহ নেতৃবৃন্দ। দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য জুলহাসনাইন বাবু। সম্পাদনা : মুসবা তিন্নি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত