প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আল-কুদস দিবসের প্রেক্ষাপট ও প্রতিরোধের আকাঙ্খা

রাশিদ রিয়াজ : এবার আল-কুদস দিবস এমন এক সময় পালিত হতে যাচ্ছে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথিত ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ ফাঁস হয়ে গেছে যার অন্যতম দিক হচ্ছে নতুন ফিলিস্তিনে সেনাবাহিনী থাকবে না। ইসরাইল ও ফিলিস্তিন সংকট নিরসনে দুই রাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধানের বাইরে ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’র অংশবিশেষ ফাঁস করে ইসরাইলি পত্রিকা ‘ইসরাইল হাইয়োম’। পত্রিকাটি দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। ইসরায়েলের আরেক প্রভাবশালী পত্রিকা হারেৎজ’এর প্রখ্যাত সাংবাদিক গিডিয়ন লেভি এধরনের শান্তি পরিকল্পনাকে শতাব্দীর সেরা কৌতুক হিসেবে অভিহিত করেছেন। ২৬ মে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মিডিয়া সিএনএন এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনের শিরোনাম করে ‘ ট্রাম্প ড্যান্সেস উইথ ডেঞ্জার ইন মিডিল ইস্ট বাই ডেপলইং এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ার এন্ড কুশনার’স পিস প্লান’।

ঠিক এমনি এক প্রেক্ষাপটে এবার পালিত হচ্ছে আল-কুদস দিবস। প্রতি বছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার পালিত হয়ে থাকে আল-কুদস দিবস যা ১৯৭৯ সালের ৭ আগস্ট ইরানে শুরু হয়েছিল। এই দিবস পালনের উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনি জনগণের সাথে একাত্মতা প্রকাশ, ইসরায়েলি দখলদার এবং ইসরাইলের জেরুজালেম দখলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ। জেরুজালেম শহরকে আরবি ভাষায় বলা হয় ‘কুদস’ বা ‘বায়তুল মুকাদ্দাস। ইরানের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইবরাহীম ইয়াজদি সর্বপ্রথম আল-কুদস দিবস র‌্যালি আয়োজনের ধারণা দেন। তারপর ইরানের মহান ইমাম আয়াতুল্লাহ খোমেইনী ১৯৭৯ সালে এর প্রবর্তন করেন। এর পর থেকে ইরান সহ অনেক আরব ও অনারব মুসলিম দেশ ছাড়াও পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রতিবছর আল-কুদস দিবস পালন করে আসছে।

প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এবার দেখা যাচ্ছে জেরুজালেমকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার পর বিশে^র অধিকাংশ দেশ তা স্বীকৃতি না দিলেও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শান্তি পরিকল্পনার নামে ফিলিস্তিনকে আরো বশ্যতা স্বীকার ও প্রতিরোধহীন করে তোলার ব্যবস্থা নেয় হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের দেয়া সকল অর্থনৈতিক সহায়তা প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। সর্বশেষ গোলান মালভূমিকে ইসরায়েল নিজেদের বলে ঘোষণা দেয়। যা সিরিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত। ফলে স্বাভাবিকভাবেই শুধু আল-কুদস দিবসে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ফিলিস্তিন পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের মননে বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনা অর্জনের জন্যে সার্বিক প্রস্তুতি ভীষণ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিতরণ করা নথির বরাত দিয়ে ইসরাইল হাইয়োম পত্রিকাটি বলছে, এই নথিতে থাকা শর্তাবলীর অংশবিশেষ ইসরাইলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপে উল্লেখও করেছেন ট্রাম্পের জামাতা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জ্যারেদ কুশনার এবং ইসরাইল বিষয়ক উপদেষ্টা জ্যাসন গ্রিনব্ল্যাট। এই দু জনের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর।

ইতিমধ্যে ফিলিস্তিন বিষয়ক মার্কিন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন হিজবুল্লাহ প্রধান সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ। তিনি বলেছেন, সব মুসলিম দেশের উচিত এ পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করা কারণ এর মাধ্যমে ফিলিস্তিন ইস্যু চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি এবছরের কুদস দিবসকে ‘ট্রাম্পের চুক্তি বিরোধী’ দিবস হিসেবে পালনের আহবান জানিয়েছেন। হিজবুল্লাহ নেতা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আগামী মাসে বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে যে সম্মেলন হতে যাচ্ছে সেটি হবে শতাব্দির কথিত সেরা চুক্তি বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ২৫ জুন বাহরাইনের রাজধানী মানামায় ফিলিস্তিন বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ওই সম্মেলনে ফিলিস্তিন সংকট সমাধান বিষয়ক পরিকল্পনা উত্থাপন করা হবে। এ সম্মেলনে যোগ দিতে সৌদি আরব, আমিরাত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে অথচ মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে এনিয়ে নেই কোনো শলাপরামর্শ, ফিলিস্তিনি স্বার্থ রক্ষায় নেই কোনো দরকষাকষির প্রস্তুতি। তবে চীন ও রাশিয়া মানামার সম্মেলনে যোগ না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফিলিস্তিনে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত গুয়ো ওয়েই ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা নাবিল শা’তকে জানিয়েছেন, চীন ও রাশিয়া এ সম্মেলন বয়কটের বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। তার দেশ ফিলিস্তিনের জনগণকে সমর্থন করে এবং তাদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকারের প্রতি বেইজিং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাশাপাশি ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের আগের সীমানার আওতায় স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনাকেও সমর্থন করে বেইজিং।

এদিকে বাহরাইনের প্রখ্যাত আলেম শেইখ ঈসা কাসেম বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ডিল অব সেঞ্চুরি’ হচ্ছে ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও কয়েকটি আরব দেশের যৌথ ষড়যন্ত্রের ফসল। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনের স্বার্থবিরোধী এই পরিকল্পনা উত্থাপন করলেও কয়েকটি আরব সরকার তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছে।

সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ আরও বলেছেন, লেবাননে অবস্থানরত ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের চিরস্থায়ীভাবে লেবাননে বসবাস করতে দেয়া হচ্ছে মার্কিন পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য। অবশ্যই এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করতে হবে। ফিলিস্তিন বিষয়ক যেকোনো পরিকল্পনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ৫০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অধিকারকে অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে। হিজবুল্লাহর এ অবস্থানকে সমর্থন দিয়েছে হামাস। কিন্তু এ নিয়ে আরব দেশগুলোর কোনো মাথা ব্যথা দেখা যাচ্ছে না।

অথচ ইসরাইল এরই মধ্যে হিজবুল্লাহকে ‘কৌশলগত হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করেছে। কারণ হিজবুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের আগ্রাসী পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিয়েছে। অথচ হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ আন্দোলন না থাকলে বায়তুল মুকাদ্দাস ও গোলান মালভূমির মতো দক্ষিণ লেবাননকেও ডোনাল্ড ট্রাম্প এতদিনে ইসরাইলকে উপহার দিয়ে দিত।

তবে যতটুকু ফাঁস হয়েছে তা থেকে জানা গেছে নথি মোতাবেক, ওই চুক্তি সই হবে ইসরাইল, ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থা পিএলও এবং হামাসের মধ্যে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বর্তমানে দখলকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা নিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, যার নাম হবে ‘নয়া ফিলিস্তিন’। এক বছরের মধ্যে একটি নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তী ৩ বছরের মধ্যে ইসরাইল ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দেবে।

এই নথিতে অনেকটাই অস্পষ্ট রয়ে গেছে জেরুজালেম ইস্যুটি। নথিতে বলা হয়েছে, জেরুজালেম এখনকার মতো অবিভক্তই থাকবে। তবে শহরের দায়িত্ব ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে। ইসরাইল শহরের সাধারণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। জেরুজালেমে বসবাসরত ফিলিস্তিনিরা হবেন নয়া ফিলিস্তিনের নাগরিক। জেরুজালেমে ইসরাইলি পৌরসভা শহরের জমি সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকবে। নয়া ফিলিস্তিন ইসরাইলি পৌরসভাকে কর দেবে। বিনিময়ে ফিলিস্তিনিদের শিক্ষাদীক্ষার দায়িত্বে থাকবে তারা।

জেরুজালেমে বসবাসরত ফিলিস্তিনির সংখ্যা আনুমানিক ৪ লাখ ৩৫ হাজার। তাদের কাছে ইসরাইলের স্থায়ী নাগরিকত্ব সনদ রয়েছে। শহরের বাইরে নির্দিষ্ট সময় বসবাস করলে ইসরাইল এই সনদ বাতিল ঘোষণা করতে পারে। তারা ইসরাইলের নাগরিকত্বের অধিকার পান না। বলা হচ্ছে জেরুজালেমের পবিত্র নগরীর বিদ্যমান অবস্থা বহাল থাকবে। ইসরাইলিরা সেখানে জমি কিনতে পারবেন না। তেমনি ফিলিস্তিনিরাও জমি কিনতে পারবেন না। অপরদিকে পশ্চিমতীরে থাকা ইসরাইলি বসতি, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবৈধ ধরা হয়, সেগুলো ইসরাইলের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাবে।

নথি মোতাবেক, গাজা উপত্যকার জন্য অতিরিক্ত ভূখ- দেবে মিশর। সেখানে বিমানবন্দর, কারখানা, বাণিজ্যিক ও কৃষি কেন্দ্র থাকবে। কিন্তু সেখানে ফিলিস্তিনিরা বসবাস করতে পারবেন না। এ বিষয়ে পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বর্তমানে একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন গাজা ও পশ্চিম তীরের মধ্যে সংযোগের জন্য ইসরাইলের ভেতর দিয়ে মাটি থেকে ৩০ মিটার ওপরে সংযোগ সড়ক নির্মিত হবে। এই মহাসড়কের ৫০ শতাংশ ব্যয় বহন করবে চীন। দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ ১০ শতাংশ করে ব্যয় করবে।

ফাঁস হওয়া এই নথিতে ইঙ্গিত মিলছে যে, চুক্তিতে অর্থায়ন করবে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ এবং অজ্ঞাত কিছু উপসাগরীয় দেশ। নয়া ফিলিস্তিনে বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে ব্যয়ের জন্য ৫ বছরে তিন হাজার কোটি ডলার দেওয়া হবে। এই অর্থের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ২০ শতাংশ, ইইউ ১০ শতাংশ ও উপসাগরীয় দেশগুলো ৭০ শতাংশ বহন করবে।

নয়া ফিলিস্তিনের কোনো সেনাবাহিনী থাকবে না। শুধু পুলিশ বাহিনী থাকবে। নয়া ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে একটি সুরক্ষা চুক্তি সই হবে। এই চুক্তি অনুযায়ী নয়া ফিলিস্তিনকে বৈদেশিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে ইসরাইল। বিনিময়ে ইসরাইলকে অর্থ পরিশোধ করবে ফিলিস্তিন। প্রয়োজনে আরব দেশগুলোও ইসরাইলকে অর্থ পরিশোধ করবে। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, চুক্তি সই হলে হামাস ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নিজেদের সমস্ত অস্ত্র মিশরের কাছে জমা দেবে। বিনিময়ে হামাস নেতাদের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে ও মাসিক বেতন দেবে আরব রাষ্ট্রগুলো। ইসরাইলি টার্মিনাল ও ক্রসিংয়ের মাধ্যমে গাজার সীমান্ত বহিঃর্বিশ্বের জন্য খুলে দেয়া হবে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি সমুদ্র ও বিমানবন্দর নির্মিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলি সমুদ্র ও বিমান বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। ফাঁস হওয়া নথিতে বলা হয়েছে, পিএলও এবং হামাস এই চুক্তি সই না করলে তাদেরকে শাস্তি পেতে হবে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এমন সব প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করবে এবং অন্যদেরকেও বন্ধ করতে বলবে যেখান থেকে ফিলিস্তিনিরা আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এরইমধ্যে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থা ও জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি হাসপাতালে অর্থায়ন বন্ধ করেছে। যদি পিএলও চুক্তি সই করে, কিন্তু হামাস ও ইসলামি জিহাদ চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে ইসরাইল, যাতে পূর্ণ সমর্থন থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের। অন্যদিকে, ইসরাইল এই চুক্তি সই না করলে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে দেয়া সকল আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেবে।

স্বভাবতই একজন ইসরাইলি নাগরিক হয়েও সাংবাদিক গিডিয়ন লেভি এধরনের শান্তি পরিকল্পনাকে শতাব্দীর সেরা কৌতুক হিসেবে অভিহিত করেছেন। এবারের আল-কুদস দিবসে এধরনের নির্মম কৌতুক আগামী দিনগুলোতে ফিলিস্তিনিদের কিভাবে সইতে হবে তা উপলব্ধি করা প্রয়োজন। কারণ তিন দশক ধরে গিডিয়ন লেভি নিয়মিত দেখে আসছেন ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কি নির্মম আচরণ করছে ইসরাইলিরা। ২০০৬ সালের পর গাজায় বিদেশি সাংবাদিকদের ঢুকতে না দেয়ায় গিডিয়নের পক্ষে সেখানকার খবর সরাসরি সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ‘ দি পানিশমেন্ট অব গাজা’ নামে তার বইতে গাজাবাসীদের চরম দুর্দশার কথা উঠে এসেছে। কিভাবে ফিলিস্তিনিদের সংস্কৃতি, একের পর এক ভূমি ও বাড়ি ঘর ধ্বংস করে ইসরাইলি স্থাপনা গড়ে উঠছে, গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে, জনপদ পাল্টে যাচ্ছে, সামাজিক বিবর্তন ঘটছে তার বিবরণ এ বইতে রয়েছে। এই বইতে রয়েছে এক সন্তানসম্ভবা বেদুইন নারীর কথা যাকে কিনা হাসপাতালে যাওয়ার সময় তাকে ইসরাইলি সেনারা চেকপয়েন্টে আটকে দেয় এবং সেখানে তার সন্তান ভূমিষ্ট হলেও চিকিৎসার অভাবে সন্তানটি মারা যায়। সন্তানটিকে কোলে নিয়ে ২ কিলোমিটার হেঁটে হাসপাতালে শেষ পর্যন্ত গেলেও তাকে বাঁচানো যায়নি। ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে ইসরাইলিরা সচেতনভাবেই মিথ্যা ও অস্বীকৃতির বাতাবরণ দিয়ে এক চরম আগ্রাসনকে সাধারণ বিষয়ে পরিণত করেছে। মিডিল ইস্ট মনিটরের কাছে এ মন্তব্য করেন প্রখ্যাত এই সাংবাদিক।

ফিলিস্তিনের এই পরিস্থিতিই বলে দেয় আল-কুদস দিবসের তাৎপর্য কি? লক্ষ্য করলে দেখা যায় ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে ইসরায়েলের দোসর রাষ্ট্রগুলো তা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ হোক আর ইউরোপ বা আফ্রিকার হোক তারা ফ্যাসিস্ট ধরনের সরকার। ফলে ফিলিস্তিনের ওপর সবধরনের বর্বর কা-কে এসব দোসর রাষ্ট্রগুলো অকাতরে সায় দিয়ে যায়। আল-কুদস দিবসের শিক্ষা এখানেই যে এহেন পরিস্থিতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ডাক দেয়া। কারণ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক ফিলিস্তিন সংকট নিরসনকে উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আরো ভয়ঙ্কর অস্তিত্ব বিনাশী মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছে। এ প্রশ্ন কেউ তুলছে না যে ৭ লাখ ইসরাইলি জোর করে ফিলিস্তিনি ভূমি জবরদখল করে রেখেছে তাদের উচ্ছেদ বা ফিরে যাওয়া ছাড়া কোনো শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে পারে কিভাবে? বছরের পর বছর ইসরায়েলিদের এ বর্বর আচরণে আন্তর্জাতিক বিশ^ কিছুই করতে পারছে না, কেন? আল-কুদস দিবস এধরনের অসংখ্য প্রশ্নের অবতারণা সৃষ্টি করে আমাদের মেধা ও মননে? এধরনের একপক্ষীয় লোকজন যারা কি না অন্ধের মত শুধুমাত্র ইসরাইলি স্বার্থ রক্ষা করে তাদের দিয়ে কিভাবে ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব! জাতিসংঘের কোনো ঘোষণাই কাজে আসেনি। ফলে গাজায় অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনবাসী কার্যত যুদ্ধ নয় বিশাল এক কারাগারে আটকে পড়েছে। সময়ে সময়ে অদৃশ্যমান কারাগার থেকে গাজাবাসী বের হয়ে আসতে চায় এবং ইসরাইলি গুলি তাদের বক্ষ বিদীর্ণ করে। কিছুদিনের জন্যে প্রতিবাদ বিক্ষোভ থেমে থাকে এক শোকার্ত পরিবেশে। তারপর ফের প্রতিবাদী হয়ে ওঠে সঙ্গত কারণেই এবং এরপর নিরন্তর এভাবেই ইসরাইলি সেনারা রক্তপাত ঘটিয়ে থাকে নিস্পাপ, নির্দোষ ফিলিস্তিনিদের ওপর। এবং এটাই যে চিরকাল নিয়তি হয়ে থাকতে পারে না আল-কুদস দিবস সে ডাকই দিয়ে যায়। কারণ গাজার ফিলিস্তিনিদের জন্যে দুনিয়ায় কোনো পরিকল্পনা নেই। এব্যাপারে সবাই নিশ্চুপ এবং নিশ্চিত। এবং সবাই সমান। কারণ ইহুদিবাদ যেসব রাষ্ট্রের প্রশাসনে গাঁটছড়া হয়ে বসে আছে তাদের পক্ষে কখনো ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় এগিয়ে আসা সম্ভব নয়।

সম্ভব নয় তার আরেক কারণ হচ্ছে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলি বাণিজ্যিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে অনেকদূর বিস্তার লাভ করেছে যে কারণে তারা মাঝে মাঝে এসব সম্পর্কে কৌতুক করে হলেও জানান দিতে পছন্দ করে। ইরানের ভাষায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যে বি টিম ভর করে আছে সেও ফিলিস্তিনি স্বার্থের বিপক্ষে কাজ করছে। এই বি টিমের সদস্যরা বরং কিভাবে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেয়া যায়, ইউএস রেজিম চেঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় সেদিকেই নজর দিচ্ছে বেশি। আল-কুদস দিবস নিয়ে তাদের মোটেই চিন্তার কোনো উদ্রেক নেই। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ওপর নিজেদের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। ফলে ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার বা স্বাধীনতার জন্যে তাদের বৈধ সংগ্রামের বিষয়টি তারা কখনো উপলব্ধি করতে পারে না। আল-কুদস দিবস আরব নেতাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে তাদের অবস্থানগত দুর্বলতা, পরাশক্তিগুলোর লেজুরবৃত্তি পাল্টানো না পর্যন্ত তাদের পক্ষে কখনো ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না। কারণ পরাশক্তিরা তাদের বিবেচনা করে পেট্রোডলার দিয়ে নচেৎ আর কিছু নয়।

এ কারণেই ইরানের মহান ইমাম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেইনী বিশে^র মুসলমানদের রমজানের শেষ শুক্রবার আল-কুদস দিবস পালনের আহবান জানিয়ে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের বৈধ অধিকারের সমর্থনে মুসলমানদের আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশ ছাড়াও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে বিষয়টিকে গ্রহণ করা কর্তব্য। সেই থেকে প্রতিটি আল-কুদস দিবসে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে তাদের প্রতিরোধ গড়ে তুলে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইনতিফাদার প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে। ইসরাইলি সাংস্কৃতিক ও সামরিক আগ্রাসনে ফিলিস্তিনি ইতিহাস ও ঐতিহ্য যাতে মাটি চাপা না পড়ে সেজন্যে আল-কুদস দিবস জরুরি এক বার্তা বহন করে। দৃশ্যত আল-কুদস দিবসের প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গী ইসরাইলি ফিলিস্তিনি সংঘাতের ওপর এবং ইরান এই স্থানীয় সংগ্রামকে বৃহত্তর বৈশ্বিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেখে। বিশ্ব জুড়ে আল-কুদস দিবস উদযাপনের মাধ্যমে ইরান ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামকে অভিন্ন এক ইসলামী আন্দোলনের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। প্রতি বছর বিশ্বের অন্তত ৮০টি দেশে আল-কুদস দিবস পালিত হচ্ছে। লন্ডন, বার্লিন, টরেন্টো ছাড়াও বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে এ দিবসটি উপলক্ষে ইসরাইলি দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে আল-কুদস দিবসটির অর্থই দাঁড়িয়েছে ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো ও ফিলিস্তিনি নিপীড়িত জাতির প্রতি একাত্মতার জানান দেয়া।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ